হাতুড়ি নয়, বই দিন



পয়লা মে। টাউন হল ভর্তি লোক। মঞ্চে শীতেন বাবু, শহরের নামকরা সমাজসেবী। গলায় লাল গামছা, হাতে মাইক।

“বন্ধুগণ, শ্রমিকের ঘামেই সভ্যতা গড়ে। শিশু শ্রম ঘৃণ্য অপরাধ। আজকের দিনে শপথ নিই—কোনো শিশুকে দিয়ে কাজ করাব না। তাদের হাতে বই দেব, খেলনা দেব। ইনকিলাব জিন্দাবাদ!”

হাততালিতে হল ফেটে পড়ে। খবরের কাগজের লোক ছবি তোলে। শীতেন বাবু গর্বে বুক ফোলান।

ইমোশনাল হয়ে আরো উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন," শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ করে কিন্তু উপযুক্ত পারিশ্রমিক পায় না। বৃদ্ধ বয়সে ওষুধ পত্তর করা তো দূরের কথা নাখেয়ে মরে। কে দিবে তাদের বৃদ্ধ ভাতা?"

বাড়ি ফিরে কলিংবেল বাজাতেই দরজা খোলে রতন। বয়স দশ। শীর্ণ হাত, কোটরে ঢোকা চোখ। 

“হারামজাদা, এত দেরি কেন? বাবুরা এসেছিল, চা দিসনি কেন? সারাদিন টিভির সামনে বসে থাকিস?” শীতেন বাবুর হাত উঠে যায়। রতনের গালে পাঁচ আঙুলের দাগ।

রতন কাঁদে না। মার খাওয়া তার অভ্যাস। ভোর পাঁচটায় ওঠে। ঘর মোছে, বাসন মাজে, বাজার করে, বাবুর জুতো পালিশ করে। রাতে বাবু পার্টি থেকে ফিরলে পা টিপে দেয়। একদিন কাঁচের গ্লাস ভেঙেছিল বলে সারারাত বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। জ্বর এসেছিল, তবু সকালে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল।

রতনের সমবয়সীরা দলবেঁধে হাসিখুশি করে স্কুলে আসাযাওয়া করে। ওরা তাকে স্কুলে যাওয়ার কথা বললে সে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। চোখ ছলছল করে। তার খুব ইচ্ছা হয় স্কুল যাওয়ার। একদিন সাহস করে বলেছিল “বাবু, ইস্কুলে যাইতে মন চায়।" 
“তোর বাপ মা তোকে বেচে দিয়েছে। ইস্কুলে গিয়ে তুই ব্যারিস্টার হবি? কাজ কর, খেতে পাবি।”

সন্ধ্যায় শীতেন বাবুর মেয়ে দিশা ফেরে টিউশন থেকে। রতনকে দেখে বলে, “বাবা, আজ তো মে দিবস। তুমি মঞ্চে বললে শিশু শ্রম অন্যায়। রতন তো শিশু। ও কেন কাজ করে?”

শীতেন বাবু ধমক দেন, “বেশি পাকামো করিস না। ওর মা-বাপ খেতে পায় না, তাই কাজ করে। আমরা তো ওকে আশ্রয় দিয়েছি। এটা শোষণ না, দয়া।”

দিশা চুপ করে যায়। রতনের পাতে ভাত বেড়ে দেয় লুকিয়ে একটা ডিম।

পরদিন খবরে বেরোয়—ইটভাটায় কাজ করতে গিয়ে দেয়াল চাপা পড়ে দুই শিশু শ্রমিকের মৃত্যু। শীতেন বাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন, “দেশটা রসাতলে গেল। সরকারের কোনো নজর নেই।”

টিভিতে তাঁর ভাষণ চলছে—“শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে হাতুড়ি নয়, বই দিন।”

পাশের ঘরে রতন তখন বাবুর জুতো পরিষ্কার করছে। হাতুড়ির বদলে তার হাতে জুতোর ব্রাশ। কালি লেগে হাতটা কালো। ভবিষ্যৎটাও---।

ওপাশ থেকে দিশা টিভি দেখছে আর ভাবছে," দেশের মানুষ গুলো কেমন! বড় বড় নেতা মন্ত্রীরা মে দিবসে লাল পতাকা তুলে, বড় বড় কথা বলে। তাদের বৃদ্ধ ভাতা লক্ষ লক্ষ টাকা কিন্তু যাদের শ্রমের কারণে এসি রুমে বসে আরাম আয়েশ করছে ওরা বৃদ্ধ বয়সে না পায় ওষুধ পত্তর না পায় বৃদ্ধ ভাতা। সারাজীবন শ্রম করেও বৃদ্ধ বয়সে ওরা না খেয়ে মরে।"
 
শ্রমিকদের মঞ্চের আলো নিভলেই নেতা মন্ত্রীরা ভুলে যায়—নিজের ঘরের কোণেই একজন রতন বেঘোরে বাঁচে। ওরা আইন তৈরি করে কিন্তু আইন কাগজে থাকে, শোষণ রক্তে। 
শ্রমিকের নামে যতদিন না ওরা নিজের ঘর থেকে শিশু শ্রম তাড়াবে, ততদিন ‘শ্রমিক দিবস’ শুধুই ছুটির দিন। শ্রমিকদের স্বাধীনতা তো স্বাধীনতা নয়, প্রহসন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়