ডাইনি বুড়ির ভয়ে



সে অনেক আগের কথা। একবার রাতুল পূজার বন্ধে ওর মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে কাশিপুর বেড়াতে যায়। যে কয়দিন সে সেখানে ছিল, সারাদিন মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে গ্রামে ঘুরে বেড়াত আর নতুন জায়গা দেখে তার খুব ভালো লাগত। একদিন এভাবে বেড়াতে বেরিয়ে তারা গ্রামের ওপাশে একটা তেঁতুল গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। গাছে ঝোপা ঝোপা পাকা তেঁতুল দেখে রাতুলের জিভে জল এসে গেল। সে মামাতো ভাইকে বলল গাছ থেকে পাকা তেঁতুল পাড়বে। মামাতো ভাই অপু তাকে গাছে উঠতে বারণ করল। কারণ এ গাছটা নাকি খুব দোষী। একদিন তার দাদু গল্পচ্ছলে এই গাছের কাহিনী তাকে বর্ণনা করেছিলেন, এই গাছটির বয়স কত হবে কেউই বলতে পারে না। তিনি ছোট বেলায় এটাকে যেভাবে দেখেছিলেন আজও সেভাবেই আছে। এটার বয়স নাকি কয়েক শো' বছর হবে। এ গাছটিতে নাকি ডাইনি বলে এক বুড়ি থাকে। আর এই কারণে এই গাছটিতে বারো মাস ঝোপা ঝোপা তেঁতুল ধরে। কিন্তু ডাইনি বুড়ির ভয়ে কেউ এ গাছে উঠে না। পাকা তেঁতুল নীচে পড়লে তবেই নাকি মানুষ তা কুড়িয়ে নেয়। দিনের বেলায় এখানে কোন তেঁতুল পাওয়া যায় না কিন্তু সকাল বেলা প্রচুর পরিমাণে তেঁতুল পাওয়া যায়। দাদুর কথা মতে প্রতিদিন রাতে নাকি ডাইনি বুড়ি ও তার নাতি নাতনিরা গাছে খেলা করে আর তখন অনেক তেঁতুল নীচে পড়ে তাই সকালে সেগুলো পাওয়া যায়। 
এতটুকু শুনে রাতুল বলল,' ওসব ডাইনি আর ভুত টুত আমি বিশ্বাস করি না। সে এক যুগ আর এখন আরেক যুগ। তখন যদি ভুত থেকেও থাকে এখন আর নেই। কারণ এখন বিজ্ঞানের যুগ। মানুষ এখন ভুতের অনেক ঊর্ধ্বে। আগে হয়তো ভূতকে মানুষ ভয় করতো কিন্তু এখন ভুত মানুষকে ভয় পায়। ' বলে সে গাছে উঠতে চাইলে অপু তাকে বাধা দেয়। কিন্তু রাতুল কোন বাধাই মানতে চাইল না। পাকা পাকা আর ঝোপা ঝোপা তেঁতুলের লোভ সামলাতে না পেরে বলল,' তুই নীচে থাক, আমি গাছে উঠছি, বলেই দুই লাফে সে গাছের উপর উঠে গেল। কিন্তু গাছের উপরে উঠে তার চক্ষু তো চড়কগাছ! একী! নীচে থেকে গাছ ভর্তি তেঁতুল দেখা গেলেও উপরে উঠে সে আর তেঁতুল দেখতে পায় না। বিষয়টা কি সে ভাবনায় পড়ে গেল। এমন কি পাশে থেকে যে ডালে তেঁতুল দেখা যায় সে ডালে উঠে গিয়েও আবার তেঁতুল পাওয়া যায় না। এই অদ্ভুত কাণ্ডে সে মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। আর তখনই একটা আওয়াজ তার কানে এসে পৌঁছল,' এই এখানে কে রে? তোর কি প্রাণের ভয় নেই? তুই ডাইনি বুড়ির গায়ে হাত দিয়েছিস, আজ আর তোর রক্ষা নেই।'  চিৎকার শুনে রাতুল ভয়ে ভয়ে নীচের দিকে চেয়ে দেখে অপু পালিয়ে যাচ্ছে। সে যতটুকু সাহস নিয়ে গাছে উঠেছিল তার দ্বিগুণ ভয়ে সম্বিত হারিয়ে ফেলল আর জড়োসড়ো হয়ে গাছের ডালে জড়িয়ে ধরে নিস্তেজ হয়ে বসে রইল। 
এদিকে অপু দৌড়ে গিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করল।  অদূরে কিছু ছেলে খেলা করছিলো, তার চিকিৎসা চেঁচামেচিতে তারা এগিয়ে এলো। ইতিমধ্যে কয়েকজন বয়স্ক মানুষও সেখানে এসে উপস্থিত হল। তারা সবাই রাতুলকে ডাকা ডাকি করল কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। রাতুল মরার মত নিস্তেজ হয়ে গাছের ডালে জড়িয়ে শুয়ে আছে। কেউ সাহস করে গাছে উঠতে চাইল না। অনেকেই বলতে শুনা গেল ,' ডাইনি বুড়িটা বোধহয় রাতুলকে মেরে ফেলেছে।'  ইতিমধ্যে খবরটা রাতুলের বাড়িতে পৌঁছে গেছে। অপুর বাবা অর্থাৎ রাতুলের মামা আরও অনেক জন লোক সঙ্গে নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছেছেন। তিনি রাতুলের এ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং মন্দিরে পূজা দেবেন, প্রসাদ চড়াবেন বলে মানত করলেন । এরপর রাতুল, প্রিয় রাতুল বলে ডাকতে শুরু করেন। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে নিরুপায় হয়ে গাছে উঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইতিমধ্যে গাছটি ঘিরে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত। শেষে সবাই সাহস যোগাল। মামা গাছে উঠে রাতুলের পাশে এসে ডাক দিতেই সে নড়ে উঠলো, সম্বিৎ ফিরে পেল। সে বলে উঠলো,' মামা, আমার কিছু হয়নি।' দুজন মিলে একসাথে গাছ থেকে নেমে আসল। নীচে আসার পর সবাই রাতুলকে ঘিরে জানতে চাইল আসলে কি হয়েছিল। রাতুল তখন ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,' কি জানি কে একজন মানুষ জোরে চিৎকার করে বলতে শুনলাম,' তুই ডাইনি বুড়ির গায়ে -------
----- ।' এরপর সে আর কিছু বলতে পারে না।
   এ ঘটনাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নানা জল্পনা কল্পনা চলল। এমন সময় পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা মহিলা এসে বললেন,' আমিই ওকে চিৎকার করে ডেকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম। ছোড়াটার কি সাহস দেখ! আমরা চৌদ্দ পুরুষ ধরে এখানে আছি কিন্তু কোন দিন কেউ সাহস করে এ গাছটাতে উঠেনি। ভাগ্যিস ও বেঁচে আছে।' কথাটা শেষ হতেই আর একজন বলে উঠল,' সবাই জানে এই গাছটাতে ডাইনি বুড়ি থাকে, এখানে আসলেই ওর নজর পড়ে যায়। তাছাড়া এই ভর দুপুরে এই গাছটার পাশে ----' কথাটা শেষ না হতেই আর একজন কথা কেড়ে নিয়ে বলে,' এইতো সেদিন আমার ওবাড়ির নাতি টা এখানে এসেছিল আজ অব্দি তার জ্বর ছাড়েনি।' আর একজন বলল ,' আমার পিসাতো ভাইটি তেঁতুল খেতে এসে যেই ডাইনির চোখে পড়ে, আজ অব্দি ওর মাথা ব্যথা ছাড়েনি। কত ঔষধ করা হয়েছে,কত ওঝা বৈদ্য দেখানো হয়েছে। সবাই ঐ একই কথাই বলে, তাকে তেঁতুল গাছের ডাইনিতে ভর করেছে। আর একজন কি বলতে যাবে এমন সময় একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলে বলে উঠলো,' হয়েছে হয়েছে, ঐ উনি যদি চিৎকার করে তাকে সতর্ক না করতেন তাহলে অপুও এখান থেকে পালাতো না আর সেও ভয় পেয়ে গাছে অজ্ঞান হতো না। ভাগ্যিস ছেলেটা সাহস করে বেঁচে গেল। রাখ তোমাদের ঐ ডাইনির কথা। ওসব ডাইনি আর ভুত টুত বলে কিছু নেই। সবই মনের ভ্রম।

মন্তব্যসমূহ