প্রকৃতির কান্না
সে অনেক দিন আগের কথা। বসন্ত এসেছে বনে। শিমুল-পলাশের লাল আগুনে প্রকৃতি মাতোয়ারা।জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক বুড়ো বটগাছ। তার ডালে ডালে সংসার পেতেছে শালিক, ময়না, টিয়ে, ঘুঘু, দোয়েল। কেউ ডিমে তা দিচ্ছে, কেউ ঠোঁটে করে খড়কুটো আনছে, কেউ সদ্য ফোটা ছানার মুখে পোকা গুঁজে দিচ্ছে। কিচিরমিচিরে সারা বন মুখরিত।
এক দুপুরে হঠাৎ ‘ঠকাস’ শব্দ। বুড়ো বট কেঁপে উঠল। নিচে তাকিয়ে পাখিদের বুক শুকিয়ে গেল। এক কাঠুরে, কাঁধে কুড়াল, গাছের গোড়ায় ঘা মারছে।
“ঠকাস! ঠকাস!” প্রতিটি কোপে গাছের ছাল ছিটকে পড়ে, সাথে ছিটকে পড়ে পাখিদের কলিজা। ডিমের ভেতর ছানারা নড়ে ওঠে। মা-পাখিরা ডানা ঝাপটে চিৎকার জুড়ে দেয়—“বাঁচাও, বাঁচাও!”
সাহস করে সব পাখি একসাথে নেমে এল কাঠুরের সামনে। শালিকটা ঠোঁট জোড় করে কাঁদল, “হে মানব, ঈশ্বরের দোহাই, এখন গাছটা কেটো না। দেখো আমাদের বাসায় ডিম, ছানা। ওরা উড়তে শেখেনি। গাছ পড়লে ওরা থেঁতলে মরবে।”
কাঠুরে হা করে হাসল। “তোদের কথা শুনলে আমার পেট চলবে? এই গাছ বেচলে দু’মাসের চাল আসবে। সর সামনে থেকে।” কুড়াল চলতেই থাকল।
বটগাছটাও কুড়ুলের আঘাতে কাঁদতে শুরু করল। এই অবস্থা দেখে তার ছায়ায় বেঁচে থাকা আগাছা ও পার্শ্ববর্তী গাছপালাও অঝোরে কাঁদতে লাগলো। প্রকৃতির কান্নায় আকাশ বাতাস মুখরিত।
বুড়ো সিংহ তখন গুহায় ঝিমোচ্ছিল। প্রকৃতির কান্না শুনে তার ঘুম ভাঙলো। এদিকে নিরুপায় পাখিরা উড়ে গেল বনের রাজা সিংহের কাছে। এদের কথা শুনে তার কেশর ফুলে উঠল। গম্ভীর পায়ে এসে দাঁড়াল কাঠুরের সামনে।
“হে মানব, থামো।” সিংহের গর্জনে পাতা ঝরে পড়ল। “এই গাছে শত প্রাণের বাস। তুমি তো জ্ঞানী মানুষ। জানো না, প্রাণী হত্যা মহাপাপ? এখন কাটলে ডিমের ভেতরেই ওরা মরবে। ওদের মারার অধিকার কে দিল তোমাকে?”
কাঠুরে কুড়াল উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠল, “তুই আমায় ধর্ম শেখাবি? ঈশ্বর সব বানিয়েছে মানুষের জন্য। পশুপাখি খাই, মাছ খাই, গাছ কাটব না? সরে যা, নইলে তোর মাথাও দু’ফাঁক করব।”
সিংহ তবু হাত জোড় করল। “যে ঈশ্বর তোমায় বানিয়েছেন, এই পাখিদেরও তিনিই বানিয়েছেন। বলো, তুমি কি একটা ডিমে প্রাণ দিতে পারো? একটা পাতা গজাতে পারো? এই গাছগুলোই তো তোমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। এরা অক্সিজেন দেয় বলেই তুমি শ্বাস নাও। গাছ না থাকলে তোমার নাতি-নাতনিরা দম বন্ধ হয়ে মরবে।”
“চোপ! জ্ঞান দিস না।” কাঠুরে কুড়াল চালাতে যাবে, ঠিক তখনই শুকনো পাতার ভেতর থেকে ফোঁস করে উঠল এক কালনাগিনী। বিদ্যুৎবেগে ছোবল বসাল কাঠুরের পায়ে।
“আআহ্!” কাঠুরে কুড়াল ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মুহূর্তে সারা গা নীল হয়ে গেল। বিষে জ্বলতে জ্বলতে সে দেখল—যে গাছটাকে সে মারতে এসেছিল, তারই শিকড়ের ফাঁকে থাকা সাপ তাকে মারল। যে পাখিদের সে তুচ্ছ করেছিল, তারাই এখন ডালে বসে তার মরণ দেখছে।
দম্ভের বিষ দাঁত ভেঙে গেল। কাঁপা গলায় বলল, “আমায় ক্ষমা করো বনের রাজা… আমি বুঝিনি…”
সিংহ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ক্ষমা করবে প্রকৃতি, ক্ষমা করবে এই বট। কিন্তু মনে রেখো মানব, তুমি সৃষ্টির মালিক নও, শুধু একজন ভাড়াটে। যেদিন বাড়িওয়ালা রাগ করবে, সেদিন কুড়াল নয়, একটা পিঁপড়েও তোমায় শেষ করতে পারে।”
কাঠুরে আর উঠল না। তার নিথর দেহটা পড়ে রইল বটের ছায়ায়।
বসন্তের বাতাসে আবার কিচিরমিচির উঠল। মা-পাখিরা ছানাদের বুকে টেনে নিল। বুড়ো বটগাছটা পাতা দুলিয়ে সিংহকে ছায়া দিল। সব পাখি একসাথে গাইল, “বনের রাজা দীর্ঘজীবী হোক।”
কুড়ালের ধার সবসময় জেতে না। যেদিন প্রকৃতি রুখে দাঁড়ায়, সেদিন মানুষের দম্ভ এক ছোবলেই চুরমার হয়। মনে রেখো, গাছ বাঁচলে প্রাণ বাঁচে। প্রাণ বাঁচলে তুমিও বাঁচো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন