জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্ব -০১
সুবোধ ও সত্যেন একই শ্রেণীতে পড়ে। সুবোধ পড়াশুনায় খুব ভাল। প্রতি বৎসর ক্লাসে প্রথম হয়। আর সত্যেন? মাবাবার একমাত্র আদরের ছেলে। শুধু স্কুলে যাওয়া আসাই সার। যেন স্কুল একটা টাইম পাসের জায়গা। কথায় বলে " সৎ সঙ্গে সর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।' কিন্তু এদের বেলায় ঠিক বিপরীত। সত্যেন সুবোধের সাথে বন্ধুত্ব রাখে শুধু পরীক্ষা পাশের জন্য। রোজই সে সুবোধকে কত কিছু কিনে খাওয়ায় তার সাথে বন্ধুত্ব রাখে উদ্দেশ্য পরীক্ষায় পাশে বসে দেখে দেখে লিখে পাশ করবে। কিন্তু এভাবে কতদিনই বা চলে? অষ্টম থেকে দশম, তারপর মাধ্যমিক ফাইন্যাল পরীক্ষা। পরীক্ষায় সুবোধ প্রথম বিভাগে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করে আর সত্যেন ফেল করে বসে। কারণ এবার আর দুজন একসাথে বসে পরীক্ষা দিতে পারলনা। বাবার আদরের ছেলে সত্যেনের পড়ার এখানেই ইতি টানতে হল। অবশ্য আরও দু তিন বার সে পরীক্ষায় বসেছে কিন্তু পাশ করা আর হয়ে উঠলো না। শুরু হলো ওর ভবঘুরে জীবন।
অন্যদিকে সুবোধ মাধ্যমিক পরে উচ্চ মাধ্যমিক তারপর বি এ পাশ করে এরপর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। যদিও দুজন দুই মেরুতে, তাদের সম্পর্কে কোন চিড় ধরেনি। অবসর সময়ে ঠিক আগের মতোই হাসি ঠাট্টা, একসাথে চলাফেরা যেন কোথাও কোন তফাৎ নেই। একে অপরকে পুরো বিশ্বাস করতো আর মনের কথা খুলে বলত।
ইউনিার্সিটিতে ভর্তি হয়ে সুবোধের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। মেয়েটির নাম লিলি। দুজনে প্রথমে হয় বন্ধুত্ব। তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্কটা গভীর হয়ে যায়। সুবোধ গরীব ঘরের ছেলে। আর লিলি? সেতো ইউনিভার্সিটির অধ্যক্ষের মেয়ে। বাবা কোটিপতি। নিজে কার চালিয়ে যখন তখন বেড়াতে বেরিয়ে পড়ে।
সেদিন সে সুবোধকে গাড়িতে বসিয়ে পার্কে চলে যায়। সেখানে বসে কথা বলতে বলতে একসময় লিলি সুবোধ কে খোলাখুলি বলেই ফেললো, জানো সুবোধ " আমার স্বপ্ন শুধুই তুমি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"
সুবোধ ভয় পেয়ে যায়। " এ কী কথা? কোথায় তুমি আর কোথায় আমি! এটা কোনোদিনই সম্ভব না। তোমার বাবা যদি জানতে পারেন আমাকে শেষ করে দেবেন। লিলির চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো। বলে" তা হলে তুমি আমাকে মেরে ফেলো।" বলে ওর হাত দুটো টেনে নিজের গলায় চেপে ধরলো। সুবোধ কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। অযথা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বলে " আজ আমার খুব তাড়া আছে। চলো যাই, কাল কথা হবে।
সেদিন রাতে সুবোধের ঘুম হয়নি। বার বার লিলির ওই কথাটিই ওর মনে পড়ছিল,"তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব ন!" নিজের অজান্তে সেও লিলিকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু তার গরিবী যে এ ভালোবাসার অন্তরায়। ভাবতে ভাবতে তার মনটা ভারী হয়ে উঠলো। ভাবলো সত্যেনকে সে কথাগুলো বলবে, তাতে যদি কোন উপায় হয়, যদি মনটা হাল্কা হয়।
পরদিন সকাল সকাল সে সত্যেন এর সাথে দেখা করে সমস্ত কথা খুলে বললো। সত্যেন সব শুনে বললো' চিন্তার কোন কারণ নেই। সে যখন তোকে এত ভালোবাসে সে নিজেই ওর মাবাবাকে ম্যানেজ করবে। এমন মেয়ে তুই হাতছাড়া করিস না।'
সত্যেনের কথায় সে একটু আশ্বস্ত হল। তার মনটা একটু হাল্কা হল। বললো " বন্ধু তুই এখন থেকে আমাকে একটু সঙ্গ দিবি। একমাত্র তুইই আমার ভরসা। আজ বিকাল চারটায় ওর সাথে দেখা করার কথা। তুই আমার সঙ্গে যাবি। সত্যেন তার কথায় রাজী হল।
বিকেল চারটায় দু'বন্ধূ মিলে লিলির সাথে পার্কে দেখা করতে গেল। সেখানে লিলি আগে থেকেই বসেছিল। সুবোধ লিলির সাথে সত্যেনের পরিচয় করিয়ে দিতে লিলি থতমত খেয়ে গেল। সত্যেন ঠুট বাঁকা করে কপট একটা হাসি দিয়ে বললো" ও এই বুঝি তোর লাভার, উনাকে তো আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। উনিতো বিশ্বম্ভর বাবুর আদরের মেয়ে"। 'যাই হোক পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় ভালোই হল। তুই আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু আর এই সুবাদে লিলিও আমার ফ্রেন্ড হয়ে গেল।'
লিলি মাথা নিচু করে বসে আছে। মনে মনে ভাবল ভালো না ছাই। ওর মনে পড়ল, একসময় এই সত্যেন তার সাথে সম্পর্ক করার জন্য কী না করেছে।
সে তো বেশী দিনের কথা নয়। সত্যেন এর বাবার ট্রান্সফার হয়েছিল লিলিদের শহরে আর ওরা থাকত লিলিদের পাশের বাসায়। লিলিকে দেখে একে একে সব কথা সত্যেনের মনে পড়ল। লিলিকে পাওয়ার জন্য কোনো চেষ্টাই সে বাকি রাখেনি। অথচ সেই লিলি আজ সুবোধ এর মত একটা গরীব ঘরের ছেলের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে।
সে মনে মনে ফন্দি আঁটে এদের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বন্ধুত্ব করবে আর সময় সুযোগে যেমন করেই হোক লিলিকে তার চাই।
কেউ কথা বলছে । সুবোধই নীরবতা ভঙ্গ করল, 'এই চল আমরা ওখানে গিয়ে বসি।'
তারা তিনজন আরাম কেদারায় গিয়ে বসল। অনেক্ষণ ধরে সেখানে তাদের কথোপকথন চলল।
এই ভাবে দিনের পর দিন একসাথে দেখা সাক্ষাৎ, চলা ফেরা আলাপ আলোচনায় তাদের সখ্যতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠলো।
ইতিম্যে লিলি ভুলে গেল সত্যেন যে এক সময় তার সাথে সম্পর্ক করতে ব্যাকুল ছিল । তখন সে এক মুহূর্তের জন্যও তাকে সহ্য করতে পারতো না। অথচ এখন এমন হয়েছে যে একদিন সত্যেন এর অনুপস্থিতি সুবোধ ও লিলি দু জনেরই সহ্য হয় না।
এ ভাবে আরও দু তিন বছর অতিক্রান্ত হল। লিলি ইকোনোমিক্স বি এ অনার্স পাশ করল।
বিশ্বম্ভর বাবু এ বছর ঘটা করে মেয়ের জন্মদিন পালন করবেন। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব কাউকে নিমন্ত্রণ দিতে বাকি রাখলেন না। লিলিকে ওর সকল বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করার জন্য বললেন।
লিলি সকল সহপাঠী ও বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করল। সুবোধ ও সত্যেন কে স্পেশাল ভাবে নিমন্ত্রণ দিতে ভুল করল না।
সুবোধ নিমন্ত্রণ পেয়ে লিলিকে বলল "আমার খুব লজ্জা হচ্ছে, কি নিয়ে যাবো, তাছাড়া পার্টিতে যাওয়ার মত আমার তেমন ভাল ড্রেস নেই।" লিলি কি বলতে যাবে এমন সময় সত্যেন বললো," সেটা আমি দেখবো, তোকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না।" সত্যেন লিলিকে আশ্বস্ত করল,"লিলি তুমি চিন্তা করনা, আমি ঠিক সময়ে ওকে নিয়ে হাজির হব।"
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন