প্রবন্ধ: বরাক উপত্যকা ও বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত
ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে আসাম রাজ্য আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বড় এবং সমৃদ্ধ। আসামের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩,৬৬,২৫০০০ জন।ভৌগলিক দিক থেকে আসামকে তিনটি উপত্যকায় ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হল যথাক্রমে ব্রম্মপুত্র উপত্যকা, বরাক উপত্যকা ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য অঞ্চল।
বরাক উপত্যকা দক্ষিণ আসাম নামেও পরিচিত। বরাক উপত্যকার মোট আয়তন ৬৯২২ বর্গকিলোমিটার। এই উপত্যকার প্রধান শহর হল শিলচর। বরাক নদীর নাম থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে বরাক উপত্যকা। আসামের তিনটি প্রশাসনিক জেলা- কাছাড়, করিমগঞ্জ, এবং হাইলাকান্দি নিয়েই বরাক উপত্যকা গঠিত। এই তিন জেলার মধ্যে ব্রিটিশ ভারতে আসার আগে, কাছাড় ছিল কাছাড়ি রাজ্যের মধ্যে, এবং করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার মধ্যে ছিল। ১৯৪৭ সালের বিতর্কিত গণভোটের পর উভয় অঞ্চলকে সিলেট থেকে আলাদা করা হয়; সিলেটের বাকি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের (এখন বাংলাদেশ) এবং ভারতের করিমগঞ্জের মধ্যে ভাগ করা হয়।
বরাকের প্রাচীন নাম ছিল ‘বরবক্র'। রূপেশ্বর থেকে দক্ষিণ দিকে বরবক্র নামে খ্যাত সর্বপাপনাশী একটি তীর্থস্থান আছে, সেই স্থানে পুরাকালে মুনি শ্রেষ্ঠ কপিল মুনি তপস্যা করতেন। সুরমা নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি আছে যে, রাজা ক্ষেত্রপাল বারো শতকে একটি খাল খনন করে বরাক নদীর সাথে যোগ করেন। এ থেকে একটি নতুন নদীর সৃষ্টি হয়। রাজা ক্ষেত্রপালের স্ত্রীর নাম ছিল সুরম্যা। রাণী সুরম্যার নামানুসারে রাজা নদীটির নাম রাখেন সুরমা। কারো কারো মতে প্রাচীন পুরাণে পুণ্যতোয়া নামে খ্যাত শরাবতী নদীই বর্তমানের সুরমা। যা ভারতের ঈশাণ কোণ হতে সৃষ্টি হয়ে নৈঋত কোণাভিমুখে গমন করে পশ্চিম দিকে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। সেই নদীর পূর্ব-দক্ষিণ দিকের দেশ প্রাচ্যদেশ।
"বরাক" নামটি 'ব্রা' ও 'ক্রো' শব্দদুটি থেকে এসেছে। ব্রা অর্থ বিভক্ত হওয়া এবং ক্রো অর্থ উপরের অংশ বা শাখা। বরাক নদীটি করিমগঞ্জ জেলার হরিতিকরের কাছে সুরমা নদী এবং কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়েছে। এই বিভাজিত নদীর শাখা স্রোতকে স্থানীয় মানুষেরা 'ব্রাক্রো' নামে উচ্চারণ করত। বহুবছর ধরে উচ্চারণ বিকৃতির ফলে ব্রাক্রো নামটি বরাকে পরিণত হয়েছে।
বরাক উপত্যকা মূলত ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। ১৫৬২ সালে চিলা রায় কাছাড় অঞ্চলকে কচ রাজত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করেন এবং তার সৎভাই কমল নারায়ণ এই অংশের শাসন ভার নেন। নর নারায়ণের মৃত্যুর পর খাসপুর রাজ্য বলে পরিচিত রাজ্যটি স্বাধীন হয়ে ওঠে এবং কমল নারায়নের বংশধরেরা এর শাসন ভার নেন। সপ্তদশ শতকে শেষ কচ শাসকের কন্যা কাছাড়ি রাজ্যের রাজাকে বিবাহ করেন এবং খাসপুরের শাসন কচ শাসকদের হাতে চলে যায়। তারা শেষ পর্যন্ত মাইবং থেকে কাছাড়ের খাসপুরে তাদের রাজধানী সরিয়ে আনেন।
কাছাড়ি রাজ্য ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ-ভারতে যুক্ত হয়। জেলা সদর দপ্তর ছিল শিলচর। ব্রিটিশ কোম্পানি এই এলাকায় চা বাগান প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। ফলে শিলচর দেশের এই অংশে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই এখানে সমস্ত আধুনিক ব্যবস্থা চালু হয়।
১৯৪৭ সালে যখন সিলেটে গণভোট হয় তখন এই জেলাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। সিলেটের পূর্ব অংশটি করিমগঞ্জ নামে ভারতে থেকে যায় অন্য অংশটি পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমের সমভূমির সীমানা ব্যতীত এই অঞ্চলটি তিনটি দিক থেকে পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত।
আসামের সুরমা উপত্যকায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা ছিল। দেশভাগের প্রাক্কালে মুসলিম লীগের পাশাপাশি কংগ্রেসেরও হিংসাত্মক কার্যক্রম তীব্র আকার ধারণ করে। যদিও মুসলিম লীগ কিছুটা ভালো অবস্থায় ছিল। সিলেট জেলার জন্য একটি গণভোট প্রস্তাব করা হয়। হাইলাকান্দির আব্দুল মতলিব মজুমদার এবং বসন্ত কুমার দাস (তখন আসামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) উপত্যকা জুড়ে ভ্রমণ করে কংগ্রেসকে সংগঠিত করেন এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে তার ফলাফল কি হতে পারে, সে বিষয়ে সমাবেশ করে জনগনকে বোঝাতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে মৌলভি আব্দুল মতলিব মজুমদার শিলচরে আসাম জাতীয়তাবাদী মুসলিম কনভেনশনের উদ্বোধন করেন। এরপর ৮ই জুন ১৯৪৭ -এ আরেকটি বড় সভা শিলচরে অনুষ্ঠিত হয়। উভয় সভাতেই মুসলমানদের একটি বড় অংশ উপস্থিত ছিলেন। যারা ওনার কথায় গুরুত্ব দেন এবং তাদের একটি সুবিধাজনক অবস্থান দেয়। আসামের বরাক উপত্যকাকে বিশেষ করে করিমগঞ্জকে, ভারতের সঙ্গে রেখে দেবার জন্য যাঁরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তিনি মুসলিম হয়ে ও তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আব্দুল মতলিব মজুমদার সেই প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন। যাঁরা রাডক্লিফ কমিশনের সামনে এই দাবি জানিয়েছিলেন যে, সিলেটের (বর্তমানে বাংলাদেশে) একটি অংশ (বর্তমানে করিমগঞ্জ জেলা), মুসলমান অধ্যুষিত হওয়া সত্বেও যেন ভারতে থাকে। তখন থেকেই এ উপত্যকায় হিন্দু মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান।
আসামের প্রায় এক তৃতীয়াংশ (৩৬.৩০ শতাংশ) লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। বরাক উপত্যকার প্রধান ভাষা বাংলা, তবে এখনো বেশির ভাগ মানুষ সিলেটি বাংলায় কথা বলেন। ধর্মীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী কাছাড় জেলায় হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৯.৮৩%), করিমগঞ্জ জেলায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬.২৬%) এবং মুসলমানরা হাইলাকান্দি জেলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬.২৬ শতাংশ)।
জনসংখ্যার হিসাবে আসামে অসমীয়া ভাষাভাষী লোকের সংখ্যা বেশি এবং অসমীয়া ভাষাভাষীরাই সরকার গঠন করে তাই এখানে অসমীয়া ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১০ই অক্টোবর, ১৯৬০ সালে অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উত্তর করিমগঞ্জ-এর বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ২৪শে অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়।
এর অব্যবহিত পরেই অসম সরকার বরাক উপত্যকার বাঙালীদের ওপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত শুরু করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ নামক সংগঠনটির জন্ম হয়। আসাম সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির লোকেরা সংকল্প দিবস পালন করেন। বরাকের জনগণের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করার জন্য এই পরিষদ ২৪শে এপ্রিল একপক্ষ দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করেছিলেন। ২রা মে তে শেষ হওয়া এই পদযাত্রাটিতে অংশ নেওয়া সত্যাগ্রহীরা প্রায় ২০০ মাইল উপত্যকাটির গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালিয়েছিলেন। পদযাত্রার শেষে পরিষদের মুখ্যাধিকারী রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি ১৩ই এপ্রিল, ১৯৬১ সালের মধ্যে বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, ১৯শে মে তারিখে তাঁরা ব্যাপক হরতাল করবেন। ১২ই মে তে অসম রাইফেল, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী শিলচরে ফ্ল্যাগ মার্চ করেছিল। ১৮ই মে তে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরী (সাপ্তাহিক যুগশক্তির সম্পাদক) কে গ্রেপ্তার করে।
সত্যাগ্রহীদের উপর লাঠিচার্জ, বরাক ভাষা আন্দোলন
১৯৬১ সালের ১৯শে মে তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হয়। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারি কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করেন। শিলচরে তারা রেলওয়ে স্টেশনে সত্যাগ্রহ করেছিলেন। বিকেল ৪টার সময়সূচির ট্রেনটির সময় পার হওয়ার পর হরতাল শেষ করার কথা ছিল। ভোর ৫:৪০ এর ট্রেনটির একটিও টিকিট বিক্রি হয় নি। সকালে হরতাল শান্তিপূর্ণ ভাবে অতিবাহিত হয়েছিল। কিন্তু বিকালে স্টেশনে অসম রাইফেল এসে উপস্থিত হয়।
বিকেল প্রায় ২:৩০টার সময় ন'জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একটি ট্রাক তারাপুর স্টেশনের (বর্তমানের শিলচর রেলওয়ে স্টেশন) কাছ থেকে পার হয়ে যাচ্ছিল। পিকেটিংকারী সকলে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে দেখে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ভয় পেয়ে ট্রাকচালক সহ পুলিশরা বন্দীদের ফেলে পালিয়ে যায়। এর পর কোনো অজ্ঞাত লোক ট্রাকটি জ্বালিয়ে দেয়, যদিও জনগণের তৎপরতার সাথে সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তারপর প্রায় ২:৩৫ নাগাদ স্টেশনের সুরক্ষায় থাকা প্যারামিলিটারি বাহিনী আন্দোলন কারীদেরকে বন্দুক ও লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে, তখনই তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। অনেক লোকের দেহে গুলি লেগেছিল। তাদের মধ্যে ন'জন সেদিনই নিহত হয়েছিলেন; দু'জন পরদিন শহিদ হন। সেদিন ভাষা আন্দোলনের জন্য যারা শহীদ হন তারা হলেন - কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য।
পরদিন ২০শে মে শিলচরের জনগণ শহীদদের শবদেহ নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন।
শহীদদের ওই রক্তদানে মর্যাদা পায় বাংলা। ১৯৬১ সালের অক্টোবরে আইন সংশোধন করে বাংলাকে কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলায় দাপ্তরিক ভাষার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
অর্ধশতকের বেশি সময় পর পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেওয়া ভাষা সৈনিকদের শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয় সরকারিভাবে। ২০১৬ সালে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের নাম রাখা হয় ভাষা শহীদ স্টেশন।
পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আসামের তরুণ গগৈ সরকার আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে অসমিয়া ভাষার ব্যবহার জানিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছিল। কিন্তু বরাকের বাঙালির তীব্র প্রতিবাদের ফলে সার্কুলার প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলা ভাষা অনন্য হয়ে আছে। এই ভাষার লোকেরা তাদের মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকার ধরে রাখতে দুইবার তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। দুটির মধ্যে প্রথম ২১শে ফেব্রুয়ারি যা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃত এবং পালিত হয়।
অন্যদিকে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা ১৯মে' তে যারা জীবন বিসর্জন দিয়েছিল তাঁদের স্মরণে এ দিবসটি শহীদ দিবস হিসেবে সম্মানের সহিত পালন করে থাকে। এ অঞ্চলের বাঙালিরা নিজ মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা করার জন্য অতন্দ্র প্রহরীর মতো খাঁড়া হয়ে আছে।
বরাকের বাঙালি হয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষার জন্য গর্বিত। আমাদের দাবি পুরো ভারতবর্ষ এই দিনটিকে তার নিজস্ব মাতৃভাষা উদযাপন দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা যেন বিবেচনা করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন