জীবনের ঘূর্ণিপাকে (পর্ব ০৪)
বিচারে সুবোধের পনেরো বছরের জেল হয়ে গেল। শুনামাত্র লিলি হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠলো। পরদিন মা'কে নিয়ে সে সুবোধের সাথে দেখা করতে গেল। লিলি কোন মতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না, তার অন্তরাত্মা বলছে সুবোধ এরকম কাজ করতে পারে না।
জেলে দেখা করতে গেলে সুবোধ এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বলল " যা হবার তা হয়ে গেছে, আমি খুনের অপরাধী। তোমার দুটি হাত ধরে বলছি, তুমি আর কখনো আমার সাথে দেখা করতে এসো না।"
লিলি কাঁদতে কাঁদতে বলল," তুমি বলো তুমি খুন করনি।, আমি জানি তুমি খুন করতে পারোনা। আমি কথা দিচ্ছি আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো। সুবোধ চট করে জবাব দেয়," না লিলি না। তুমি বিয়ে কর, সংসারী হও, আমার দিব্যি রইল, জীবনটা এমনি এমনি নষ্ট করোনা।" কথা কটা শেষ হতে না হতেই জেইলার এসে লিলিকে বলল" দেখা করার সময় শেষ" লিলি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল।
ইতিমধ্যে কয়েকদিন সত্যেন লিলির সাথে ফোনে কথা বলতে চেয়েছিল। প্রথম দুই এক দিন একটু আধটু কথা হয়েছিল , তাও লিলি এখন বন্ধ করে দিয়েছে।সত্যেনের সাথে সে কোন সম্পর্ক রাখতে চায়নি।
শেষ পর্যন্ত সত্যেন একদিন নিজের মা'কে পাঠিয়ে ছিল লিলিদের বাড়ি, বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে। লিলি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু তাই নয়, রীতিমতো অপমানিত হয়ে মা ফিরে এসেছেন। মায়ের এ অপমানের কথা শুনে সত্যেনের নিজের উপর রাগ হল। ক্ষোভে দুঃখে জর্জরিত হয়ে নেশা পান করতে শুরু করলো। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিতে লাগল। ওর জীবনটা বিষময় হয়ে উঠলো। কৃতকর্মের জন্য সে অত্যন্ত অনুতপ্ত হলো। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার মতো জায়গা পেলো না।
###
এদিকে লিলির বিয়ের বয়স হয়েছে। অনেক ভাল ভাল জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছে। মা অসীমা দেবী অনেক করে বোঝালেন। কিন্তু ওর সোজা কথা, আমার ভাগ্যে বিয়ে লেখা নেই, আমি বিয়ে করবো না।"
মা জোর করে চেপে ধরলেন। বললেন" আমি আর কতদিন আছি,বয়েস হয়েছে। তাছাড়া এখানে আমাদের আপন বলতে কেউ নেই। তোর ভবিষ্যৎ টা একটু চিন্তা কর।" লিলি বললো," না মা, তুমি একটুও ভেবো না। আমি কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। একটা না একটা কিছু জব পেয়ে যাবো। তাহলে আর কোন সমস্যাই থাকবেনা।"
হলোও তাই। হঠাৎ একদিন লিলি মা'কে বললো " মা একটা কোম্পানি আমাকে কল দিয়েছে , বেঙ্গালুরু থেকে। প্রাইভেট কোম্পানি। বছরে সাত লক্ষ টাকার প্যাকেজ। আমি গিয়ে জয়েন করে এক সপ্তাহ পর তোমাকে এসে নিয়ে যাবো।
মা একথা শুনে ভাবনায় পড়ে গেলেন। " কিন্তু তুই মেয়ে মানুষ, আর একা - ----?"
লিলি সাহস দিয়ে বললো" ওসব তুমি চিন্তা করো না, আমি পারবো।"
লিলি কোম্পানিতে জয়েন করলো।
যথারীতি এক সপ্তাহ পর যাবতীয় আসবাবপত্র সহ মা'কে এসে নিয়ে গেল।
এদিকে জেলে সুবোধ সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলো। একদিন সবাই তাকে চেপে ধরল, কোন অপরাধে তার মতো একজন উচ্চ শিক্ষিত ছেলের জেল হলো। সুবোধ আদ্যপান্ত ঘটনা সবাইকে খুলে বললো। শুনে সবাই আফসোস করলো , আর তখন থেকে সুবোধ সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠলো।জেইলার ও অন্যান্য কর্মকর্তারাও তার আচার ব্যবহারে মুগ্ধ।
একদিন সুবোধ জেইলারকে অনুরোধ করল একটু কাগজ কলম দেওয়ার জন্য। সে জেলে বসে লিখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। ঐদিন সঙ্গে সঙ্গে তাকে কাগজ কলম আনিয়ে দেওয়া হল। সুবোধ লিখতে আরম্ভ করলো।
ওদিকে লিলিদের চলে যাওয়ার খবর সত্যেনকে আরও অনুতপ্ত করে তুললো। দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় রাতে ওর ঘুম হয়না। বার বার লিলির বাবার সেই মৃত্যুর দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বেচারা বাচার জন্য কত চেষ্টাই না করেছে।
আর সুবোধ? সেতো তার জন্য ই আজ জেলে। অথচ যাকে পাওয়ার জন্য সে দুটো জীবন নষ্ট করল, সেও তাকে ঘৃণা করে। এসব ভাবতে ভাবতে তার নিজের উপর নিজের ঘৃণা হয়। কৃত কর্মের জন্য জীবনটা যেন তার কাছে নরক হয়ে উঠলো। দিনরাত যেন সেই মৃতের আত্মা তাকে তাড়া করছে। রাতে প্রায়ই ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে উঠে।কখনো কখনো পাগলের মত প্রলাপ বকতেও শুনা যায়। বাবা তাকে অনেক ডাক্তার বদ্যিও দেখালেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষে এমন হলো যে মানুষ দেখলেই ভয় পায়। ঘর থেকে বের হতে চায়না।সারাদিন ঘরে পাগলের প্রলাপ করে।
ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন