জীবনের ঘূর্ণিপাকে পর্ব ০৭
এদিকে সুবোধ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঐ ছেলে দুটোর সাথে হেঁটে হেঁটে তাদের রুম পর্যন্ত চলে গেল। ছোট একটা রুম। তারা দুজন ভাড়া করে থাকে আর একটা কোম্পানিতে কাজ করে। সকাল আটটায় বেরিয়ে যায় আর রাত্রি আটটায় ফিরে আসে। সেদিন রাতভর সুবোধের সাথে তাদের কথোপকথন চললো । সুবোধ তাদের নাম জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, একজনের নাম মানিক আর একজন রতন। তারা সুবোধের জীবন বৃত্তান্ত জানার আগ্রহ প্রকাশ করলে সে তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুটা খুলে বলল। তাদেরকে হাতের বইটি দেখাল এবং সে সময় পেলে আরও কিছু লিখার ইচ্ছে প্রকাশ করল। সুবোধের মুখে তার করুণ জীবন বৃত্তান্ত শুনে এবং তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তারা বললো, ' দাদা আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মতো। আপনি ক'দিন আমাদের এখানে থেকে যান। আমরা তো সকাল হলেই ডিউটিতে চলে যাব আর রাতে ফিরে আসবো। ততক্ষণে আপনি লেখালেখি করবেন আর যদি ইচ্ছা হয় পাশেই একটা পার্ক আছে আর ওদিকে একটা বাজার আছে। আপনার ইচ্ছা হলে ঘুরে আসতে পারবেন।'
সকাল হলে ওরা খাবার প্রস্তুত করল। তিনজন মিলে খেয়ে সুবোধকে একা ঘরে রেখে তারা ডিউটিতে চলে গেল। সুবোধ সারাদিন একা একা ঘরের মধ্যে কখনো কিছু লিখে আবার কখনো মনের শোকে গান গায়। এভাবেই দিন যেতে লাগল। শেষে এমন হল যে দিনের বেলায় সে যে গান লিখে রাতে সেগুলো তাদের গেয়ে শোনায়। আর তারা দুজনও সারাদিনের পরিশ্রমের পর রাতে ওর গান শুনে খুব আনন্দ পায়।
কিছুদিনের মধ্যেই আসপাশের লোকজন জেনে গেল তার গানের প্রতিভা। মাঝে মধ্যে কোন অনুষ্ঠানে তাকে গান গাইতেও দেখা গেল।
###
ওদিকে লিলি পরদিন ভোর পাঁচটায় বেঙ্গালুরুতে এসে পৌঁছায়। সে প্রথমে স্থির করেছিল শান্তার ওখানে যাবে তারপর অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু ট্রেন থেকে নেমে তার মনটা আরও ভারি হয়ে উঠলো। এইতো এই প্লাটফর্মেই হয়তো সুবোধকে পাশে পেয়েও সে হারালো। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করলো তারপর সোজা অফিসে চলে গেলো। তখনো কেউই অফিসে আসেনি। সে বারান্দায় বসে শান্তাকে ফোন করল একটু তাড়াতাড়ি আসার জন্য। শান্তা এলে তার কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। সবকিছু শুনে শান্তা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।
সেদিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল। তার মনটা আজ খুব ভারি। ঘরে পৌঁছতে মা জিজ্ঞেস করলেন,' কিরে তোর কি হয়েছে? সে বলল,' না মা কিছু হয়নি, এমনিতেই ভালো লাগছে না।' লিলি অনেক বার ভেবেছে মা'কে সব কথা খুলে বলবে, কিন্তু কথাটা কেমন করে বলবে তা বুঝে উঠতে পারছে না। মা কিন্তু আঁচ করতে পেরেছেন যে কিছু একটা হয়েছে।
রাতে খেতে বসে মা বললেন,' হাঁ রে কাল ওপাড়ার বাড়ুজ্যে বাবু এসেছিলেন, তোর বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে। তোদেরই অফিসের, কি জানি নামটি, খোকন নাকি, উনার কথা বললেন। লিলি নাক সিঁটকে বলল," তারপর?'
অসীমা দেবী মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন ' দেখ মা,তুই আমার একমাত্র মেয়ে, তোকে পাত্রস্থ না করলে আমার যে নরকেও স্থান হবে না। কেন তুই জেদ ধরে বসে আছিস?' 'যে লোকটার পনেরো বছরের জেল হয়েছে ওর কথা ভেবে নিজের জীবনটাকে তুই শেষ করে দিবি ' এবার লিলি নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলনা। বললো,' মা আমি সুবোধকে ভালোবাসি আর আমি ওকে কথা দিয়েছি '
মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে মা বললেন,' রাখ তোর ভালবাসা। এ যুগে ভালবাসা টালোবাসা কিছু নেই, তুই ওকে ভুলে যা।' লিলি জবাব দেয়,' না মা ভালবেসে ভুলা যায় না। এটা হচ্ছে আমার প্রথম ভালোবাসা, আর প্রথম ভালোবাসা জীবনেও ভুলা যায় না।'
'বুঝলাম,' মা বললেন ' কিন্তু ও তো জেলে আছে।'
লিলি বলল,' তাহলে কি হলো,ও তো বিনা দোষে ----
বিনা দোষে ওর জেল হয়েছে, আর আমার কারণেই হয়েছে। বাবার যেদিন স্ট্রোক হয় সে ই প্রথম এগিয়ে এসেছে।ঐ সময় সে ই ছিল আমাদের একমাত্র সাহারা। আর তুমি তো জানোই ,ও বাবাকে খুন করেনি। করেছে ঐ সত্যেন আর বেচারা বিনা দোষে -- বলতে বলতে লিলি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। মা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
লিলি আবার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলতে লাগলো,' জানো মা, কাল আমি একটা অন্যায় করে ফেলেছি, তোমাকে না বলে আমি জেলে সুবোধের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।'
মা অবাক হয়ে বললেন,' তারপর?'
' সুবোধ জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ও কোথায় গিয়েছে তা তো কেউ বলতে পারে না। তাই আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমার মন বলছে আমি ওকে পাবো। তার জন্য হয়তো একটু অপেক্ষা করতে হবে।'
###
সেদিন,জে,এস,সি, প্রাইভেট কোম্পানির অফিসে একটা ছেলে ইনভাইটেশন লেটার নিয়ে আসলো। সে ম্যানেজারের হাতে লেটারটা দিয়ে চলে যাচ্ছিল এমন সময় তার চোখ পড়ল শান্তার দিকে। তার মালিকের বাসার পাশেই ওর বাসা। শান্তা তাকে খুব ভালো চেনে। শান্তা তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, , 'কি হে মানিক, তুমি এখানে?'
'না,মানে একটা ইনভাইটেশন লেটার দিতে এসেছিলাম। আপনারা সবাই আসবেন। আগামী চৌদ্দ নভেম্বর বুধবার আমাদের বিট্টু মানে আমাদের রমন বাবুর নাতির জন্ম তিথি তাই।'
শান্তা বলল ' ও, তাই বুঝি।! আচ্ছা ঠিক আছে।'
মানিক চলে যাচ্ছিল হঠাৎ তার চোখ পড়ল শান্তার হাতের বইয়ের দিকে।
''দিদি এ বইটি আপনি কোথায় পেলেন?' মানিক জিজ্ঞেস করল।
শান্তা উল্টে প্রশ্ন করল, 'কেন, কি হয়েছে?'
'না, এমনিতেই। বইটার গল্প শুনেছি। বড়ই করুন কাহিনী, বেচারা সুবোধ।'
শান্তা বলল,' হাঁ, খুব ভালো বই।
' তা হবে না কেন? এ যে আমাদের দাদা সুবোধ চ্যাটার্যীর লেখা।' মানিক গর্ব বোধ করলো ।
শান্তা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কিভাবে জানো, তুমি কি তাকে চেনো?'
'চিনি কি মানে? ও আমার দাদা, শুধু লেখক নয় একজন ভালো গায়কও। আসবেন দিদি আমাদের অনুষ্ঠানে, দেখবেন উনি কেমন গান করেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন