অভাগীর সংসার

 

সুপ্রিয়া দেবী ছেলে দীপায়নকে নিয়ে যেন এক মহা সমুদ্রের মাঝে ভেসে গেছেন। মাত্র ছয় বছরের দীপায়ন। এ সংসারে একমাত্র সে ই রইল মুখাগ্নি দিতে। কিন্তু ওকে নিয়ে কিভাবে কি করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। ওকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি এতদিন কাজ করে ওকে পড়িয়ে মানুষ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন অবস্থাতেই তাকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত নবম শ্রেণীতে দু দুবার ফেল করে সে আর পড়বে না বলে মাকে জানিয়ে দিল। এদিকে আবার মায়ের এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করা সে সহ্য করতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে মা একটি চায়ের দোকান খোলার চিন্তা করলেন। 

দিন গড়িয়ে যায়। কয়েক মাসের মধ্যেই তার দোকানে অনেক উন্নতি হল। চায়ের সঙ্গে রুটি বড়া সিঙ্গাড়া ইত্যাদি বিক্রি করতে শুরু করলেন। এখন আর অভাব বলতে কিছু রইল না। মা-ছেলে মিলে খুব সুখেই দিন কাটাতে লাগলেন। কিন্তু সুখের আয়ূ বড় স্বল্প। টাকা পয়সা একটু বেশি হওয়াতেই সমস্যা। অধিক টাকা পয়সাই মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়,এটা আবারো প্রমাণিত হল। 

সুপ্রিয়া দেবী লক্ষ্য করলেন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সে দোকানে বসে গ্রামের আরো তিন চারটা ছেলেকে নিয়ে তাস খেলায় মেতে ওঠে। মাঝে মধ্যে মদেরও গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি তাকে তেমন ভাবে শাসন করতে পারেননি। ছেলে অনেক বড় হয়ে গেছে তাছাড়া তার মনে পড়ে গেল নিজের স্বামীর কথা।

  বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর খুব ভালোই চলছিল। কিন্তু অভাবের কারণে দীপায়নকে মাত্র তিন বছরের ছেলে রেখে ওর বাবা বিদেশে চলে যায়। কিন্তু সুপ্রিয়ার দোষই বা কোথায়। একদিন পূজোর প্রাক মুহূর্তে গৃহস্থালির কিছু জিনিস পত্র আর দীপায়নের কাপড় কিনা নিয়ে তাদের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল, আর এরপরই হঠাৎ একদিন কোন কিছু না বলেই -----

বিদেশে গিয়ে প্রথম দু-তিন বছর মাঝে মধ্যে কিছু টাকা পাঠিয়েছিল এবং খবরাখবর ও নিয়েছিল কিন্তু এরপর হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ দিন থেকে কোন খবরাখবর না পাওয়ায় তিনি ধরে নিয়েছেন হয়তো সে আবার সেখানে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেছে। স্বামীর অবর্তমানে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে ছেলেকে যেভাবে কোলেপিঠে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন তা ভাবলে আজও তার গা শিউরে ওঠে। ঐ কথাগুলো মনে হওয়ায় তিনি ছেলেকে বেশি শাসন করতে চাননা কারণ ঐ ঘটনার আবার যদি পুনরাবৃত্তি হয়! দীপায়নকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। ঘরে পুত্র বধু এনে সব দায়িত্ব ওর হাতে ন্যস্ত করেন। 

  বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর খুব ভালোই চলল। ইতিমধ্যে তিনি দুটি নাতি নাতনিও লাভ করেন। এদের মধ্যেই তিনি আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু দীপায়নের মদের নেশা আবার তাকে গ্রাস করে নিল। স্ত্রী সুপর্ণা অনেক চেষ্টা করেছে মদ ছাড়াতে কিন্তু বিনিময়ে রোজই তাকে মার খেতে হয়েছে। দুএকবার এরকম ও হয়েছে কিল ঘুষি আর লাথি সহ্য করতে না পেরে সুপর্ণাকে বাবার বাড়ি চলে যেতে হয়েছে। এইভাবে সুপ্রিয়া দেবীর কষ্টে গড়া ফুলের বাগান যেন তিলে তিলে নষ্ট হয়ে যেতে লাগল।

শেষ পর্যন্ত একদিন রাতে নেশা করে পাশের নর্দমায় পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে এক সময় সে নিস্তেজ হয়ে গেল। সে তো চলে গেল কিন্তু রেখে গেল অভাগী মায়ের বুকে সাহারা মরুর হাহাকার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়