জানালার ওপারে
হাসপাতালের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের দুটো পাশাপাশি বেড। একটায় শুয়ে অখিলেশ বাবু, অন্যটা তিনদিন ধরে খালি। ডায়াবেটিস তাকে শেষ করে দিচ্ছে। পা ফেটে ইনফেকশন, পচন ধরেছে। ডাক্তার মুখ ফুটে কিছু বলে না, কিন্তু নার্সের চোখ দেখে অখিলেশ বাবু ঠিকই বোঝেন— সময় ফুরিয়ে আসছে।
চতুর্থ দিন বিকেলে খালি বেডটায় নতুন রোগী এলো। নাম অপূর্ব সান্যাল। বয়স চল্লিশও পেরোয়নি। কিডনি দুটোই প্রায় অকেজো। চোখের নিচে কালি, মুখে হাসি নেই।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে রাত। ওষুধ, ইনজেকশন, যন্ত্রণার ফাঁকে ফাঁকে দুজনের আলাপ জমে ওঠে।
"দাদা, আপনার কী হয়েছে?" অপূর্ব জিজ্ঞেস করে।
"সুগার," অখিলেশ বাবু কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, "ধরেছে আর ছাড়ছে না। তোমার?"
অপূর্ব শুকনো হাসে, "আমারও ছাড়ার রোগ না। কিডনি। ডায়ালাইসিস করে করে ক্লান্ত। আর একটুও বাঁচার ইচ্ছে নেই।"
"বয়স কত হে তোমার?"
"আটত্রিশ।"
অখিলেশ বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, "আমার সত্তর চলছে। তবু বাঁচতে সাধ হয়। আর তুমি..."
দুদিন পর হঠাৎ রাতে অপূর্ব ফুঁপিয়ে ওঠে।
"দাদা, আমি আর পারছি না। রোজ এই মেশিন, এই সূঁচ... আমার বাঁচার ইচ্ছে করে না। মরে গেলেই শান্তি।"
অখিলেশ বাবু পাশ ফিরতে পারেন না, শুধু ঘাড়টা কাত করে জানালার দিকে তাকান। তার বেডটা জানালার গা ঘেঁষে।
"পাগল ছেলে," তিনি নরম গলায় বলেন, "ওদিকটা একবার দেখো। এত সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে কেউ মরতে চায়?"
"কী আছে দাদা ওদিকে?"
অখিলেশ বাবুর চোখ চকচক করে ওঠে। "আহা! কী নেই বলো? এই ভোরে দেখলাম নীল আকাশে এক ঝাঁক বক উড়ে গেল। নিচে একটা পার্ক, বাচ্চারা বল খেলছে। রঙিন ফুলের বাগান, নানা রঙের প্রজাপতি, গাঁদা, ডালিয়া... আর ওই যে, একটা বুড়ো দাদু তার নাতনিকে দোলনায় দোল দিচ্ছে। কী আনন্দ! কী সুখের জীবন, বাঁচার মতো জীবন!"
অপূর্ব অবাক হয়ে শোনে। তার বেড থেকে জানালাটা দেখা যায় না। উঁচু বেডের হেডবোর্ড আড়াল করে রেখেছে।
"দাদা, আমার বেডটা আপনার সাথে পাল্টাবেন? আমি একটু দেখতাম..."
অখিলেশ বাবু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়েন, "না না, ডাক্তারের বারণ আছে। নড়াচড়া করলেই আমার পায়ের ব্যথা বাড়ে। তুমি বরং শোনো, আমি বলছি।"
তারপর রোজ শুরু হয় অখিলেশ বাবুর বর্ণনা।
"আজ একটা বিয়ে বাড়ির শোভাযাত্রা গেল রাস্তা দিয়ে... বর কেমন টোপর পরে ঘোড়ায় চড়েছে... কনে লাল বেনারসিতে..."
"আজ বৃষ্টি হয়েছে, অপূর্ব। পার্কের গাছগুলো কেমন স্নান করে ঝকঝক করছে। একটা কুকুর ছানা কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছে..."
"আজ আকাশে কী বড় চাঁদ উঠেছে! জ্যোৎস্নায় পার্কটা ভেসে যাচ্ছে। এক জোড়া তরুণ-তরুণী বেঞ্চে বসে গল্প করছে... গাছের পাতা ফুল গুলো হাওয়ায় দোলছে। হায়রে মনোরম দৃশ্য!"
অপূর্বের চোখে জল আসে। মরার কথা ভুলে সে বাঁচতে চায়। ওই জানালার ওপারের পৃথিবীটা একবার নিজের চোখে দেখতে চায়। সে আবার অনুরোধ করে, "দাদা, শুধু একটা দিন... একটা ঘণ্টা..."
অখিলেশ বাবু হাসেন, "ধৈর্য ধরো ভাই। তুমি সেরে উঠবে। তখন নিজেই দেখো। আমি তো চললাম... আমার সময় শেষ।"
সাত দিনের মাথায় ভোর রাতে অখিলেশ বাবু চলে গেলেন। ঘুমের মধ্যেই। মুখে এক চিলতে হাসি।
দুপুরে নার্স এসে অপূর্বকে জানালার পাশের বেডটায় শিফট করল। অপূর্বের বুক ঢিপঢিপ করছে। এতদিনের স্বপ্ন! সে আস্তে করে মাথা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
তারপর স্তব্ধ হয়ে গেল।
জানালার ওপারে কোনো আকাশ নেই, পার্ক নেই, ফুলের বাগান নেই। আছে শুধু একটা বিশাল, বিবর্ণ, শূন্য ইটের দেওয়াল। পাশের বিল্ডিংয়ের দেওয়াল, যেখানে একটা জানালাও নেই।
নার্সকে ডেকে অপূর্ব কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "দিদি, অখিলেশ দাদা... উনি যে রোজ বলতেন পার্ক, আকাশ, বাচ্চারা..."
নার্স অবাক হয়ে দেওয়ালটার দিকে তাকাল, তারপর অপূর্বের দিকে। নরম গলায় বলল, "ও দাদু? উনি তো অন্ধ ছিলেন। অনেক দিন থেকে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। চোখ দিয়ে জল পড়তে পড়তে একসময় তার দুটি চোখ অপারেশন করা হয়। প্রথম কয়েকদিন মোটামুটি ঝাপসা হলেও দেখতে পারতেন। কিন্তু গত প্রায় দশ বছর হয়ে গেল তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন"
অপূর্বের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। বুঝল, অখিলেশ বাবু তার জন্য শেষ সাতটা দিন একটা গোটা পৃথিবী বানিয়েছিলেন। যে পৃথিবী তিনি নিজে কোনোদিন দেখেননি, শুধু অপূর্বকে বাঁচিয়ে রাখবেন বলে মনের চোখ দিয়ে সাজিয়েছিলেন।
জানালার বাইরে শুধু একটা দেওয়াল। আর জানালার এপারে অপূর্ব সান্যাল— নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কিছু মানুষ নিজের সমস্ত অন্ধকার দিয়েও অন্যের জীবনে আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। অখিলেশ বাবুরা মরে না, তারা জানালার ওপারের সেই না-দেখা পৃথিবী হয়ে বেঁচে থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন