স্ক্রিনের এপার ওপার



এক খাট, এক কম্বল, মাঝখানে দুইটা মোবাইল—আলম  আর সুহানার সংসার।  
বিয়ের সাত বছর। শুরুতে বালিশে মাথা রাখলেই গল্প হতো। এখন আলম অফিসের মেইল চেক করে, ফেইসবুক চালায়। সুহানা ওদিকে ফিরে স্ক্রিনে আঙুল চালায়।
প্রথমে আলম ততটুকু গুরুত্ব দেয়নি। হয়তো সহকর্মীদের সাথে কথা বলছে, না হয় মেয়েদের গ্রুপ, কী আর হবে?
তারপর একদিন রাত দুটোয় ঘুম ভেঙে দেখে—সুহানার ঠোঁটে হাসি, চোখ মোবাইলে। টাইপ করছে, ডিলিট করছে, আবার টাইপ করছে।  
“কার সাথে কথা?”  
“কেউ না। ঘুমাও।”  
স্ক্রিন উল্টে বুকের নিচে রাখল সুহানা।
সন্দেহটা সেদিনই জন্ম নিল। আলমের ঘুম কমে গেল। রোজ রাতে খাবার পর এরকমই চলে। স্বামী একপাশে স্ত্রী অন্য পাশে। আলম মুখটা ঘোরাতেই সুহানা মোবাইল মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে সরিয়ে নেয়। 
সুহানা কার সাথে চ্যাটিং করে? ফোনে লক, হোয়াটসঅ্যাপে লক, গ্যালারিতে লক। এক খাটে শুয়েও দুজনের মাঝে পাসওয়ার্ডের দেওয়াল।
     এক শুক্রবার রাতে সুহানা বাথরুমে গেলে ফোন টেবিলে পেল—আনলক। নোটিফিকেশন ভাসছে: “তোমার হাসিটা মিস করছি, জান”। নাম সেভ করা ‘তুলি আপু’।  
আলম স্ট্যাটাস খুলল। প্রতিদিন রাত ১টা-৩টা চ্যাট। ‘গুড নাইট’ এর পরেও চলেছে ‘কল দাও, বর ঘুমাইছে’।
     এতটুকু দেখেই আলমের হৃদকম্পন বেড়ে গেল। মোবাইল রেখে সে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। সেদিন সারা রাত সে ছটফট করে কাটাল। কি করবে ভেবে উঠতে পারলো না। 
পরদিন সন্ধ্যায় জিজ্ঞেস করতেই আগুন জ্বলল।  
“আমার প্রাইভেসি বলতে কিছু নাই?” সুহানা চেঁচাল।  
“প্রাইভেসি না, এটা চিটিং,” আলমের গলা কাঁপল।  
কথা থেকে ঝগড়া, ঝগড়া থেকে চিৎকার। পাঁচ বছরের মেয়ে আয়াত দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
সুহানা সেদিনই ব্যাগ গুছাল। “এই জেলখানায় থাকব না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না।”  
আলম বলল, “বিশ্বাস ভাঙলে তারে কী বলে?”  
সুহানা আয়াতকে কোলে তুলে বেরিয়ে গেল। দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হলো।
   এরপর উকিল নোটিশ, কোর্ট, সই। ছ’মাসে ডিভোর্স। আয়াত এখন সুহানার কাছে। আলমও নিষ্ঠুর হয়ে গেল। ঈদ গেল পরব গেল একবারও সে খবর নেয়নি। 
    আয়াত মাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, " মা, বাড়ি যাবেনা? বাবা, আসে না কেন?”  
আলম শুয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকাল। একটা কথাই মনে এল—এক বিছানায় থেকেও আমরা পাশাপাশি ছিলাম না। মাঝখানে ছিল একটা স্ক্রিন, আর স্ক্রিনের ওপারে একজন তৃতীয় মানুষ।
     ফোন এখনও ব্যস্ত থাকে। আলমের খাটের পাশের জায়গাটা খালি।  
সামান্য চ্যাটিং দিয়ে শুরু। শেষ হলো তিনটা জীবন আলাদা হয়ে।
 বিছানা এক হলেই সংসার হয় না, মনটা পাশে থাকতে হয়। স্ক্রিনের আলো নিভে গেলে যাকে জড়িয়ে ধরবে, সে যেন তখনও তোমারই থাকে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়