জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্ব -০৮
সুবোধ ইতিমধ্যে অনেক গুলো গান লিখেছে এবং রীতিমত গায়ক হয়ে উঠেছে। আশপাশের বিভিন্ন অরকেস্ট্রা পার্টিতে গান গেয়ে অনেক প্রশংসাও অর্জন করেছে ইতিমধ্যে।
###
সেদিন মানিক আর রতন এসে সুবোধকে বলল তাদের মালিকের ফ্ল্যাটে একটা অনুষ্ঠান আছে। তাকে ওখানে নিমণ্ত্রণ করা হয়েছে। চৌদ্দ নভেম্বর মালিকের নাতির জন্মদিন। জন্মদিন হলে কি হলো বড়লোক বলে কথা, বিশাল আয়োজন। এক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু। এ অঞ্চলের কাউকে নিমণ্ত্রণ দিতে বাকি রাখবেন না।
সুবোধ শুনেই চমকে উঠল, বলল ' না বাবা আমি যাবো না '
কিন্তু মানিক ও রতনের পীড়াপীড়িতে শেষে রাজী হলো।
চৌদ্দ নভেম্বর বিকেল ছ'টায় অনুষ্ঠান।
###
সেদিন মানিক আর রতন একটু সকাল সকাল প্রস্তুত হয়ে সুবোধকে সাড়ে পাঁচটায় সেখানে পৌঁছার কথা বলে লোকেশনটা একটু ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিল। তারা বললো ফ্ল্যাটের পাশে গিয়ে যেন ফোন করে। তারা একজন এসে তাকে নিয়ে যাবে।
যথা সময়ে সুবোধ সেখানে পৌঁছে মানিককে ফোন করল। ইতিমধ্যে মহল লোকে লোকারণ্য। মানিক ওদিকে ব্যস্ত থাকায় একটি ছেলেকে পাঠিয়ে সুবোধকে উপরে নিয়ে গেল। উপরে উঠে তো সুবোধের চক্ষু চড়কগাছ। এমন আলোকসজ্জা আর এমন রাজমহল সে জীবনে কল্পনাও করতে পারেনি। মানিক এগিয়ে আসতেই সে বলল,' আমাকে আপনারা এ কোথায় নিয়ে এলেন, আমার ভয় করছে।'
,' দাদা দেখতে থাকুন। গতকাল থেকে বাড়ীতে ভিয়েন বসিয়ে রান্নার কাজ চলছে। হাজার মানুষের ভিড়ে আপনি আজ স্পেশাল।' বলে তাকে একপাশে বসিয়ে রেখে সে চলে গেল।
সুবোধ লক্ষ্য করল আরও অনেক অতিথি আসছেন। এতো জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ আর এত অপরিচিত লোকের ভীড়ে সে অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। যারাই আসছে একে অপরের সাথে সৌহার্দ্য বিনিময় করছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন পোশাকধারী কয়েকটি ছেলে ঠাণ্ডা পানীয় আর নানা ধরনের মিষ্টান্ন দ্রব্য পরিবেশন করছে। অতিথিরা যার যা খুশি নিচ্ছে আর খাচ্ছে। একটু পরেই দেখা গেল প্যান্ট কোট টাই পরিহিত মাঝবয়সী ভদ্রলোক সঙ্গে এক মহিলা, বেশভূষায় মনে হচ্ছে রাজরাণী আর পেছনে দুজন গার্ড। সুবোধ লক্ষ্য করল গার্ড দুজনের পরনে সাদা প্যান্ট, নীল রঙের শার্ট, মাথায় পাগড়ি পরা আর পাগড়ির উপর এক গুচ্ছ ময়ূরের পুচ্ছ উপর থেকে নেমে আসছেন। সুবোধের বুঝতে বাকি রইলো না যে ইনিই এই ফ্ল্যাটের মালিক। উনারা পাশে আসতেই একজন বলে উঠল,' উপস্থিত বন্ধুগণ, ইনি হচ্ছেন আমাদের জুট ইণ্ডাস্ট্রির মালিক শ্রী যুক্ত ভি, এস, রমন আর সঙ্গে উনার সহধর্মিণী অনুরাধা রমন।' সবাই একসাথে হাততালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানালো। তিনি আসন গ্রহণ করলেন। উনারা আসন গ্রহণ করলে গার্ড দু'জন সুবোধকে পাশে নিয়ে যেতে আসলো। ওরা পাশে আসতেই সুবোধ চমকে উঠল। ওরা যে মানিক আর রতন সে একটুও চিনতে পারেনি। ওরা তাকে নিয়ে গিয়ে মনিবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। মানিক বলল,' ইনিই সেই সুবোধ চ্যাটার্যী, যার কথা আপনাকে বলেছিলাম।'
সুবোধ তাঁকে নমস্কার করতেই তিনি বললেন,' আসুন,বসুন। আপনার অনেক তারিফ শুনেছি। আপনাকে পেয়ে খুব খুশি হলাম।
টেবিলে আগে থেকেই বার্থ ডে কেক সাজানো ছিল। পাশে বিট্টু আর তার মা বাবা দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে। রমন বাবু এগিয়ে আসলেন। বার্থ ডে কেক কাটা হলো। সমস্ত হল জুড়ে সাউন্ড সিস্টেম বেজে উঠলো, হেপ্পি বার্থ ডে টু বিট্টু।সেই সাউন্ডের সাথে সমস্ত হলের সবাই সুর মেলালেন।
এরই মধ্যে সকলকে বার্থ ডে কেক পরিবেশন করা হলো।
এবার রমনবাবু ঘোষণা করলেন, 'বন্ধুগণ, আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত স্বনামধন্য গায়ক সুবোধ চ্যাটার্যী। আমি তাকে অনুরোধ করছি, আজকের এই বিশেষ দিনে উনার কণ্ঠে আমরা একটি গান শুনবো। সুবোধ আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু রমন বাবু সে সূযোগ না দিয়েই সরে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই চিৎকার করে হাততালি দিয়ে যে যেখানে পারল বসে পড়ল।
সুবোধ বাধ্য হয়ে গান ধরলো --
আজিকার এ জলসা ঘরে
কি গান গাইবো আমি,
কী পাপে জনম নিলাম,
জানে শুধু অন্তর্যামী।।
আজিকার -- - - -------
গানের কড়িগুলো রিপিট করতেই তার চোখ পড়ল লিলির উপর, সে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে আর ওর পাশে মা' বসে আছেন। ওকে দেখা মাত্রই হঠাৎ সে পড়ে গেল।
কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। সবাই নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মানিক দৌড়ে এসে ওকে ধরে তুলল আর কানে কানে কি যেন ফিসফিস করলো। সুবোধ উঠে দাঁড়ালো। দু'চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়েই গানের সুর পরিবর্তন করে আবার আরম্ভ করলো, লিলির গাওয়া সেই গানটি------
আমার এ আঁধার জীবনে
আলো হয়ে দিলে জোসনা--
- ----------------------------------
তুমি শুধু ভুল বুঝোনা--
সে কী করুন কণ্ঠ, যেন এক করুন আর্তনাদ।
গান শেষ হতে না হতেই অসীমা দেবী বললেন,' এতো সুবোধই মনে হচ্ছে।' লিলি ইতিমধ্যে ভিড় অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। ওর দু'চোখ থেকে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে আসছে। তার পেছনে পেছনে মা ও শান্তা। পুরো হল নিস্তব্ধ। মানিক রমনবাবুর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে করে কি জানি কি বললো।
রমনবাবু উঠে একহাতে সুবোধকে ধরলেন আর একহাতে লিলিকে পাশে ডাকলেন। সবার মধ্য ভাগে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন,' বন্ধুগণ, আজকের এ জন্মদিন অনুষ্ঠানের সাথে আরও একটি অনুষ্ঠান সংযোজন হল। আজ এখানেই এ দুজনের বিয়ের পর্ব সম্পন্ন হবে। শান্তা এগিয়ে এসে বলল,' এই যে, লিলির মা অসীমা দেবী এসে গেছেন।'
রতন বললো,' ঐ তো পুরুত কাকু পাশেই রয়েছেন।' সঙ্গে সঙ্গে পুরুত মশাই বলে উঠলেন,' উলু ধ্বনি দিন,শঙ্খ বাজান।
মানিক সুবোধের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,'দাদা---
সমাপ্ত
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন