প্রতিবেদন

মেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল—সরকারি বনাম বেসরকারি স্কুলের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

সদ্য প্রকাশিত মেট্রিক পরীক্ষার (CBSE এবং SEBA) এর ফলাফলে দেখা গেছে, সার্বিক পাসের হারে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি স্কুলের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে। পরিসংখ্যানের এই খণ্ডচিত্র দেখে অনেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে বেসরকারি স্কুল মানেই উন্নত শিক্ষা। এদের বদ্ধমূল ধারণা যে সরকারি স্কুলে পড়াশোনা হয় না। কিন্তু ফলাফলের গভীরে গেলে চিত্রটি ভিন্ন কথা বলে।

১. শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট:-

সরকারি স্কুলের মূল শক্তি তার সর্বজনীনতা। এখানে মূলত সমাজের প্রান্তিক অংশের ছেলেমেয়েরা পড়ে—দিনমজুর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গৃহশ্রমিক পরিবারের সন্তান। এদের বড় অংশকেই গৃহস্থালির কাজ, মাঠের কাজ বা ছোটখাটো রোজগারে পরিবারকে সাহায্য করতে হয়। নিয়মিত ক্লাস করা, পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট সময়ের অভাব বা রাত জেগে পড়ার সুযোগ এদের প্রায় নেই। অভিভাবকদের একটা বড় অংশ নিজেরাই স্বাক্ষরজ্ঞানহীন, ফলে পড়াশোনার তদারকি হয় না। এই শ্রেণীর অভিভাবকদের আরও একটা ধারণা থাকে পড়াশোনা করে শিক্ষিত হলেও টাকার অভাবে তাদের চাকরি হবে না। এই ভুল ধারণার কারণে তারা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। এই প্রতিকূলতা নিয়েও যারা পাস করেছে, তাদের লড়াইটা অনেক বড়।

অন্যদিকে বেসরকারি স্কুলে সাধারণত সচেতন ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরা ভর্তি হয়। বাড়িতে পড়ার পরিবেশ, গৃহশিক্ষক, ইন্টারনেট ও অভিভাবকের নিয়মিত তদারকি—এই ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে।

২. শিক্ষকের মান ও নিয়োগ প্রক্রিয়া:-

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা ভালো হয়। অথচ বর্তমান সময়ে সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ হয় রাজ্যভিত্তিক Teacher Eligibility Test (TET) বা সমমানের কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, শিক্ষণ পদ্ধতি ও যোগ্যতা যাচাই করেই তাদের নির্বাচন করা হয়। কাজেই সরকারি স্কুলে পড়াশোনা ভালো হয় তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

অন্যদিকে, বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে নিয়োগের কোনো অভিন্ন মানদণ্ড নেই। TET উত্তীর্ণ না-হওয়া বা পরীক্ষায় না-বসা অনেকেই বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। অবকাঠামো ও শৃঙ্খলার কারণে এবং সর্বোপরি তাদের অদম্য চেষ্টার ফলে তারা ভালো ফল করাতে সক্ষম হন, এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু শিক্ষিত এবং সচেতন অভিভাবক এখানে বড় ফ্যাক্টর। 

ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা এবং ভালো রেজাল্ট এর জন্য মূলত তিনটি ফেক্টর কাজ করে। ছাত্র - অভিভাবক এবং শিক্ষক। যার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সরকারি স্কুলে প্রথম দুটির সমন্বয়ের খুবই অভাব। শিক্ষক যতই সচেষ্ট হোন না কেন সেখানে অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা হতাশাজনক। যার চিত্র বেসরকারি স্কুলে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

৩. পরিকাঠামো ও পরীক্ষার পরিবেশ:-
  
বেসরকারি স্কুলে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কম, শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বেশি, এবং নিয়মিত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন হয়। সরকারি স্কুলে প্রায়ই শিক্ষক-সংকট, বড় ক্লাসরুম ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপ থাকে। বছরের অধিকাংশ সময় সরকারি শিক্ষকরা সরকারি অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হয়। তারপরও সরকারি স্কুলের যে শিক্ষার্থীরা ভালো করেছে, তারা মূলত একটা অংশের নিজেদের জেদ আর শিক্ষকদের আন্তরিকতা প্রচেষ্টায় করেছে।

৪. ফলাফলের প্রকৃত ব্যাখ্যা;-
শুধু পাসের হার দিয়ে মান যাচাই করলে অবিচার হবে। যদি একই আর্থ-সামাজিক অবস্থানের, একই সাপোর্ট সিস্টেম পাওয়া দুই দল শিক্ষার্থীকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে পড়ানো যায়, অর্থাৎ সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যদি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক দিয়ে এবং বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সরকারি স্কুলের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো যায় তবে ফলটা উল্টোও হতে পারে, এটা নিশ্চিত। সরকারি স্কুলের প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের হাতে যদি সচেতন অভিভাবকের সন্তান আসে, তাহলে ফলাফল দ্বিগুণ ভালো হওয়া অসম্ভব নয়।

৫.আরও একটা ব্যাপার যা উল্লেখ না করলে না হয় তা হলো মোবাইল ফোনের ব্যবহার। পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। মোবাইলে আজকাল সব ধরনের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এই মোবাইল আবার ছাত্রছাত্রীদের জীবন নষ্টের একটা কারণ। সচেতন নাগরিকদের ছেলেমেয়েরা সাধারণত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না বা করলেও সময় সাপেক্ষ এবং অভিভাবকদের সবসময় সতর্ক দৃষ্টি থাকে, কোন কাজে ব্যবহার করছে। কিন্তু সাধারন অভিভাবকরা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উদাসীন। যার ফলে ওরা পড়াশোনার লাইন ছেড়ে সম্পূর্ণ বিপথে চলে যায়।

উপসংহার
মেট্রিকের ফল বলছে বেসরকারি স্কুল সংখ্যায় এগিয়ে। কিন্তু লড়াইয়ের বিচারে সরকারি স্কুলের ছেলেমেয়েরা কোনো অংশে কম নয়। তারা প্রতিকূলতাকে হারিয়ে যে নম্বর তুলেছে, তার ওজন অনেক বেশি। তাই শুধু রেজাল্ট দেখে স্কুল বা শিক্ষকের বিচার না করে, কাদের নিয়ে সেই রেজাল্ট—সেটাও দেখা দরকার। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন অভিভাবকের সচেতনতা, নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পরিকাঠামোগত ঘাটতি পূরণ। তাহলেই ‘সরকারি’ ট্যাগটাই সেরা রেজাল্টের পরিচয় হবে।

( এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এব্যাপারে আপনার মতামত কী)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়