মানসম্মানের খাঁচা



কৈলাস শহরের বড় বাবু কালাম সাহেব। অফিসে সবাই জানে—নিষ্ঠাবান, সৎ, মাটির মানুষ। একমাত্র ছেলে শাহেদ। স্কুল মাস্টার। বনেদি ঘর দেখে ধুমধাম করে বিয়ে দিলেন উচ্চশিক্ষিত মেয়ে নায়লার সাথে। ভেবেছিলেন, শিক্ষিত বউ এসে সংসারে আলো জ্বালাবে।

বিয়ের ছয় মাস না যেতেই ঘরে অশান্তির আগুন। নায়লা শাশুড়ির রান্নায় নাক সিঁটকায়, শ্বশুরের চা পান খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেয়। শাড়ি-সালোয়ার তার ভালো লাগে না। জিন্স-টপ পরে বাজারে ঘোরে। লোকে আড়চোখে তাকায়, কালাম সাহেব মাথা নিচু করেন।

“এই ছোট শহরে দম বন্ধ লাগে,” নায়লা রোজ শাহেদের কানে বিষ ঢালে। “চলো শহরে যাই। শ্বশুর শাশুড়ির জ্বালাতন আর ভালো লাগে না। শহরে কুঁড়ে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকলেও শান্তি পাবো।”

মান-সম্মানের ভয়ে কালাম সাহেব নিজেই ছেলেকে ডেকে বলেন, “যা বাবা, অশান্তি ভালো না। আলাদা থাক।” মা আঁচলে চোখ মোছেন, “বাবা শাহেদ, নিজের খেয়াল রাখিস।”

শহরের ভাড়া ঘর। শাহেদ স্কুলে যায়, ফিরে এসে বাজার করে, রাঁধে। নায়লারও স্কুলে চাকরি হলো। এখন ‘ডিউটি’র নামে সকাল আটটায় বেরোয়, ফেরে সন্ধ্যা ছটায়, কখনো বা রাত নটায়। ফোন ধরলে কেটে দেয়। জিজ্ঞেস করলে বলে, “স্টাফ মিটিং ছিল, কখনো বা বলে বান্ধবীর বাসায় নেমন্তন্ন --- তুমি সন্দেহ করো কেন?”

আশপাশের মানুষ ফিসফিস করে। পাড়ার দোকানদার একদিন শাহেদের কানে ফিসফিস করে, “মাস্টার, ভাবিকে তো কাল রেস্টুরেন্টে দেখলাম। সাথে তিনটা ছেলে।” শাহেদের বুকের ভেতর মোচড় দেয়। রাতে জিজ্ঞেস করতেই নায়লা তেড়ে আসে, “আমার স্বাধীনতায় হাত দেবে না। তোমার বাপ-মা গ্রামের ভূত, আমাকে পায়ে বেড়ি পরাতে চায়? তুমিও সেই গেঁয়ো রয়ে গেলে। আমরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। এ যুগের ছেলেমেয়েরা পার্কে রেস্টুরেন্টে কিভাবে চলাফেরা করে তা তোমার চোখে পড়ে না?"

ঝগড়া রোজকার রুটিন। নায়লা ইচ্ছে করে রাঁধে না। যদিও বা সামান্য রাঁধে, মশলা থাকে তো লবণ নেই। বাধ্য হয়ে শাহেদকে রাঁধতে হয়। সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু শান্তিতে দুমুঠো ভাত খাবে তাও তার কপালে জোটে না।  নায়লা মিছেমিছি কথা কাটাকাটি করে, প্লেট ছুঁড়ে মারে। পুরুষ মানুষ, কতটুকু সহ্য করবে?

শাহেদ রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে। ভাবে, নারী নির্যাতনের আইন আছে, হেল্পলাইন আছে। কিন্তু স্ত্রীর হাতে যে পুরুষ লাঞ্ছিত হয়, তার জন্য আইন নেই, কোনো থানা নেই। বলতে গেলে লোকে হাসবে—“বউ সামলাতে পারে না, কেমন ব্যাটা?”

নায়লার বাপের বাড়ি নালিশ করতে গেল কালাম সাহেব। বেয়াই হাসলেন, “আমার মেয়ে শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা। আপনার ছেলের মানসিকতা সেকেলে। ওকে অ্যাডজাস্ট করতে বলুন।”

শেষে একদিন ব্যাগ গুছিয়ে নায়লা বাপের বাড়ি চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, “ডিভোর্স চাই। কাবিনের টাকা রেডি রেখো।”

শাহেদ ফিরে এল কৈলাস শহর। বাপের মুখ কালো। নায়লার বাবা কোর্টে মামলা ঠুকেছেন। ছেলেকে মিথ্যে মামলায় নারী নির্যাতনের অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে, সঙ্গে আসামি ওর মা বাবাও। 
শাহেদ সাহেব মধ্যস্থ অনেক মাতব্বর ডাকলেন, বিচারসভা বসাতে চাইলেন। যেমন করে হোক মানসম্মান নিয়ে বাঁচতে হবে। ওদিকে নায়লার বাপও ছাড়বেন না। বললেন, “আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।”

কেস চলছে। শাহেদ না পারে আবার বিয়ে করতে, না পারে সমাজে মুখ দেখাতে। স্কুলে ছাত্ররা ফিসফাস করে, পাড়ার লোক আঙুল তুলে। 

রাতে কালাম সাহেব বারান্দায় বসে থাকেন। সৎ মানুষের তকমাটা আজ বোঝা লাগে। নীরবে চোখের জল ফেলেন। “হে আল্লাহ, আমি কী দোষ করলাম? শুধু সংসারে একটু শান্তি চেয়েছিলাম।”

কালাম সাহেব আকাশের দিকে তাকান। সর্বত্রই শোনা যায়—“নারী-পুরুষ সমান অধিকার…”। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অধিকার আছে, কিন্তু তাঁর ছেলের মতো শাহেদদের কান্না শোনার কোনো আইন নেই।

এই সমাজটা শুধু নারীর কান্না দেখে, পুরুষের নীরব রক্তক্ষরণ দেখে না। মান-সম্মানের খাঁচায় বন্দী কালাম সাহেবরা আজও ভাবে—ছেলের সুখ কিনতে গিয়ে নিজেরাই কি সব হারালাম? আর শাহেদরা বোঝে, আইনের চোখে সবাই সমান নয়। কারো জন্য আইন ঢাল, কারো জন্য ফাঁস।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়