মায়ের পাত


ছোটবেলায় মাছের ঝোল হলে মা সবসময় মাছের পেটিটা আমার পাতে তুলে দিতেন। 
"নে বাবা, তুই খা। ব্রেন ভালো হবে।" 
নিজে নিতেন কাঁটা ভরা লেজের টুকরোটা, নয়তো শুধু ঝোলটুকু দিয়ে দুটো ভাত মেখে নিতেন।

কোনোদিন জিজ্ঞেস করলে বলতেন, "আমার আজ মাছ খেতে ইচ্ছে করছে না রে। সবজি দিয়েই পেট ভরে গেছে।" 
আমি ভাবতাম, মায়ের বোধহয় সত্যিই মাছ পছন্দ না। পেটি, গাদা — এসব খেতে ভালোবাসেন না।

বাবা বাজারে গেলে কতকিছু কিনে খাওয়াতেন, অথচ নিজে খেতেন না। আজ বুঝতে পারছি, প্রত্যেক মাবাবাই বোধহয় এরকম হয়। বাবা চলে গেলেন অনেক আগেই।  মা তখনও একই রকম। মুরগির রানটা, দুধের সরটা, পায়েসের বাটির তলার ঘনটুকু — সব আমার। মা খেতেন পোড়া রুটি, একটু আলুভাজি। বলতেন, "বুড়ো বয়সে অত ভালোমন্দ সয় না।"

তারপর একদিন মা-ও চলে গেলেন। ঘরটা ফাঁকা।

গতকাল অফিস থেকে ফিরে বউ ইলিশ মাছ রেঁধেছে। পেটির দুটো বড় টুকরো পাতে দিল। আমার ছ বছরের মেয়ে টুম্পা লাফিয়ে উঠল, "বাবা, মাছে কি কাটা আছে?পেটি আমি খেতে পারবো?"
"হ্যাঁ অবশ্যই পারবে।"আমি ইলিশ মাছের পেটি টা থেকে একটু কাটা বেছে ওর পাতে দিলাম। ও খেয়ে যতটুকু খুশি হলো তার দ্বিগুণ খুশি হয়ে আমি হাসতে গিয়েও থমকে গেলাম।"তুই খা মা। তোর ব্রেন ভালো হবে।" 
নিজে নিলাম লেজের অংশটা।

খেতে গিয়ে হঠাৎ গলাটা ধরে এল। বউ অবাক হয়ে তাকাল, "কী হলো? মাছ ভালো হয়নি?" 
আমি মাথা নাড়লাম। মুখে ভাত তুলতে পারছি না।

আজ বুঝি, মায়ের সেদিন খিদে ছিল। খুব খিদে ছিল। তবু সন্তানের পাতে মাছের সেরা টুকরোটা তুলে দিয়েই মায়েদের পেট ভরে যায়। ওটাই ওদের অমৃত। আমরা ভাবতাম, মা খায় না। আসলে মা আমাদের খাইয়েই খেয়ে নিত, তৃপ্তির ঢেঁকুর দিত।

মা, আজ যদি থাকতে, তোমার পাতে আমি পেটিটা তুলে দিতাম। বলতাম, "মা, আজ তুমি খাও। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।" 
জানি, তুমি বিশ্বাস করতে না। তবু আমার পেটটা ভরে যেত।

আজ বিশ্ব মা দিবস। যাদের মা আছে, প্লিজ, মায়ের পাতে সেরা টুকরোটা তুলে দিন। বাজার থেকে ফেরার পথে মায়ের জন্য একটা দই, একটা রসগোল্লা নিয়ে যান। 
কারণ একদিন এই সুযোগটা আর থাকবে না। তখন শুধু শুকনো ভাতের সাথে চোখের জল মেখে খেতে হবে। আর মনে হবে, হায়, ঋণটা শোধ করা হলো না।

মায়ের সেবাই হোক পাথেয়। কারণ মা থাকতে মায়ের মর্ম বুঝি না আমরা।

##মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা##

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়