গুরুর কপালে ভাঁজ



মাস্টার দীনবন্ধু পাল। বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। স্থানীয় হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত অঙ্কের স্যার। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে পুরনো ছাতা। এই ছাতা আর চশমাই তাঁর কালের সাক্ষী। কপালের ভাঁজগুলো সময়ের দলিল।

*১৯৭৫ সাল।*  
ক্লাস টেন। দু-তিনজন পড়া শেখেনি। স্যারের বেতের বাড়ি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গেল। মা-বাবাকে বলার সাহস হয়নি। যে বলল, সে আরও কিছু উত্তম-মধ্যম খেল। পরদিন সবাই পড়া শিখে হাজির।

স্যার চরিত্র আর নীতিশিক্ষায় জোর দিতেন। ক্লাসে বলতেন, “যত বই পড়বি, তত শিখবি। স্কুল লাইব্রেরি আছে, অবসরে রেফারেন্স বই, গল্প-উপন্যাস পড়বি।” ছাত্ররাও তাই করত।

ক্লাসের ফার্স্ট বয় নিখিলেশ। অঙ্কে ২ নম্বরের জন্য লেটার মিস। রেজাল্টের দিন হেডস্যারের ঘরে স্যারের পা জড়িয়ে কেঁদেছিল, “স্যার, আপনার মান রাখতে পারিনি।” স্যার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “মান-অপমান রেজাল্টে না রে, চরিত্রে। যা গেছে ভালোই হয়েছে। এবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব, সেটা আরও ভালো হওয়া চাই।”

একদিন বাজারের পথে দুই ছাত্র সাইকেল থেকে নেমে স্যারকে প্রণাম করল। কুশল জিজ্ঞেস করে, স্যার চোখের আড়াল হতেই আবার সাইকেলে উঠল।

আরেক বিকেলে স্যারের হাতে মাছের ব্যাগ দেখে নিখিলেশ প্রায় ছিনিয়ে নেয়। “ছি ছি স্যার, আপনি বইবেন কেন?” দেড় মাইল হেঁটে স্যারের বাড়ির দরজায় ব্যাগ নামিয়ে তবে তার শান্তি। গুরু তখন ভগবানের আরেক রূপ। তাঁর বাক্য আপ্তবাক্য, আদেশ শিরোধার্য।

#####

২০১৬ সাল। 
স্যার ক্লাসে রেফারেন্স বইয়ের কথা তুলতেই ছাত্ররা হাসে। রাহুল বলে ফেলে, “বই পড়ার সময় কই স্যার?” পাশ থেকে কেউ ফিসফিসায়, “পড়াশোনা তো এখন মোবাইলে।” স্যার থমকে যান। স্কুল লাইব্রেরি, পাঠাগার—আলমারির কাচে ধুলো। কোথাও বই উইপোকায় কাটছে।

সেই নিখিলেশ এখন বড় উকিল। তার ছেলে রাহুল পড়ে একই স্কুলে। সকালে বাজারের পথে স্যারকে দেখে রাহুল হেলমেটের ফাঁক দিয়ে বলে, “নমস্কার স্যার”, আর বিকট হর্ন বাজিয়ে চলে যায়।

পাশেই ক্লাস নাইনের পল্টু। স্যারকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার ধারে হিসি করতে লাগল। স্যার ছাতায় মুখ আড়াল করেন। পান-দোকানের সামনে দাঁড়ানো দু-তিনটে ছেলে দূর থেকে স্যারকে দেখে হাসাহাসি করে। বুকের ভেতর ‘প্রণাম স্যার’ ডাকটা হাহাকার করে ওঠে। সম্মানটা এখন অপশনাল, ফ্যাশন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্যার ভাবেন, ‘তবুও ভালো’। তাঁর কপালের ভাঁজ গভীর হয়। তিনি যেন ভবিষ্যৎ দেখতে পান—

#####

২০৪৫ সাল।  
দীনবন্ধু স্যার আর নেই।

স্কুল গেটের সামনে এক শিক্ষক। টেস্টে ফেল করা রকি বাইক থামায় গা ঘেঁষে। মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলে, “ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গা নাকি? পথ দেখে চলতে পারোনা! একটু এগিয়ে গিয়ে আবার পেছন ফিরে বলে, এই বুড়ো, খাতা দেখার সময় মাথায় রেখো। ফেল করালে হাড়গোড় আস্ত থাকবে না। ইউটিউবে ভাইরাল করে দেব—‘ঘুষখোর মাস্টার’।”

ক্লাসে স্মার্ট বোর্ডে অঙ্ক বোঝাচ্ছেন স্যার। এক ছাত্র সিটি বাজায়, হুল্লোড় করে। শাসন করতে বেত তুলতেই পরদিন স্কুলে হানা দেয় সভাপতি আর নেতারা। অভিভাবক চোখ রাঙায়, “আমার ছেলেকে মারার অধিকার কে দিয়েছে?” শেষে থানায় মামলা।

বাজার ফেরত স্যারকে আরেক ছাত্র বাইক থামিয়ে শাসায়, “এবার পরীক্ষায় বসব না। পাশ করিয়ে দিতে হবে, বুঝলেন?” বলেই ধাক্কা। স্যার রাস্তায় পড়ে যান। ছাতাটা ভেঙে দু’টুকরো। চারপাশে ছেলেরা টিকটক করছে, হাসছে। কেউ তোলে না, উল্টো মোবাইলে ভিডিও করে। ভয় দেখিয়ে অপমান করাটাই এখন ‘স্মার্টনেস’।

স্যার ধুলো ঝেড়ে ওঠেন। ভাঙা ছাতাটা হাতে নেন। কপালের ভাঁজ আরও গভীর হয়। বিড়বিড় করেন, “চক-ডাস্টার থেকে স্মার্ট বোর্ডে এলাম। অঙ্ক শেখালাম, মানুষ বানাতে পারলাম কই? রাতভর হোম ওয়ার্ক করলাম, বোর্ডে সূত্র লিখলাম ,  ছাত্রের বুকে মূল্যবোধ লিখতে ভুলে গেছি। সমাজ নেট-দুনিয়ায় ব্যস্ত।”

দূরে স্কুলবিল্ডিংটার দিকে তাকান। মনে সন্দেহ জাগে—ওটা কি আর স্কুল আছে, না কি বেয়াদব তৈরির কারখানা হয়ে গেছে?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়