জীবনের সার্থকতা

 শিরোনামঃ জীবনের সার্থকতা 

রচনা হিফজুর রহমান লস্কর 

তারিখ -০৩/১২/২০২৫


রণধীর বাবু দীর্ঘ চল্লিশ বছর শিক্ষকতা করে গতবছর অবসর গ্রহণ করেছেন। অবসর গ্রহণের পর থেকে ধীরে ধীরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আগে থেকেই অল্প অল্প সুগার প্রেসারের সমস্যা ছিল। কিন্তু তা এখন অনেক পরিমাণে বেড়ে গেছে। ইদানিং তিনি চোখে ঝাপসা দেখেন, সবসময় চোখ দিয়ে জল পড়ে। স্থানীয় ভাবে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তাই তিনি চেন্নাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

রণধীর বাবু নিজের শিক্ষকতার জীবনে কতশত ছেলেমেয়ে পড়িয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য উঁচু পদে অধিষ্ঠিত করেছেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। কিন্তু নিজের দুই ছেলেকে তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। একজন এল,পি, শিক্ষক আর একজন কোন রকম একটা ব্যবসা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। এরা নিজেদের সংসার নিয়েই ব্যস্ত। তাই তিনি একপ্রকার নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছেন। শেষ পর্যন্ত কাউকে সঙ্গী করতে না পেরে স্ত্রীকে নিয়েই রওয়ানা দিয়েছেন। 

চেন্নাই হাসপাতালে পৌঁছে তিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবেন এমন সময় হঠাৎ তার সামনে একজন ভদ্র লোক এসে দূর থেকে ' স্যার নমস্কার, আমাকে চিনতে পারেননি, আমি আপনার সাহেদ।' বলেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করলো। 

' ও, আচ্ছা, সাহেদ, বাবা তুমি তো ডাক্তার হয়েছ, তাইনা? 

' হ্যাঁ স্যার আপনার আশীর্বাদে। আর আপনি তো আমি যখন ক্লাশ নাইনে পড়ি তখনই বলেছিলেন, অপ্লু আর আমি দুজনই ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হবো, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবো। স্যার আপনার কথা তো অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। তবে অপ্লু তো আরও উপরে। সে তো আই, আই টি ইঞ্জিনিয়ার।

আচ্ছা বাবা তোদের খবর শুনে খুব খুশি হলাম। তোরা দীর্ঘজীবী হো।' বলে তিনি যাবার উপক্রম করতে সাহেদ জিজ্ঞেস করলো , " স্যার আপনি কি অসুস্থ, আপনি কি ট্রিটমেন্টের জন্য এসেছেন?'

' হ্যাঁ বাবা, তুমি কি --'

মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় সাহেদ। বলে, চলুন। আমি এখানে সদ্য জয়েন করেছি। আমি আপনাকে বিভাগীয় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো, আমি থাকতে এখানে আপনার কোন অসুবিধা হবে না।'

রণধীর বাবুর চোখে জল এসে গেল। তিনি সাহেদের পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন। তাঁর মনে অনেক ভয় ছিল। অজানা অচেনা জায়গা। তাছাড়া তিনি শুনেছেন এখানকার ডাক্তাররা নাকি তাদের স্থানীয় ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা খুব কমই বুঝে। সাহেদকে পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন।

সাহেদ তাঁকে নিয়ে ডাক্তার দেখালো, নানান ধরনের টেস্ট করালো। সব কাজ শেষ করে বললো,' স্যার চলুন, কাজ হয়ে গেছে। রিপোর্ট গুলো আগামীকাল আসবে। আজ আপনারা আমার এখানেই থাকবেন। কাল আবার রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো। '

রণধীর বাবু লজ্জায় পড়ে গেলেন। বললেন,' থাক বাবা, আমরা একটা হোটেলে থাকবো। আচ্ছা কাল না হয় আমাদের একটু সাহায্য করো। তোমার এই সাহায্যের জন্য আমি ঋণী হয়ে থাকবো, তোমাকে না পেলে,--

মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় সাহেদ। বলে,' একী বলছেন স্যার, ঋণী তো আমি থাকবো চিরদিন। আপনার স্নেহ আর আশীর্বাদ না থাকলে আমি এই স্থানে কখনো পৌঁছতে পারতাম না। সূযোগ যখন পেলাম, একটু আপনার সেবা করি।' বলে স্যারের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল তার বাসায়। বাসায় মানে ভাড়া ঘরে, যেখানে মাত্র দুটো রুম আছে। বললো,' আপনার হয়তো একটু কষ্ট হবে, তবু কোন রকম এ্যাডজাস্ট করে থেকে যাবেন।' 

রণধীর বাবু যেন হাতে আসমান পেলেন। 

সেদিন রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে কত কথা হলো ছাত্র শিক্ষকের মাঝে। অতঃপর স্যারকে বিছানা পত্তর করে দিয়ে সাহেদও ঘুমিয়ে পড়লো।

পরদিন সকাল নয়টা বাজতে সাহেদ তাদেরকে নিয়ে আবার হাসপাতাল গেল। সেখান থেকে রিপোর্ট কালেকশন করে ডাক্তার পরামর্শ করলো। সাহেদের শিক্ষক শুনে ডাক্তাররা খুব গুরুত্ব সহকারে তাঁর চেক আপ করলেন। তিন জন ডাক্তারের একটা টিম সবকিছু খতিয়ে দেখে বললেন তেমন বড়ো সমস্যা কিছু নেই তবে আরও দুতিনটা টেস্ট করতে হবে এবং চোখের ছোট একটা অপারেশন করতে হবে। এজন্য দুতিন দিন এখানে থাকতে হবে। রণধীর বাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁকে বাধা দিয়ে সাহেদ বললো,' কোন অসুবিধা নেই, যতদিন প্রয়োজন আমার এখানে থাকবেন।' 

ইতিমধ্যে বার বার সাহেদের ফোন আসছিল। কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছে, তাদের দেখতে হবে। সে গাড়িতে করে তাদেরকে অদূরে একটা ফাইভ স্টার হোটেলে নিয়ে গিয়ে বসালো এবং খাবারের অর্ডার দিয়ে বললো, এখানে খাবার খেয়ে তাঁরা যেন অপেক্ষা করেন। সে দুঘন্টার মধ্যে ফেরত এসে তাদেরকে নিয়ে যাবে।

রণধীর বাবু ও তাঁর স্ত্রী খেতে বসলেন। তাদেরকে খাবার পরিবেশন করা হলো। পনির,মাছ, মাংস, বিরিয়ানি, দৈ, মিষ্টি কী নেই সেখানে। রণধীর বাবুরা অনেক কিছুই খাবেন না বলে ঘুরিয়ে দিতে চাইলে হোটেল বয়রা বললো এতসবের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আর না খেলে হোটেল মালিক রাগ করবেন। এরই মধ্যে অতি সাধারণ একজন লোক এসে রণধীর বাবুকে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করল,' স্যার ভালো আছেন তো, আমাকে চিনতে পারেননি? আমি আপনার এক সময়ের ছাত্র।' 

রণধীর বাবু চেয়ে দেখলেন বছর পঞ্চাশোর্ধ একটা লোক, অতি দীন বেশে ধুতি আর ময়লা যুক্ত শার্ট, দেখে মনে হচ্ছে এই হোটেলের ওয়েটার হবে। বললেন,' আমার ঠিক মনে পড়ছে না। তুমি এখানে কি করো।'

সে বলল,' কেন স্যার ভুলে গেলেন? আপনার হাতে অনেক মার খেয়েছি। স্যার, মনে পড়ে হৃষিকেশ, জয়নুল, আর আদিত্য, আমরা একই গ্রোপের। হৃষিকেশ আর জয়নুল তো এখন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।' 

স্যার বললেন,' হ্যাঁ হ্যাঁ, ওদের কথা তো খুব মনে আছে। ওরা তো পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, শুনেছি ওরা দুজন ইঞ্জিনিয়ার।'

' হ্যাঁ স্যার। ওদের গ্রোপের লাস্ট বেঞ্চের সঞ্জু মনে আছে? যাকে আপনি খুব তিরস্কার আর মারধর করতেন।' 

রণধীর বাবু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,' ও, হ্যাঁ, একটু একটু মনে পড়ছে, সঞ্জু, হ্যাঁ।' 

সঞ্জু বললো, হ্যাঁ স্যার। আপনি আমাকে মানুষ করার জন্য, জীবনে এ্যাসটাবলিস্ট হওয়ার জন্য কী না করেছেন।' 

তাদের মধ্যে আরো অনেক কথা হলো। ইতিমধ্যে সাহেদ ফিরে আসলো। সে বলল, স্যার একটু বসুন, আমিও একটু খেয়ে নেই।' 

খেতে খেতে সাহেদ স্যারের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো। সঞ্জু সম্বন্ধে বলতে গিয়ে সাহেদ বললো 'জানেন স্যার, সঞ্জু হচ্ছে এই ফাইভ স্টার হোটেলের মালিক। শুধু তাই নয়, সে চেন্নাইয়ের একটা নামিদামি সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক। আর আপনার ওই হৃষিকেশ আর জয়নুল ইঞ্জিনিয়ার, ওরা তো তারই কোম্পানিতে কাজ করে।' 

রণধীর বাবু লজ্জায় মাথা নত করলেন। 

রণধীর বাবু হোটেলের বিলের কথা জিজ্ঞেস করলে সাহেদ বললো সে দেবে। কিন্তু পরমুহুর্তে সঞ্জু আরও কিছু পানীয় নিয়ে আসলো আর বললো, ' বিল দিতে হবে ন স্যার বরং যতদিন এখানে আছেন আমার এখানে সকাল বিকাল খেতে হবে স্যার।' 

সাহেদ রণধীর বাবুকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। আবার তার রুমে নিয়ে গেলো। পরদিন সকালে আবার সেই হাসপাতাল, টেস্ট আর ডাক্তার পরামর্শ। শেষে সুগার কন্ট্রোলের পরামর্শ আর ঔষধ দিলেন আর চোখের রেটিনার ছোট একটা অপারেশন করে দুদিন পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। ঐদিন সারারাত তাঁর ঘুম হয়নি। তাঁর মনে কতো কথার উদয় হতে লাগলো। এই সাহেদকে তিনি পড়াশোনার জন্য কত বকুনি দিয়েছেন, কতো শাসন করেছেন। একদিন তো ওর শরীরে বেত্রাঘাতের দাগ ফুটে উঠেছিল। আজ সে ডাক্তার। বিগত তিন চার দিন থেকে ওর কাছ থেকে তিনি যে সাহায্য পেয়েছেন তার মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এমনকি সাহেদ যদি না থাকতো তাহলে হয়তো তাঁর ট্রিটমেন্টেই অপূর্ণ থেকে যেতো। তাঁর মনে হলো তাঁর শিক্ষক জীবন সার্থক। তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো শিক্ষক জীবনের সার্থকতার অশ্রুধারা।

ওদিকে সঞ্জুর কথা মনে করে তিনি লজ্জায় জর্জরিত। স্কুলের লাস্ট বেঞ্চের সবচেয়ে গাধা যে ছিল, যাকে ভালো রেজাল্ট করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলতেন। যে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেনি আজ সে একটা ফাইভ স্টার হোটেলের মালিক আর সর্বোপরি তার সঙ্গী দুজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তার অধীনে কাজ করছে। 

তাঁর মনে হলো নিজেও তো আজীবন শিক্ষকতা করেছেন কিন্তু বাড়ি গাড়ি তো দূরের কথা,বৃদ্ধ বয়সে রীতিমতো ট্রিটমেন্ট ও করতে পারছেন না। অথচ আজ নিজ চোখে দেখলেন একজন ব্যর্থ ছাত্রের সাফল্য। আজ তাঁর ব্যাক বেঞ্চার ছাত্র একটা কোম্পানির মালিক। তিনি অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকেন, জীবনের সার্থকতা কোনদিকে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়