জীবনের ঘুর্ণিপাকে পর্ব ০২
৫ ডিসেম্বর লিলির জন্মদিন। সবাই উপস্থিত। বার্থডে ক্যাণ্ডেল জ্বলবে, কেক কাটা হবে। লিলি বার বার ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে আর বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখছে। আজ যেন ওর বিশেষ কোনো অতিথি আসছে।
মা তাকে ডেকে বললেন,' কেক্ কাটার সময় হয়েছে,।' সে বলল আসছি মা, আরও দু একজন বাকি আছে।'
সবাই অবাক হয়ে অপেক্ষায়, কে সেই বিশেষ অতিথি যার জন্য লিলি অপেক্ষা করছে।
সেই মুহূর্তে সুবোধ ও সত্যেন সেখানে এসে উপস্থিত।
সত্যেন খুব বড় একটা পুতুল হাতে নিয়ে পাশে এসে দাড়ালো। সে জানতো লিলি পুতুল খুব ভালোবাসে। তারা যখন তাদের পাশের বাড়িতে ছিল, একদিন একটি বিড়ালের ধাক্কায় তার একটা পুতুল ভেঙ্গে গিযেছিল। সে দিন কি কান্না! ওই দিন সে ভাত ই খায়নি। তাই ভাবলো লিলি পুতুলটা পেয়ে খুব খুশি হবে। কিন্তু আজ সুবোধের হাতে একটা ফুলের তোড়া দেখে সে যেন আত্মহারা। ' Waw! কী সুন্দর ফুল!' বলে ওটা হাতে নিয়ে মাকে দেখালো। সে সুবোধ ও সত্যেনকে মা-বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
বার্থডে ক্যান্ডেল জ্বালানো হল,কেক কাটা হল। সবাই একসাথে উইশ করলো 'হ্যাপি বার্থডে টু লিলি'। রেকর্ডে বার্থডে গান বেজে উঠল। খুব আনন্দ মূখর পরিবেশ। ছোট বড় সবাই গানের তালে তালে নাচছে। এরই মধ্যে হঠাৎ লিলির বান্ধবী পায়েল বলে উঠলো 'আজ লিলির কণ্ঠে গান শুনব।' সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাকে চেপে ধরল, গান শুনার জন্য। সূযোগ পেয়ে সত্যেনও বললো ' হাঁ শুনেছি লিলি গান গায়, কিন্তু নিজের কানে কোন দিন শুনিনি বা চোখেও দেখিনি। আজ তাহলে একটা গান শুনা যাক।'
সবার পিড়াপিড়িতে লিলি গান ধরলো
' আমার এ আঁধার জীবনে
আলো হয়ে দিলে জোসনা--,
তাইতো মনের গহীনে আছো
তুমি যেন ভুল বুঝোনা--।।
হীরা পান্না সোনা দানা
এজীবনে কভু আমি চাহিনা,
বকুলের মালা গেঁথে রেখেছি
তুমি যেন ভুল বুঝোনা--।।
ঊষার শরতে যদি কভু
আসে বারিধারা --
ভিজে যাবো সেথা আমি
তুমি শুধু ভুল বুঝোনা--।।
গান শেষে সবাই হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। গানের রেশ যেন আর থামতেই চায় না। অনেকক্ষণ চললো হাসিঠাট্টা। এবার লিলি আর তার মা-বাবা সকল অতিথিদের আপ্যায়ন করল। অতঃপর রাতের খাবার খেয়ে সবাই বিদায় নিল। শুধু সুবোধ ও সত্যেনকে লিলি পাশের ঘরে নিয়ে বসিয়ে রাখল।
অন্যান্য সকল অতিথি চলে যাওয়ার পর লিলি ওর মা-বাবার সাথে দু বন্ধুকে নিয়ে খেতে বসল। খেতে খেতে সে এদের সম্মন্ধে কত কথাই না বললো । বিশেষ করে সুবোধের প্রশংসায় যেন সে পঞ্চমুখ। শুভঙ্কর বাবু কিছুটা আঁচ করতে পেরে বললেন,' তোমরা দুজনকে পেয়ে খুব ভালই হল। তোমরা দুজন সব সময় এসো বাবারা'। লিলি খুব খুশি ,তার মাবাবাও তাদের সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছেন। সুবোধ ও সত্যেন দুজনই লিলিদের বাড়িতে অবাধ আসা যাওয়া করে। লিলির মা-বাবা এ তিনজনের বন্ধুত্বে মুগ্ধ। তা হবেন না ই বা কেন। একমাত্র লিলি ছাড়া আর কে ই বা আছে তাদের। সুবোধ ও সত্যেন দুজনকে পেয়ে যেন তাদের একাকীত্ব আরও কিছুটা লাঘব হল।
####
দিন গড়িয়ে যায়। সত্যেন কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায়। যেমন করেই হোক লিলিকে তার চাইই। চোখের সামনে বন্ধু সুবোধ ও লিলির ভালোবাসা কতই বা সহ্য করবে? এদের কথা ভাবতে ভাবতে রাতে তার ঘুমই হয় না।
সুবোধ কিন্তু আজ অব্ধি লিলিকে নিয়ে ঘর বাঁধার কথা চিন্তা ই করতে পারে না। সে জানে তাকে ছাড়া লিলি বাঁচবে না, তবু। সে গরীব, সে ওর উপযুক্ত নয়। যা সত্য তা তো মেনে নিতে হবে।
হঠাৎ একদিন রাতে সুবোধ ফোন পেলো লিলির বাবার স্ট্রোক হয়েছে। তাকে নিয়ে মেডিক্যাল যেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সে সত্যেনকে ফোন করে। দু বন্ধু এসে তাকে হসপিটাল নিয়ে গেল। লিলি ও তার মা সঙ্গে গেল। লিলির বাবাকে আই সি ইউ তে ভর্তি করা হল। পরদিন ডাক্তার জানালেন তিনি এখন বিপদ মুক্ত। তবে উনার নিউোনিয়া হয়ে গেছে এবং পুরো কিওর হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। তাকে একটা কেবিনে অ্যাডমিশন দেওয়া হল।
এবার সবাই মিলে পরামর্শ করল, রোগীকে তো আর একা রাখা যাবে না। তাই পালা করে পাহারা দিতে হবে। সুবোধ ই প্রথমে বলল," মাসিমা আর লিলি আজ এখানে থাকবে'। কাল সকাল দশটায় সে আর সত্যেন এসে তাদের রিলিভ দেবে। সব কিছু বুঝিয়ে সমঝিয়ে তারা দু বন্ধু বাড়িতে চলে গেল।
পরদিন যথারীতি তারা এসে লিলি ও তার মা কে বাড়ি পাঠালো, আর বললো তাদের আর রাতে থাকতে হবে না। পালা করে তারা দুজন এই ক দিন রোগীর দেখা শুনা করবে। লিলি ও তার মা সুবিধা মত দিনে একবার এসে দেখা করে যাবে।
সিদ্ধান্ত হল প্রথম রাত সুবোধ সেখানে থাকবে। পরদিন সন্ধায় সত্যেন এসে তাকে রিলিভ দিয়ে রোগীর পাশে থাকবে। এ ভাবেই চলল দু তিন দিন।
( ক্রমশঃ)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন