কালোবাজারি



সে অনেক আগের কথা। হুদিরাম দেশে নানা রকম অরাজকতা ও সমস্যার কথা চিন্তা করে কয়েকজন নতুন মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে তার নিজের রাজসভা আবার নতুন করে সাজালেন। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরদিনই রাজসভায় কালোবাজারিদের দৌরাত্ম নিয়ে আলোচনা শুরু হল। নেতৃস্থানীয় কয়েকজন উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে লাগল কালোবাজারিদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ আজ নাজেহাল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে গেছে সুপারির কালোবাজারি। এদের দৌরাত্ম্যে স্থানীয় সুপারি মালিকরা পথে বসে আছে। এ ব্যাপারে তুমুল হৈচৈ শুরু হয়ে গেলে হুদিরাম খুবই গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি বিবেচনা করে নব নিযুক্ত মন্ত্রী বোধিরামকে এর দায়িত্ব দিলেন। তিন দিনের সময় সীমা বেঁধে দিয়ে তিনি কালোবাজারিদের ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। 
বোধিরাম নতুন মন্ত্রী হয়ে আনন্দে আত্মহারা। বললেন,' এ তো আমার বা হাতের খেল। আজই আমি এর একটা সুরাহা করে ছাড়ব। ' আসলে বোধিরামের পড়াশোনা বেশি নেই। কালোবাজারি কি জিনিস তা সে নিজেও জানে না। তবু সে এত বড় একটা দায়িত্ব পেয়ে ভাবল তার সাকরেদ তোলারাম থাকতে তার কোন ভয় নেই। কারণ তোলারাম চিনে না এরকম কোন স্থান এ রাজ্যে নেই। 
বাড়িতে এসে বোধিরাম তোলারামকে ডেকে পাঠালো। তোলারাম এসে দেখে নব নিযুক্ত মন্ত্রী মশাই তার অপেক্ষায় পায়চারি করছেন। তাকে দেখামাত্র বললেন,' এই যে তোলারাম, আজ রাতে নয়টায় প্রস্তুত হয়ে এসো। কালোবাজার যাব, কালোবাজারিদের ধরতে হবে। '
তোলারাম বলল,' কিন্তু কর্তা, আজ যে আমার নিমন্ত্রণ আছে। শ্যালিকার বার্থ ডে বলে কথা। '
বোধিরাম, ' আর কোন কিন্তু নয়। যাও রাত ন'টায় প্রস্তুত হয়ে এসো। আর হ্যাঁ, আসার সময় একটা লাল ফ্ল্যাগ নিয়ে এসো।' তোলারাম পড়ল মহা ফাঁপরে। একদিকে শ্যালিকার বার্থ ডে, কী আহামরি খাবার আর নাচগান আনন্দের আসর আর অন্যদিকে ছোট বেলার বন্ধু তথা নতুন মন্ত্রীর আদেশ। অগত্যা বাধ্য হয়ে বলল,' ঠিক আছে আমি আসবো।'
   রাত ন'টায় দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওয়ানা হল। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তারা দুজনই জানে না। ঘোড়ায় চড়ে বোধিরাম তোলারামকে জিজ্ঞেস করল,' কালোবাজার কোথায়?'
সে বলল,' হতে পারে ঐ কালো পাহাড়টার আশেপাশে কোথাও। ' বোধিরাম আবার বলল ওখানে যেতে কত সময় লাগবে।' 
' এই ধরুন তিন চার ঘন্টা।' বোধিরাম ঘড়ি দেখে বলল,' এখন বাজে ন'টা, তারমানে আমরা সেখানে পৌঁছাতে বারো একটা বেজে যাবে।' তোলারাম বলল,' তাতো বটে।'
   দু ঘন্টা যাত্রার পর তারা একটা চায়ের দোকান দেখে ওখানে থামলো। চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে দুজন চা পান করবে এমন সময় দুজন বয়স্ক লোকের কথাবার্তা তাদের কানে গিয়ে পৌঁছল। একজন অন্যজনকে বলছে,' এটা আর নতুন কি, ঐতো আর এক ঘন্টা পরই শুরু হয়ে যাবে কালোবাজারিদের দৌরাত্ম। রোজই তো এঘাটে কয়েকটি জাহাজ বোঝাই সুপারি পার হয়ে যায়।' 
অন্যজন বলল,' কি আর করব ভায়া, আমরা এমন রাজার দেশে আছি, এখানে যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক। রাজার সেনাবাহিনীর লোকরাও একাজে জড়িত। তারা মোটা অংকের বিনিময়ে কালোবাজারিদের ছেড়ে দেয়। '
প্রথমজন ,' শুনেছি একজন নতুন মন্ত্রী এদের ধরার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে।'
দ্বিতীয়জন,' উনিই বা কি করবেন, হয়তো কয়েক হাজার টাকার ভাগ বসাবেন। ' 
এতক্ষণ তারা নিরিবিলি এদের কথাবার্তা শুনছিল। এবার বোধিরাম কানে কানে তোলারামকে বলল,' এদের কথাবার্তা থেকে বুঝা যাচ্ছে আমরা কালোবাজারিদের পাশাপাশি এসে গেছি। এদের জিজ্ঞেস করে দেখ না।' 
তোলারাম এগিয়ে গিয়ে এদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, আর মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে মেইন রোডের ডানদিকে একটি রাস্তা আছে। ওখান থেকে গলি পথে বাঁদিকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নদীর ঘাটে যাওয়ার রাস্তা। ওখানেই তো সব লেনদেন ও মাল বোঝাই হয়। ' এতটুকু শুনে তোলারাম বুঝতে পারল  কাজ হয়ে গেছে, বোধিরামকে সে কানে কানে বলল ,' আমি বলছিলাম না কর্তা , '"ভাগ্যবানের বোঝা স্বয়ং ভগবান বহন করেন।" আমরা তো না জেনে না চিনেও মেইন জায়গায় এসে গেছি।' 
বোধিরাম আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলল,' তাহলে চল আমরা এগিয়ে যাই। তারা মেইন রাস্তা দিয়ে কিছুদূর এগোনোর পর ওদের কথামত রাস্তা থেকে নেমে গলি পথ ধরে এগিয়ে চলল। একটু দূর গিয়ে দূরে নদীর ঘাটে মিটিমিটি আলো দেখে বোধিরাম তোলারামকে বলল,' ঐ দেখ মিটিমিটি আলোর মধ্যে কি যেন দেখা যাচ্ছে, হাঁ ঐতো ঘাটে জাহাজ আর কয়েকজন মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। আমি এখানে থাকবো আর তুমি এগিয়ে যাও।'
তোলারাম ভয়ে ভয়ে বলল,' কিন্তু কর্তা, ওরা যদি আমায় ধরে ফেলে?' বোধিরাম বলল,' কোন ভয় নেই আমি আছি। যখনই কোন অসুবিধা বোধ করবে হাতের ঐ লাল কাপড়টা উপরে উঠিয়ে চিৎকার করবে, অমনি আমি হুইসেল বাজিয়ে দেব সঙ্গে সঙ্গে মানুষ জড়ো হয়ে যাবে। ব্যাটা কালোবাজারিদের আজ বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব।' 
তোলারাম ভয়ে ভয়ে বলল,' কর্তা আমি একা---!'
বোধিরাম বলল,' একা কেন, আমি তো পেছনেই আছি। আসলে ওরা আমাকে চিনে ফেলবে এজন্য তোমাকে আগে যেতে বলছি।' 
দুপাশে ঘন জঙ্গল আর মধ্যে ছোট রাস্তা, তোলারাম ভয়ে আড়ষ্ট। এ যেন এক মহা বিপদ। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, ' কি ভুলই না করলাম ওর সঙ্গে এসে। এতক্ষণে হয়তো বার্থ ডে কেক কেটে শ্যালিকার সঙ্গে কি আনন্দটাই না করতাম। মাছ মাংস পনির অনেক দিন থেকে পাতে পড়েনি। শ্যালিকা এতক্ষণে হয়তো জোর করে এসব খাওয়াতো।' ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা শব্দ শুনে ভয়ে চিৎকার করে উঠল আর অমনি বোধিরাম জোরে হুইসেল বাজিয়ে দিল। চিৎকার আর হুইসেলের শব্দ শুনে কালোবাজারিদের দল সব কিছু ফেলে দ্রুত পালিয়ে গিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। ইতিমধ্যে সেখানে মানুষের ভিড় জমে গেছে।
তোলারাম বলল,' দেখলেন কর্তা, শালার বেটাদের কেমন জব্দ করলাম।' 
বোধিরাম বলল ,' এটা তো হয়েছে বুদ্ধির বলে। বোধিরামের বুদ্ধি তুমি এখনো দেখনি। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আসা, আগে পাঠানো আর হুইসেল বাজানো সব ক্ষেত্রেই আমার বুদ্ধি কাজ করেছে।' অতঃপর জমায়েত লোকদের সামনে বলল,' আমি মন্ত্রী থাকতে কার এমন সাধ্য যে আমার অনুমতি ছাড়া অবৈধ ভাবে বিদেশি সুপারির কারবার করে। তিন দিনের মধ্যে সকল শালার কালোবাজারিদের জেলে পুরে ছাড়ব।'
অভিযান শেষ করে বাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতেই দুজন লোক এসে বোধিরামের সঙ্গে দেখা করতে এল। বোধিরাম তোলারামকে সামনে দিয়ে বললো,' যা কিছু বলার উনাকেই বলুন।' অতঃপর বোধিরামের ইঙ্গিতে তোলারাম দুলক্ষ টাকা নিয়ে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করে দিল।
   পরদিন সমস্ত দৈনিকে ফলাও করে বোধিরামের ছবি সহ খবরটি প্রকাশিত হল, ' বোধিরামের নেতৃত্বে পাঁচ লক্ষ টাকার সুপারি উদ্ধার।' 
পরদিন সকালে খবরের কাগজটি হাতে নিয়ে তোলারাম বোধিরামকে গিয়ে বলল,' কর্তা, তুমি কি বুদ্ধিমান। কালোবাজারিরা আজ তোমার খপ্পরে। একেই বলে রাজনীতি আর  একেই বলে কালোবাজারি। টাকাও পেলে আর বিশ্ব জুড়ে সুনামও অর্জন করলে। এক রাতেই বাজিমাৎ।

মন্তব্যসমূহ