সত্যের সিংহাসন
ভূতের রাজ্যে তখন ঘোর অমাবস্যা। নিয়ম নেই, নীতি নেই। যে যাকে পারে শোষণ করে। মামদো ভূত শাঁকচুন্নির পুকুর দখল করে, ব্রহ্মদৈত্য পেত্নীর বটগাছ কেটে নেয়। সবলের অত্যাচারে দুর্বলের হাড়গোড় জর্জরিত। কেউ কারও কথা শোনে না।
শ্মশানের কোণে, পোড়ো মন্দিরে গোপনে মিটিং-মিছিল চলে। ফিসফাস, ষড়যন্ত্রের গন্ধ। ভূতরাজ কঙ্কালেশ্বরের কানে খবর গেল। সিংহাসনে বসে তাঁর হাড়ের মুকুটটা নড়ে উঠল। “আমার বিপক্ষে চাল চেলেছে নাকি?”
তিনি দূত পাঠিয়ে রাজ্যের সব নেতৃস্থানীয় ভূতকে ডেকে পাঠালেন। রাজসভা থমথমে। কঙ্কালেশ্বর গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন, “আমি স্থির করেছি, তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে রাজ্যের ভার দেব। তার আগে একটা ইন্টারভিউ। যে সত্য কথা বলবে, সিংহাসন তার।”
একে একে ডাক পড়ল। প্রথমে এল বড় দলের সর্দার মেছোভূত।
ভূতরাজ শুধালেন, “বলো, আমার শাসন কেমন চলছে? প্রজারা কতটুকু সন্তুষ্ট? আমার দোষ-গুণ কী?”
মেছোভূত কেঁপে উঠে হাতজোড় করল, “মহারাজ, আপনার শাসনে কোনো কষ্ট নেই। অভাব নেই। প্রজারা যেন স্বর্গরাজ্যে বাস করছে। আপনি দেবতা!”
ভূতরাজের চোখ জ্বলে উঠল। “কারাগারে নাও একে। মিথ্যাবাদী।”
এরপর এল স্কন্ধকাটা, এল নিশি, এল বেঁটে বামুন ভূত। সবার একই উত্তর—“আহা, কী সুখ! কী শান্তি! আপনি ভগবান!”
আর সভার একপাশে হাড়ের খাঁচা বাড়তে লাগল। মিথ্যে বলা নেতারা একে একে কারাগারে।
সবার শেষে এল এক ছোট আঞ্চলিক দলের দলনেতা—পুঁটে ভূত। রোগা, জীর্ণ। কিন্তু চোখ দুটোয় আগুন।
ভূতরাজ একই প্রশ্ন করলেন।
পুঁটে ভূত সোজা হয়ে দাঁড়াল। গলা কাঁপল না। বলল, “হে রাজন! মিথ্যে বলব না। আপনার শাসনে রাজ্যের পথঘাট, আলোর উন্নতি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ত্রুটি বিস্তর।”
সভা স্তব্ধ। কারাগারের ভূতেরা শিউরে উঠল।
পুঁটে বলে চলল, “প্রথম দোষ: আপনি সবাইকে সমান চোখে দেখেন না। মামদো-ব্রহ্মদৈত্যের বিচার একরকম, পেত্নী-শাঁকচুন্নির আরেকরকম। জাতি, ধর্ম, বর্ণ—এই ভেদে আপনি রাজধর্ম লঙ্ঘন করেছেন। পেত্নিরা আজ অসহায়, তাদের সম্মান আজ ভুলুণ্ঠিত। রাজার কাছে সব ভূতই তো প্রজা।”
“দ্বিতীয়ত: প্রজার সুখেই রাজার সুখ। অথচ রাজ্যে হানাহানি, মারামারি, হিংসা-বিদ্বেষ আর অবাধে ধ্বংস যজ্ঞ চলছে আপনি সিংহাসনে বসে দেখছেন, দমন করছেন না।”
“যদি সত্যিই শান্তি চান, সাম্যবাদী হন মহারাজ। দুষ্কৃতী আর সবলের লাঠি কেড়ে নিন, তাদের আইনের আওতায় আনুন। দুর্বলের হাতে সাহস আর বিশ্বাস তুলে দিন। তাদের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা ও বাঁচার অধিকার দিন। তবেই ভূতের রাজ্যে ভোর হবে।”
কথা শেষ। সভায় পিনপতন নীরবতা। কঙ্কালেশ্বর ধীরে ধীরে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাড়ের মুকুট খুলে পুঁটে ভূতের মাথায় পরিয়ে দিলেন।
“আজ থেকে তুমি আমার প্রধানমন্ত্রী। তোমার পরামর্শেই রাজ্য চলবে।”
তারপর থেকে পুঁটে ভূতের কথায় আইন হলো। মামদো-ব্রহ্মদৈত্যের দাপট কমল, পেত্নীরাও বিচার পেল। শ্মশানে আর গোপন মিটিং হলো না, কারণ যা বলার কথা এখন রাজসভায় বলা যায়।
ভূতের রাজ্যে সত্যিই শান্তি নেমে এল।
আর কঙ্কালেশ্বর বুঝলেন—তোষামোদে সিংহাসন টেকে না, সত্যেই টেকে। যে রাজা প্রজার দোষ শুনতে ভয় পায়, তার রাজ্যে অমাবস্যাই চিরকাল থাকে।
শিক্ষা: চাটুকারিতা কারাগারে নিয়ে যায়, সত্য সিংহাসনে বসায়। প্রজার কান্না যে রাজা শোনে না, তার মুকুট একদিন খসে পড়বেই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন