জীবনের ঘুর্ণিপাকে ( পর্ব -০৩)



সেদিন সুবোধের পালা। তাই সুবোধকে রোগীর পাহারায় রেখে সত্যেন লিলি ও তার মা এর সঙ্গে বাড়িতে চলে যায়। রাতে শুয়ে শুয়ে সত্যেনের মাথায় নানা চিন্তা এসে ঘোরপাক খেতে লাগল। এপাশ ওপাশ করতে করতে কোন অবস্থাতেই তার ঘুম আসছিল না।  লিলির কথাই ভাবছিল। ওর জন্য সে কীনা করেছে, অথচ সে যেন তাকে পাত্তাই দেয় না। মনে হয় সুবোধ ই তার কাছে বেশি প্রিয়। ভাবতে ভাবতে মনে জ্বালা শুরু হয়ে গেল। ওর মাথায় এক কু বুদ্ধি আসলো। এতদিন থেকে লিলিকে পাওয়ার যে সুযোগ খুঁজছিলো আজ সে সুযোগটা হাতছাড়া করবেনা। ভাবনাটা তাকে অস্থির করে তুলল। সে চলে গেল সেই হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছে দেখে সুবোধ ঝিমোচ্ছে। রাত তখন সাড়ে বারোটা। চেয়ে দেখে রোগী ঘুমাচ্ছেন, তখনও অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানো। অনেক্ষণ সত্যেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অবস্থা নিরীক্ষণ করল। অনুমান করল সুবোধ ঘুমে আচ্ছন্ন। এই সুযোগে সে রোগীর অক্সিজেন সিলিন্ডার ডিসকানেক্ট করল এবং সঙ্গে সঙ্গে বালিশ চাপা দিয়ে বিশ্বম্ভর বাবুকে খুন করে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
ভোর চারটার সময় সুবোধের ঘুম ভাঙলো। চেয়ে দেখে বিশ্বম্ভর বাবুর বিছানা পত্তর সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আর হাত পা একেবারে সোজা। সিলিন্ডারটাও ডিসকানেক্ট। সমস্ত পরিস্থিতি আঁচ করে সুবোধের গা শির শির করে উঠল। কে এই কাজ করতে পারে? এখানে তো সে একাই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সে লিলি ও সত্যেনকে ফোন করল। ফোনটি রাখতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল মৃতের পাশে একটি মুচড়ানো কাপড়। হাতে নিয়ে দেখে এটাতো একটা রুমাল। এটা গত সপ্তাহে সে সত্যেনকে দিয়েছিল। এটা পেয়ে ওর কাছে সব পরিষ্কার হয়ে গেল, এ কাজ তাহলে সত্যেনের।
ফোন পেয়ে ওরা তাড়াতাড়ি এখানে এসে পৌঁছলো। ইতিমধ্যে এখানে ভিড় জমে আছে। সত্যেন এসেই বললো এ কাজটা নিশ্চয়ই সুবোধের। রাত নিশিতে একমাত্র সে ই তো একা এখানে ছিল। লিলিকে বিয়ে করে বিশ্বম্ভর বাবুর সম্পত্তির মালিক হবে এই লোভেই সে এ কাজটি করেছে। সত্যেনই বিশ্বম্ভর বাবুকে খুন করেছে।
ইতিমধ্যে থানা পুলিশও এখানে এসে গেছে। সুবোধ রুমালটি দেখিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করল। কিন্তু বলতে পারলো না। তার এই অব্যক্ত কথা ও বেদনা লিলি ঠিকই ঠাহর করে নিল। কারণ এই রুমালটির সাথে লিলির পরিচয় ছিল। সত্যেনের হাতে এ রুমালটি সে অনেক বারই দেখেছে।
লিলি সঙ্গে সঙ্গে তার মা কে এই রুমালের কথা বলে সত্যেনের উপর যে সন্দেহ তা প্রকাশও করেছিল। কিন্তু তখন তার কথা কে ই বা শুনে?
 মৃতের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবচনায় এটা পরিকল্পিত মার্ডারই প্রমাণিত হল। মৃতের সৎকারের ব্যাবস্থা করা হল আর সুবোধকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল।
###
দু তিন দিন পর সত্যেন লিলিদের বাড়িতে দেখা করার জন্য আসল। লিলির মা অসীমা দেবী তখন আঙিনায় বসে কাজ করছিলেন।
সত্যেন এসেই বলল,"মাসিমা লিলি কোথায়? ওই সুবোধের জন্য খুবই খারাপ লাগছে, বেচারা---।" অসীমা দেবী লিলিকে ডাকলেন।
লিলি ঘর থেকে ওর কথাগুলি শুনছিল। বলল, "মা, ওকে বলে দাও চলে যেতে। আর কোনোদিন যেন এখানে না আসে। আমি ওর মুখ দেখতে চাই না।"
লিলির কথা গুলো যেন সত্যেনকে তীরের মত বিদ্ধ করল। সে বুঝতে পারল লিলি তাহলে তাকে সন্দেহ করছে? 
সে অসীমা দেবীকে বলল," মাসিমা কোথাও যেন একটা ভুল হয়ে গেছে। ঐ দিন রাতে যদি আমি বাড়িতে না আসতাম তাহলে হয়ত এমন অঘঠন ঘটতো না। প্রিয় বন্ধু সুবোধের এখন কি হবে ভেবে আমার বুকটা দুরুদুরু করছে। যদি ওর জেল হয়ে যায়?"
লিলি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বেরিয়ে এসে বলল," ওর জেল হলে তাতে তোমার কি? তুমি তো তাই চাইছ। তোমার সাথে বন্ধুত্ব করাই ওর কাল হয়েছে।
সত্যেন অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,"তুমি কি বলতে চাইছ? সুবোধ ছাড়া তো ঐ দিন ওখানে আর কেউ ছিল না। তুমি প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছ, তাই যা তা বলছ।"
অবস্থা বেগতিক দেখে অসীমা দেবী মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন," তুই ভেতরে যা।" আর সত্যেনকে বললেন' তুমি অন্য দিন এসো। এই বলে তিনি লিলিকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। সত্যেন মাথা নিচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

(ক্রমশঃ)

মন্তব্যসমূহ