দরজার ওপার
ব্যবসায়ী সালাম সাহেব গ্রামের সবচেয়ে বড় মহাজন। স্বল্প দিনের মধ্যে তিনি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন, কিন্তু এতোই কৃপণ ছিলেন যে নিজে না খেয়ে না পরে শুধুই রুজি রোজগারে জীবন কাটাচ্ছেন। টাকা ছাড়া মানুষ চিনতেন না।
পাশের বাড়ির তার এক অতি নিকট আত্মীয় রফিকুল একদিন মেয়ের বিয়ের ব্যপারে অসহায় হয়ে কিছু টাকা ধার চাইতে এল। সালাম সাহেব দরজা থেকেই তাড়ালেন, “তোর মতো মানুষের আবার বিয়ে! মেয়ে যার পছন্দ হয় তাকে বল নিয়ে যেতে। টাকার দরকার কি, আমার কাছে টাকা নেই, যতসব!" বলেই ঘরে ঢুকে গেলেন।
তার এহেন ব্যবহারে রফিকুল কেঁদে ফিরে গেল।
দেখতে দেখতে দশ বছর কেটে গেল। সালাম সাহেবের একমাত্র ছেলে বিদেশে অ্যাক্সিডেন্ট করল। চিকিৎসায় সব জমি-বাড়ি বেচতে হলো। শেষে ছেলেটাও বাঁচল না।
নিঃস্ব সালাম সাহেব এখন মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন।
এক সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হঠাৎ তার মনে পড়লো রফিকুলের কথা। চেয়ে দেখেন পাশে ইয়া বড়ো দুতলা বিল্ডিং। এ জায়গাটা যেন চেনাই যায় না। পিপাসায় তখন তার কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। সাহস করে ঢুকে পড়লেন রফিকুলের বাড়ি। তার দোরে দাঁড়ালেন। ভেতর থেকে রফিকুল বেরিয়ে এলো। এখন সে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। মেয়ের জামাই দুবাই থেকে টাকা পাঠায়।
সালাম সাহেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। চোখ তুলতে পারছেন না। শুধু বললেন একটু জল পান করবেন।
রফিকুল কিছু বলল না। চুপচাপ এক বোতল জল আর একটা প্লেটে ভাত, ডাল, মাছ তুলে দিল। সাথে একটা নতুন গামছা।
“চাচা, রোদে মুখ শুকায়ে গেছে। খেয়ে নেন।”
সালাম সাহেবের চোখ ভিজে গেল। যে দরজায় একদিন রফিকুল দাঁড়িয়েছিল অপমানে, আজ সেই দরজায় তিনি দাঁড়িয়েছেন ভিখারীর বেশে।
খেতে খেতে শুধু একটা কথাই মনে পড়ল—
কখন কার দরজায় কাকে দাঁড়াতে হবে, সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।
রফিকুলও মনে মনে ঐ কথাটাই ভাবছিল। সে বিড়বিড় করে বলল," সৃষ্টিকর্তার কী অপরূপ মহিমা! যার কাছে অসহায় হয়ে মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা ধার চেয়েছিলাম আজ সে আমার দ্বারে।" মুখে কিছু না বলে ঘরে ঢুকে ফেরত আসলো। তার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট। সফিকুলের হাতে নোটটি দিয়ে বললো," সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই তাঁর সৃষ্টির কথা, ভুলে যাই নিজের মানবতা। মানুষ হয়েও অমানুষের কাজ করতে আমরা দ্বিধা বোধ করি না।"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন