খিদে

 অষ্টমীর সন্ধ্যা। ঢাকের তালে মণ্ডপ কাঁপছে। ধূপের গন্ধ, আলোর ঝলক।


মণ্ডপের এক কোণে থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে পল্টু। বয়স আট-নয়। গায়ে নোংরা, ছেঁড়া গেঞ্জি। পেটে খিদে, চোখে বিস্ময়।


পুরুতমশাই আরতি করছেন। ধুনুচি নাচছে, শাঁখ বাজছে। পল্টু একমনে মা প্রতিমার মুখের দিকে তাকিয়ে। পলক পড়ে না।


পাশ থেকে কে যেন ফিসফিস করে, “এই ছোঁড়া, ভক্তি দেখাতে আইছস না লুচি-সুজির লোভে?”


পল্টু উত্তর দেয় না। ও নিজেও জানে না, সে কেন এসেছে।


মা ওকে জন্মের পরেই রেললাইনের ধারে ফেলে গেছে। ‘মা’ কে তো চোখে দেখেনি। মা' ডাকটা ওর কাছে কেবল মণ্ডপের ওই মূর্তিটা। চোখে কাজল, কপালে টিপ, দশ হাতে অস্ত্র। রাগী, আবার মায়াবী। ওর মনে হয়, তার ম' হয়তো এই মায়ের মতো। এই মা ওকে মারবে না।


আর প্রসাদ? তিনদিন পেটে ভাত পড়েনি। পুরুতমশাই যখন ‘বলো দুর্গা মাই কি’ বলে লুচি ছোঁড়েন, পল্টুর জিভে জল আসে।


আরতি শেষ হলো। সবাই প্রসাদের জন্য হুড়োহুড়ি করছে। পল্টু ভিড় ঠেলে ঢুকতে পারে না, ঢুকার সাহসও করে না। দূর থেকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। 


হঠাৎ পুরুতমশাই ওকে দেখলেন। কাছে ডাকলেন। সবাই ভাবল বকবেন।  

তিনি পল্টুর মাথায় হাত রাখলেন। একটা শালপাতায় চারটা লুচি, সুজি আর একটা সন্দেশ তুলে দিলেন।  

“মাকে মন দিয়ে ডেকেছিস। মা আগে তোরে দেখছে, তারপর আমাদের।”


পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন একে অন্যে বলাবলি করছে, ঈশ্বর কেন এদের এই পৃথিবীতে পাঠান। কেউবা বলছে এই নোংরা ছোঁড়া গুলো পরিবেশটাই নষ্ট করে দেয়। কেউ বলছে ডাস্টবিনে জন্ম, এদের তো কোনো পরিচয়ই নেই। 

এরা কেউ তো একথাটা ভাবে না যে ঐ পরিচয় হীন টুকাই গুলো তাদেরই মতো কোনো ভদ্র মানুষের ছেলে মেয়ে। 

পল্টু প্রসাদ হাতে নিয়ে আবার মায়ের দিকে তাকাল।  

এই প্রথমবার ওর মনে হলো, খিদে দুটোই মিটেছে। একটা পেটের আর একটা বুকের।


সাহস করে সে মণ্ডপের আলোয় দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল --।  ও নিজেও বুঝল না, ভক্তির টানে এসেছিল না প্রসাদের টানে। হয়তো দুটোই। খিদে তো শুধু পেটের হয় না, মনেরও হয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়