জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্ব -০৫
ওদিকে সুবোধের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে পাঁচ বছর পর নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তাকে জেল থেকে রেহাই দেওয়া হলো। জেল থেকে মুক্তি পেয়েও সে যেতে চাইছিল না। এ অন্ধকার পৃথিবীতে তার যে কেউ নেই। কোথায় যাবে কেমন করে খাবে। অগত্যা হাঁটতে শুরু করল। উদ্দেশ্য হীন ভাবে সে হেঁটে চললো। অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে দেখল পাশে একটা রেলস্টেশন। গ্রামীণ স্টেশন, পাশে গাছের নিচে বসার জায়গা। সে একটা জায়গায় গাছের নিচে গিয়ে বসলো। পাশে আরও দুজন এসে বসলো। ওদের কথাবার্তায় বুঝা গেল ওরা রাতের ট্রেনে অনেক দূরে কোথাও যাবে। সুবোধ অনেকক্ষণ ওখানে বসে চিন্তা করল।ভাবলো ওদের পিছু নেবে। কিন্তু কোথাও যেতে হলে টাকার প্রয়োজন। পকেটে হাত দিয়ে দেখলো,জেলে সঙ্গীদের থেকে পাওয়া শো দেড়েক টাকা আর জেইলার বাবুর দেওয়া একটি পাঁচশ টাকার নোট, ব্যাগে একটা ব্ল্যাঙ্কেট আর তার নিজের লেখা একটি বই, যা জেইলার বাবু তার নিজের খরচে ছাপিয়ে ছিলেন। ব্যাগ থেকে বইটি বের করে এক ঝলক পাতা উল্টিয়ে দেখলো। তার চোখে জল এসে গেল। বোধ করি নিজের অতীত জীবনটা তার মনে পড়ে গেল। পাশের ছেলে দুটো লক্ষ্য করল উস্কো খুস্কো চুল, মুখে এক ঝুপা দাড়ি, চোখে মুখে বিষাদের ছাপ। একজন জিজ্ঞেস করল,' কি হলো দাদা কি ভাবছেন, যাবেন কোথায়?' সুবোধ মাথা নাড়ল তারপর বললো ' জানিনে '। এবার দ্বিতীয় ছেলেটি একটু জোক করে বলল, ' দাদু,একী বলছেন,জানিনে মানে?'
সুবোধ উঠে যেতে চাইল। বোধ করি ঐ দাদু শব্দটা ওর ভালো লাগেনি। সে বুঝতে পারলো তার চেহারা বোধ হয় নিজের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি দেখাচ্ছে। তাই ওরা দাদু বলে সম্বোধন করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুবোধ আপন মনে বিড় বিড় করে বললো, সবই নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাস।। কাউকে কিছু বলার নেই। সুবোধকে চলে যাচ্ছে দেখে ওরা আবার একটু এগিয়ে এসে বলল,' কি হলো, কোন সমস্যা থাকলে বলুন, আমরা সাহায্য করবো। ছেলে দুটোর ব্যবহারে সুবোধ একটু থামল। তাদের পিড়াপিড়িতে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে আবার থেমে গেল। ছেলে দুটোর বোধ করি একটু দয়া হলো। আবার জিজ্ঞেস করল,' তা দাদা এখন যাবেন কোথায়?'
সুবোধ করুন স্বরে বলল ' জীবন যেদিকে '।
তারা আরও একটু উৎসুক হল। বলল,' এ কেমন কথা, চলুন তাহলে আমাদের সাথে।' সুবোধ খানিকক্ষণ চিন্তা করল তারপর জিজ্ঞেস করল ' আপনারা কোথায় যাবেন? আমাকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের আবার যদি কোন ঝামেলা হয়?' না না, কোন অসুবিধা হবে না, চলুন।
সুবোধ আরও ভাবনায় পড়ে গেল। এমন সময় ট্রেন আসার শব্দ শুনা গেল। ওরা বললো,' চলুন,ঐতো ট্রেন এসে গেছে। অগত্যা সুবোধ চললো তাদের পিছু পিছু,। তারা গিয়ে ট্রেনে উঠলো।কিন্তু কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না।
###
এদিকে বেঙ্গালুরুতে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে লিলির জীবনে আসলো এক আমূল পরিবর্তন। অফিসের কাজকর্ম আর মা'কে নিয়ে সম্পূর্ণ রুটিন মাফিক চলাফেরা। অফিসের কাজে এত বেশি চাপ যে কোন কিছু ভাবার সময়ই নেই। সকাল নয়টায় ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আর বিকেল পাঁচটায় ফিরে আসে। এই সময়টুকু মাকে একা ঘরে থাকতে হয়। মা বই পড়তে খুব ভালোবাসেন। এজন্য প্রায়ই মাকে ধর্মগ্রন্থ, মহাপুরুষদের জীবনী ইত্যাদি নানা ধরনের বই কিনে এনে দেয়। অবসর সময় মা এই ভাবে বই পড়ে কাটিয়ে দেন। মায়ের বই পড়ার আগ্রহ দেখে সে নিজেও প্রায়ই রাতে বইগুলো পড়তো। একটি পড়া শেষ হলে আরেকটি কিনে আনতো। এভাবে আরও দু-তিন বৎসর কেটে গেল।
মা অসীমা দেবী বুঝতে পারলেন লিলি পূর্বের সেই ছন্দ আবার ফিরে পেয়েছে। ওর অফিসের সঙ্গী সাথীদের সাথে চলাফেরা আনন্দ উল্লাস সবই যেন ঠিক আগের মতই। মেয়ের খুশিতে মা'ও খুব খুশি।
সেদিন বিকেলে ওর সহকর্মী শান্তা ওর বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিল। শান্তার সঙ্গে মাকে পরিচয় করিয়ে দিল। কতক্ষণ কথা বলার পর লিলি বললো,' তুই মায়ের সাথে কথা বল , আমি ততক্ষণে চা নিয়ে আসি। লিলি চা করতে গেল। অসীমা দেবী অনেকক্ষণ ধরে শান্তার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বললেন। প্রসঙ্গ ক্রমে লিলির জীবনে ঘটে যাওয়া কথাগুলো তার কাছে প্রকাশ করে বললেন, ' এবার তো মনে হচ্ছে ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছে। কাজেই তুমি ওর বিয়ের ব্যাপারে একটু কথা বলে দেখ। আমার তো বয়স হয়েছে, কখন জানি কি হয়।' শান্তা বলল ' সে আপনি চিন্তা করবেন না , মাসিমা। লিলির জীবনে ঘটে যাওয়া এতো সব কথা তো আমরা কেউই জানিনা। এতসবের পরও ও যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে,সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি কোন চিন্তা করবেন না।' লিলি চা নিয়ে এলো।চা পান করে শান্তা বিদায় নিল।
####
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে লিলি লাইব্রেরীতে উঠলো একটি বই কেনার জন্য। দেখতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা বই এর উপর। লিলি বইটি হাতে নিয়ে দেখল,বইটির নাম ' অবোধ সুবোধ '। কিন্তু একি! সে ভুল দেখছে নাতো? বইটির লেখক সুবোধ চ্যাটার্যী। বইটির পেছন দিক উল্টাতেই লিলির শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম। এযে তারই সুবোধ! বইটি খুলে দেখলো, কিন্তু প্রকাশকের কোন নাম ঠিকানা পেল না। বইটা কিনে সে বাড়ীতে নিয়ে গেল। ঐদিন রাতে পুরো বইটা সে পড়লো। অতীত জীবনটা আবার তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। এ যে সম্পূর্ণ সুবোধের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে লেখা। তাহলে সুবোধই লিখেছে। সুবোধ তাহলে লেখক হয়ে গিয়েছে? কিন্তু ও এখন কোথায় আছে কেমন আছে! বইটি তন্ন তন্ন করে পড়েছে কিন্তু সুবোধের কোন ঠিকানা বা ওর বর্তমান অবস্থা কিছুই খুঁজে পেল না। সুবোধ কি তাহলে ছাড়া পেয়েছে, নাকি---- । সারা রাত তার আর ঘুম হয়নি।
পরদিন আবার ঐ লাইব্রেরীতে গিয়ে বইটির প্রকাশকের কোন ঠিকানা পাওয়া যায় কিনা তার খোঁজ নিল। কিন্তু প্রকাশকের কোন হদিস ই সে পেল না।
(ক্রমশঃ)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন