চোখের আলো

 দশম শ্রেণির বেঞ্চে বসেই রোহন আর সোনালীর চোখাচোখি হয়েছিল। তারপর বইয়ের ফাঁকে চিরকুট, কোচিং ফেরার পথে আধঘণ্টা বেশি হাঁটা। সাত-আট বছরের অপেক্ষা শেষে দুই পরিবার মেনে নিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে দিল। 


রোহন হলো মেডিসিন স্পেশালিস্ট, সাদা অ্যাপ্রন গায়ে শহরের নামকরা ডাক্তার। সোনালী এম.এ পাশ করেও চাকরির পেছনে ছোটেনি। রোহনের সংসার, বই আর গান নিয়েই তার জগৎ। সুখের কোনো কমতি ছিল না।


বিপত্তি শুরু হলো এক বর্ষায়। সোনালীর চোখ জ্বালা করে, জল পড়ে। রোহন স্টেথো নামিয়ে চোখের ড্রপ দিল। “আমি আছি তো, ভয় কী?” সোনালী হাসে। স্বামীর হাতের ওষুধে তার অগাধ বিশ্বাস।


দিন যায়, মাস যায়। জ্বালা কমে না। আলো ঝাপসা হয়ে আসে। সোনালীর ভাই রজত, পেশায় উকিল, বোনকে দেখতে এসে সব শুনে রেগে আগুন। “একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখা, সোনালী। তোর স্বামী মেডিসিনের ডাক্তার। মেডিসিন আর চোখ এক জিনিস না।”

 কথাটা রোহনের কানে যেতেই সে রেগে গেল। হাসতে হাসতে সে তর্ক জুড়ে দেয়। “আচ্ছা রজত ভাই, আপনার স্ত্রী যদি জমির বিবাদ নিয়ে ফাঁসে, আপনি কি নিজে কেস লড়বেন না অন্য উকিল খুঁজবেন? ডাক্তার হয়ে নিজের বউয়ের চিকিৎসা করব না?”


সোনালীও ভাইকে থামায়, “দাদা, উনি নিশ্চয়ই তোমার আমার চেয়ে বেশি বোঝেন।”


চিকিৎসা চলল। ড্রপ বদলাল, পাওয়ার বাড়ল, কিন্তু চোখের আলো কমতেই থাকল। এক সকালে সোনালী ঘুম ভেঙে দেখল, চারপাশে শুধু অন্ধকার। চোখ কচলাতে কচলাতে চিৎকার করে উঠল,' এ কী! আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তার পর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে রোহনের হাতটা খুঁজে নিয়ে ফিসফিস করল,' তুমি আছো, আমার আর আলো লাগবে না।”


রোহন সেদিন প্রথম কাঁদল। তারপর থেকে সে-ই সোনালীর চোখ হলো। ভাত মেখে খাওয়ানো, শাড়ির কুঁচি ধরে দেওয়া, বই পড়ে শোনানো—সব। পাড়ার লোকে বলত, “এমন স্বামী লাখে একটা।”


পাঁচ বছর কেটে গেল। এক সন্ধ্যায় রোহন সোনালীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, “সোনালী, আমি আবার বিয়ে করতে চাই।”


সোনালী চমকাল না। অন্ধ চোখ দুটো রোহনের মুখের দিকে তুলে শান্ত গলায় বলল, “তোমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমি তো তোমাকে নিয়ে সুখেই আছি। তবে কি আমার এই অন্ধত্ব তোমার বোঝা হয়ে গেল?”


রোহন থতমত খায়, “বোঝা না। কিন্তু আমার একটা সন্তান দরকার, বংশ দরকার। তুমি তো...”


সোনালী এবার শব্দ করে হাসল। সেই হাসিতে জল ছিল না, আগুন ছিল। সে ধীরে উঠে আলমারি খুলল। হাতড়ে বের করল একটা পুরনো ফাইল। রোহনের হাতে দিয়ে বলল, “পড়ে দেখুন, ডাক্তারবাবু।”


ফাইলের ভেতর তিন বছর আগের রিপোর্ট। শহরের সবচেয়ে বড় চক্ষু হাসপাতালের। লেখা—‘রোগীর কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করলে দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। রোগী চিকিৎসায় রাজি নন। কারণ: স্বামীর অনুমতি নেই।’


রোহনের হাত কাঁপতে লাগল। “তুমি... তুমি তখন কেন বলোনি?”


“বলেছিলাম, তখন তুমি বলেছিলেন, ‘আমি মেডিসিনের ডাক্তার, আমি যা করছি ঠিকই করছি। বাইরের ডাক্তার আমার চেয়ে বেশি জানে নাকি?’ তোমার ‘ইগো’র কাছে আমার চোখ হেরে গেল, রোহন। উকিল ভাই ঠিকই বলেছিল '—জমির মামলা আর খুনের মামলা এক উকিল লড়ে না।' তেমনি পেটের অসুখ আর চোখের অসুখ এক ডাক্তার সারে না।”


ঘরে কবরের নিস্তব্ধতা। রোহন মাথা নিচু করে বসে রইল। তার সব ডিগ্রি, সব খ্যাতি আজ সোনালীর অন্ধ চোখের সামনে মিথ্যে হয়ে গেছে।


সোনালী লাঠিটা হাতড়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোল। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ তুমি বিয়ে কর, রোহন। আমার আপত্তি নেই। শুধু নতুন বউকে----।' 

মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় রোহন,' বিয়ে করার অনুমতি যদি দাও তাহলে বিয়ে করবো কিন্তু তোমাকে ছেড়ে নয়। তোমার আমার সংসার যেমন চলছে তেমনই চলবে। আমার চোখ দিয়ে তুমি দেখবে। তুমি গল্প বলবে আমি শুনবো। যাকে বিয়ে করে আনবো সে তোমার সেবা করবে। তোমাকে কখনো বোঝা মনে করবো না।

সোনালী একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বললো,' নতুন বৌ এনে আলো দিয়ে রেখো, জেদ দিয়ে না। আর হ্যাঁ, আমি আজ ভাইয়ের কাছে চলে যাচ্ছি। অন্ধ হয়েছি বলে মেরুদণ্ডটা বিক্রি করিনি। তোমার সংসারে আমি জানি আমি কখনো বোঝা ছিলাম না, ছিলাম তোমার অহংকারের কাছে।”


রোহন অতীত স্মৃতি টেনে এনে বললো,' না,'সোনালী, না। তুমি আমায় ছেড়ে যেতে পারো না। তুমি আমার হয়ে থাকবে। 


রোহনের জেদ জিতল। সোনালীর নিষেধ, পাড়ার কানাঘুষা, নিজের বিবেক—সব চাপা দিয়ে সে বিয়ে করল নার্সিং পড়া মেয়ে মিতুকে। যুক্তি দুটোই, “বংশ রক্ষা, সেবা করার মানুষ দরকার।”


বিয়ের প্রথম মাসটা স্বপ্নের মতো। মিতু সংসার সামলায়, রোহন চেম্বার। সোনালী তার অন্ধকার ঘরে চুপচাপ। দুবেলা ভাত, ওষুধ, সময়মতো সব পায়। কিন্তু রোহনের হাসিটা আর তার দিকে ফেরে না।


ছয় মাস পর থেকেই ছবিটা পাল্টায়।


মিতু বুঝল, এই বাড়িতে তার কাজ শুধু রান্না আর সেবা। রোহনের গল্পে, চিন্তায়, ভবিষ্যতে শুধুই ‘ডাক্তার রোহন’ আছে, ‘স্বামী রোহন’ নেই। আর সোনালী? সে তো জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ—যার অন্ধ চোখ দুটো সব সময় রোহনের দিকে তাক করা।


এক রাতে রোহনের জ্বর এলো। সোনালীই অন্ধকারে হাতড়ে জলপটি দিল, মিতু তখন পাশের ঘরে ঘুমে। জ্বর ছাড়ার পর রোহন ধরল সোনালীর হাত। মিতু দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল। কিছু বলল না।


সংসারে তৃতীয় মানুষটা সবচেয়ে নিঃসঙ্গ। মিতু বুঝল, সে বউ না, সে সোনালীর শূন্যস্থান পূরণের চুক্তিভিত্তিক কর্মী।


বছর ঘুরতেই মিতু কাগজটা এগিয়ে দিল। “ডিভোর্স পেপার, সাইন করে দিন।”


রোহন আকাশ থেকে পড়ল, “কেন? তোমার কীসের অভাব?”


মিতু শান্ত গলায় বলল, “ভালোবাসার। আপনি সোনালী দিদিকে অন্ধ করেছেন ইগো দিয়ে, আর আমাকে জীবন্ত লাশ বানিয়েছেন বংশের লোভে। আমি নার্স, রোগীর সেবা করি। সতীনের সংসারে বিনা বেতনের আয়া হয়ে থাকতে আসিনি। আপনার বংশ চাই, কিন্তু বংশধরকে বাবা’র ভালোবাসা দিতে পারবেন? যে লোক প্রথম স্ত্রীর চোখের আলো নিভিয়ে দেয়, সে দ্বিতীয় স্ত্রীর মনের আলো কী করে জ্বালাবে?”


মিতু চলে গেল। কোর্টে কেস উঠল না, রোহন বিনা বাক্যে সাইন করল।


সেদিন রাতে রোহন সোনালীর ঘরে গেল। সোনালী টের পেয়ে বলল, “কে? মিতু চলে গেছে বুঝি?”


রোহন হাঁটু গেড়ে বসল, “আমায় মাফ করে দাও সোনালী। আমি ভুল করেছি।”


সোনালী অন্ধ চোখে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে তখন জ্যোৎস্না। “মাফ করে দিয়েছি রোহন, যেদিন অন্ধ হয়েছি সেদিনই। কিন্তু বিশ্বাস? সেটা একবার ভাঙলে আর জোড়া লাগে না। তুমি ডাক্তার, আর ডাক্তাররা জানেন তো—ভাঙা হাড় জোড়া লাগে, ভাঙা কর্নিয়া জোড়া লাগে না।”


রোহন কাঁদল। শব্দ করে। জীবনে প্রথমবার।


সেদিন রাতে শুয়ে শুয়ে রোহনের চোখের সামনে ভাসতে লাগল তার অতীত জীবন আর বর্তমান বিশাল বাড়ি। 

এক ঘরে ডাক্তার রোহন, তার ডিগ্রি, তার টাকা। পাশের ঘরে অন্ধ সোনালী, তার রেডিও, তার গান। মাঝখানের দেয়ালটা ইটের না, ইগোর। দুজনেই বেঁচে আছে, কিন্তু সুখটা মরে গেছে সেইদিন, যেদিন রোহন চক্ষু বিশেষজ্ঞের বদলে নিজের জেদকে বড় করেছিল।


 দ্বিতীয় বিয়ে প্রথম ভুলের প্রায়শ্চিত্ত নয়। ইগো আর লোভ দিয়ে সংসার পাতা যায়, সুখ কেনা যায় না। একটা অন্ধত্ব চোখে, আরেকটা অন্ধত্ব মনে—দুটোই ভয়ঙ্কর।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়