জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্ব ০৬
আবার লিলির অতীত জীবনটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। সেদিন অফিসের টিফিন আওয়ারে লিলি শান্তাকে বলল,' তোর সাথে কিছু জরুরি কথা আছে,চল চা খেতে খেতে একটু আলাপ করবো।' দুজন গিয়ে কেন্টিনের এক পাশে চা- রুটির অর্ডার দিয়ে বসলো। এরপর লিলি শান্তাকে বলল ' তুই আমাকে একটু হেল্প করতে হবে, আগে কথা দে তুই কাউকে কিছু বলবি না।' শান্তাকে শর্তবন্দি করে লিলি ওর হাত ধরে তার অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। সব শুনার পর শান্তা বলল,'এখন তাহলে কি করবি? যা হবার তা তো হয়ে গেছে। অতীতটাকে তুই এবার ভুলে যা। নতুন করে আবার জীবন শুরু কর। যে লোকটার পনেরো বছর জেল হয়ে গেছে তার কথাতো আর চিন্তা করে লাভ নেই। ' কথা কটি শেষ হতে না হতেই দেখে লিলির দুচোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। চোখের জল মুছতে মুছতে সে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে দেখালো। বলল 'এই সেই সুবোধ।' বইটি পড়ে আমি আর স্থির থাকতে পারছি না। সে আমাকে ভুল বুঝেছে। আমি ওর সাথে একবার দেখা করতে চাই। আর এ ব্যাপারে একমাত্র তুইই আমাকে সাহায্য করতে পারিস'। এখান থেকে মাত্র এক রাত্রির জার্নি। আমি কাল ওর সাথে দেখা করতে যাবো আর পরদিন ঘুরে আসবো। এই সময় টুকু তোকে ম্যানেজ করতে হবে। আমি মাকে বলবো অফিস শেষে আমি তোদের বাড়িতে যাবো আর রাতে তোদের ওখানে থাকবো। তুইও মাকে ফোন করে বলে দিবি আমি তোদের ওখানে আছি। যেমন করেই হোক আমি জেলে ওর সাথে দেখা করে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসবো।'
শান্তা লিলিকে অনেক করে বুঝানোর চেষ্টা করল কিন্তু সে কিছুতেই মানতে রাজি হলো না। আবার সে শান্তার হাত দুটো ধরে বলল,' আমার দিব্যি,তুই সব ম্যানেজ করিস।'
যথারীতি পরদিন অফিসের কাজ শেষ করে লিলি রাতের ট্রেন ধরতে ব্যাঙ্গালোর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছল। সময় তখন সন্ধ্যা ছয়টা। ট্রেন আসতে এখনও এক ঘন্টা বাকি। লিলি প্লাটফর্মের একপাশে দাঁড়িয়ে আনমনে মোবাইল দেখে দেখে চিন্তা করছে। এই প্রথম সে মাকে মিথ্যা কথা বলে এতদূর যাচ্ছে। একটা অজানা আতঙ্ক একটা দুশ্চিন্তা।
ইতিমধ্যে ট্রেন এসে গেছে। লিলি খুব দ্রুত ট্রেনে উঠতে গিয়ে প্লাটফর্মে একটা লোকের সাথে ধাক্কা খেয়ে ফিরে তাকালো। এরপর সরি বলে দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলো। কিন্তু সে বারবার ঐ লোকটার দিকে ফিরে তাকাল। লোকটাও তার দিকে এক পলকে তাকিয়ে আছে। লিলি ট্রেনে উঠা অব্দি তার দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকটা চেনা চেনাই মনে হলো। ট্রেন ছেড়ে দিল। কিন্তু লিলি ঐ লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে , প্লাটফর্মে ধাক্কা লাগার পর থেকে তার মনটা কেমন যেন করছে। লোকটাকে দেখতে অনেকটা সুবোধের মতোই মনে হলো। কিন্তু ----একটু বয়স্ক --তাছাড়া --- সুবোধ তো এখানে আসার কথা নয়। 'ধ্যোৎ আমি এসব কি ভাবছি!' লিলি নিজের চোখ রগড়ালো। ট্রেন এগিয়ে চললো আর লিলির ভাবনাও ট্রেনের শব্দের সাথে একাকার হয়ে গেল।
###
সুবোধের কিন্তু চিনতে ভুল হয়নি। সে লিলিকে যথার্থই চিনতে পেরেছে। কিন্তু--- এই অসময়ে লিলি এখানে --- আর ও যাচ্ছেই বা কোথায়? এটা কি তার মনের ভুল না অন্য কিছু? সঙ্গে থাকা ছেলে দুটো সুবোধকে ডাকলো, চলুন দাদা, কি হলো? সুবোধ সম্বিৎ ফিরে পেলো। অগত্যা তাদের পিছু চললো।
পরদিন সকাল দশটায় লিলি পৌঁছল সেই জেল প্রাঙ্গনে। সে অনুমতি নিয়ে জেইলারের পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ' সুবোধ - মানে সুবোধ চ্যাটার্যী বলে একজন কয়েদির সঙ্গে সে দেখা করতে চায়।' জেইলার বললেন ' সুবোধ বলে একজনের তো কালই রিলিজ হয়ে গেছে।' কথাটা কনফার্ম হওয়ার জন্য সে ব্যাগ থেকে বইটি বের করে দেখালো। জেইলার বললেন, হাঁ, এ ই সেই সুবোধ। ও জেলে বসে বসে এই বইটি লিখেছে, আর আমিই ওটা ছাপিয়েছি।
লিলি জিজ্ঞেস করল,' উনি এখন কোথায়,আপনি কি কিছু বলতে পারেন?' জেইলার মৃদু হেসে বললেন,' তাতো বলতে পারিনে। বেচারা জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে চায়নি।ওর নাকি যাওয়ার মত কোন জায়গা নেই।তবু কাল তো সে চলে গেছে। কোথায় হতে পারে তা তো বলতে পারিনে, তবে এইটুকু বলতে পারি, মানুষটা কোন দোষী নয় তবুও জেল খেটেছে। আর ওর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে ঠিক সময়ের আগেই গতকাল তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
লিলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। সে ফিরে চললো।
তার মনে নানা কথার উদয় হতে লাগলো। তাহলে কি ঐ প্লাটফর্মে ধাক্কা খাওয়া লোকটাই তার সুবোধ? কিন্তু সে ওখানে যাবে কেন? ভাবনার অন্ত নেই। সে আবার বিকেলের ট্রেনে বেঙ্গালুরু রওয়ানা হল। ট্রেন যতই এগিয়ে যেতে লাগলো তার ভাবনাও ততই বাড়তে লাগলো।
(ক্রমশঃ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন