ফাটলের সুতো
রমেন আর শীতেন—নাম দুটো উচ্চারণ করলেই গ্রামের লোক বলত, “ওরা তো দুই দেহ এক প্রাণ।” ছোটবেলার সহপাঠী, যৌবনের ব্যবসার সঙ্গী। হাটে-বাজারে, অফিস আদালতে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে একসাথে চলা। একজনকে ছেড়ে অন্যজন ভাবাই যায় না।
এই বন্ধুত্বটাই চোখে কাঁটার মতো বিঁধত তৃতীয় সহপাঠী কেশবের। মুখে মিষ্টি, মনে বিষ। রমেন-শীতেনের ছায়া যত লম্বা হত, কেশবের বুকের ভেতর হিংসার আগুন তত দাউদাউ করত। সে ফন্দি আঁটল—এই সুতোয় টান মারতে হবে।
প্রথমে রমেনের কানে ফিসফিস করল, “শীতেনটা তোকে ছাড়া লুকিয়ে ডিল করে রে। মানুষটা বড়োই স্বার্থপর।” রমেন হেসে উড়িয়ে দিল, “ধুর, আমি ওসবের ধার ধারিনা।”
কেশব থামল না। দিনের পর দিন, জলের ফোঁটার মতো কুমন্ত্রণা ঢালতে লাগল। “তোর বদনাম করে, তুই নাকি কিছুই জানিস না, ওর পরামর্শেই নাকি তুই আজ এই স্থানে। তোর সরলতার সুযোগ নিচ্ছে রে… সেদিন তোকে ছাড়াই মহাজনের সাথে কথা বলল…”
কথায় বলে, কানে দেওয়া বিষ একদিন রক্তে মেশে। রমেনের মনেও সন্দেহের বীজ গজাল।
সেই বছর শীতেন শহরের এক বড় কোম্পানির সাথে চালের সাপ্লাইয়ের বিরাট অর্ডার পেল। সইসাবুদ হলেই জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। খবরটা শুনে কেশবের রাতের ঘুম উড়ে গেল। সে রমেনকে ধরল, “এই সুযোগ। শীতেন একা বড়লোক হবে, তুই চেয়ে চেয়ে দেখবি? মহাজনকে গিয়ে বল, শীতেনের চালের নমুনায় ভেজাল আছে। অর্ডারটা বাতিল হয়ে যাবে।”
সন্দেহে অন্ধ রমেন রাজি হয়ে গেল। মহাজনের কানে বিষ ঢালল। কোম্পানি তদন্ত করে অর্ডার বাতিল করল। শীতেনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
যখন জানল, এই সর্বনাশের পেছনে রমেনের হাত আছে, শীতেন পাথর হয়ে গেল। একটা কথাও না বলে রমেনের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। দুই দেহ এক প্রাণের মাঝখানে নেমে এল কাঁচের দেয়াল। হাটে দেখা হলে দুজনেই চোখ নামিয়ে নেয়। গ্রামসুদ্ধ লোক ফিসফাস করে—“হায়, কী বন্ধুত্ব ছিল!”
মাস ছয়েক পর রমেনের রাতে ঘুম আসে না। দীর্ঘ দিন একসাথে চলা। শীতেনের শুকনো মুখটা চোখে ভাসে। ব্যবসায় লোকসান হয়, শান্তি নেই। একদিন রাতে সে শীতেনকে ফোন করে। এরপর এক বিয়ের অনুষ্ঠানে সে শীতেনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কথা বলতে বলতে আসল সত্যিটাই বলে দিল। “ আমি কেশবের কু-পরামর্শে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমিই মহাজনকে মিথ্যে বলেছিলাম।”
শীতেনের বুকটা মোচড় দিল। এতদিনের জমা অভিমান চোখের জল হয়ে গড়াল। সে রমেনকে বুকে টেনে নিল। “তুই আমার প্রকৃত অর্থে বন্ধু রে। ভুল তো মানুষেরই হয়।”
পরদিন হাটের মাঝখানে গ্রামের সবাইকে ডেকে রমেন সব ফাঁস করল। কেশব কীভাবে দিনের পর দিন তার কানে বিষ ঢেলেছে, কীভাবে বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়েছে—সব।
কথা শেষ হতেই চারদিক নিস্তব্ধ। তারপর ধিক্কার উঠল কেশবের নামে। যে লোক পরের বন্ধুত্ব ভাঙে, তাকে কে বিশ্বাস করে? কেশব একঘরে হয়ে গেল। সমাজে মুখ দেখাতে পারে না।
আর রমেন-শীতেন?
ফাটল জোড়া লাগল। আগের চেয়েও শক্ত হলো বন্ধন। এখন তারা যখন হাটে যায়, লোকে বলে, “ওই যে যায়, তাদের বন্ধুত্ব ঠিই আছে। আর মাঝখানে কেশবের মতো কাঁটা গজালে, সেটাও উপড়ে ফেলতে জানে।”
হিংসার আগুনে যে অন্যের ঘর পোড়াতে যায়, শেষে তার নিজের ঘরই ছাই হয়। আর সত্যিকারের বন্ধুত্বে ফাটল ধরলেও, অনুতাপের জল পড়লে তা আবার জোড়া লাগে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন