তোষামোদ

 

শিরোনামঃ তোষামোদ 

রচনা: হিফজুর রহমান লস্কর 

তারিখ ১৪/১১/২০২৫


সে অনেক আগের কথা। দুটি দলের মধ্যে ফুটবল খেলা চলছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলাম। যে কোন খেলা দেখার সময় দর্শকরা সাধারণত একটা দলকে সমর্থন করে খেলার আনন্দ উপভোগ করে। আমিও সেদিন একটা দলকে মনে মনে সমর্থন করে তন্ময় হয়ে খেলা দেখছিলাম। উভয় দলই ভালো খেলছিল। কে জিতে কে হারে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। দর্শকের চেঁচামেচি আর হাততালিত নিজেও উত্তেজিত, এমন সময় পাশে থেকে একজন লোক বলে উঠলো,' আপনাকেও দেখতে একজন ভালো খেলোয়াড় মনে হচ্ছে। আপনিও নিশ্চয়ই খুব ভালো খেলেন, তাইনা?' 

আমি ঢোক গিললাম। আমি কোনদিন ও ফুটবল খেলিনি, যদিও আমি ফুটবল প্রেমী। তাছাড়া সে সময় আমি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে একটু দূর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারলাম লোকটা আমাকে তোষামোদ করছে। একবার ওর দিকে তাকিয়ে আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। সে আবার এগিয়ে এসে বলল,' আমার নাম সমির। আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। আপনার শার্ট প্যান্ট ও দারুন ফিটিং, আজ অপূর্ব লাগছে আপনাকে। এর আগে নিশ্চয়ই আপনার সঙ্গে আমার অনেক বার দেখা হয়েছে।' 

বুঝলাম লোকটা তোষামোদ করছে। আমি জানতাম মানুষ কোন স্বার্থ আদায়ের জন্য তোষামোদের আশ্রয় নেয়। 

    তোষামোদ বা চাটুকারিতা হলো নিজের স্বার্থসিদ্ধির একটি উপায়, যেখানে প্রশংসা ও গুণকীর্তনের ছলে কোন ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করে স্বার্থ আদায় করা হয়। সব মানুষই প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে এবং তোষামোদ সেই চাহিদা পূরণ করে। যদিও মানুষ বুঝতে পারে যে কেউ তোষামোদ করছে মানেই এখানে কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে। তবুও মানুষ নিজেদের সম্পর্কে ভালো কথা শুনতে উৎসাহিত হয়। 

তোষামোদ এর মূল উদ্দেশ্য থাকে নিজের সুবিধা আদায় করা, যেমন— পদোন্নতি, আর্থিক লাভ বা অন্য কোনো সুবিধা লাভ করা।

মানুষের মধ্যে একটি সহজাত প্রবণতা আছে ভালো কথা শুনতে চাওয়ার। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস এবং ভালো লাগা বাড়িয়ে তোলে।

তোষামোদ এই চাহিদা পূরণ করে এবং মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে তারা তোষামোদকারীকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অনেক সময় মানুষ জেনেশুনে তোষামোদের বলি হয়।

আমি বুঝতে পারলাম এই লোকটা তোষামোদ করে আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। কিন্তু ওর মতলবটা কি তা বুঝার জন্য আমি একটু সুযোগ দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম,' কি কর, কোথায় থাকো?' 

সে বলল,' আমি শহরে একটি গ্যারেজে ম্যাকানিকের কাজ করতাম। দুতিন দিন হলো আমি ওটা ছেড়ে দিয়ে এখানে এসেছি। যদি কোন কাজ পাই।' আবার বলেই চলল,' আমি আপনাকে চিনি, আপনি খুব সহৃদয় ব্যক্তি। আপনি হয়তো আমাকে কোন সাহায্য করতে পারেন।' 

আমি তোমাকে কি সাহায্য করতে পারি,' বলে আমি আরও একটু সরে দাঁড়ালাম। 

খেলা শেষ হতে আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। দেখি সে আবার আমার পিছু পিছু আসছে। জিজ্ঞেস করলাম,' তুমি আবার?'

সে বলল,' এ শহরে আমার পরিচিত কেউ নেই আর আপনার মতো অমায়িক মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।' সত্যিই আপনাকে পেয়ে আমি খুব খুশি। আজ আমি আপনার ওখানেই থাকবো।' আমার আর কিছু বলার অপেক্ষা না করেই সে আমার পিছু নিল। অগত্যা আমিও ঘরমুখো চললাম। মনে মনে ভাবলাম সে তো ম্যাকানিক আর আমার বাইকটা কিছুদিন থেকে একটু ডিস্টার্ব করছে, ওটা না হয় একবার দেখিয়ে নেব। 

বাড়িতে পৌঁছে তাকে বাইকটা দেখালাম। সত্যিই মুহূর্তের মধ্যে সে ওটা ঠিক করে নিল। এরপর আমার বাড়ি ঘর আসবাবপত্র সবকিছু নিয়েই প্রশংসা আর তোষামোদ করতে করতে আমার কান ঝালাপালা করে তুললো।

রাতে খাওয়া দাওয়া করে তাকে বাইরের একটা রুমে থাকতে দিলাম। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার বাইকটা নিয়ে লোকটা অদৃশ্য। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তার টিকির নাগাল পেলাম না।

বুঝতে পারলাম আমি তোষামোদের বলি হয়েছি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়