সন্দেহ
শীলার সাথে দিব্যেন্দুর বিয়ের প্রায় দশ বছর হয়ে গেছে। যদিও তারা নিজেদের পছন্দেই একে অন্যকে বিয়ে করেছে অর্থাৎ লাভ ম্যারেজ করেছে তবুও তারা সুখী হতে পারেনি। কারণ একটাই, শীলা তাকে সন্দেহ করে। কারণে অকারণে সবসময় কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া করে। সন্দেহের বিষে সে যেন তিলে তিলে ধ্বংস হতে লাগলো। অথচ এ সন্দেহের বিশেষ কোন কারণ সে খুঁজে পায় না। একেক সময় ভাবে তার মা-বাবা অন্যত্র মেয়ে পছন্দ করে বিয়ের তারিখ পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে ছিলেন কিন্তু সে মুহূর্তে শীলার প্রেমে পড়ে মা-বাবার কথা রাখতে পারেনি। আর এটাই বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাল হয়েছে। সে শীলাকে নিয়ে সুখী হতে পারেনি, পরন্ত সবসময় একটা টেনশনে থাকতে হয়। কারণে অকারণে শীলা তাকে সন্দেহ করে আর হুমকি দেয় অন্য কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক হলে সে মরে যাবে।
আসলেই দিব্যেন্দু খুব সাদাসিধে প্রকৃতির লোক। অল্প বেতনেই সে গৌহাটির একটি বেসরকারী ইনসিওরেন্স গ্রোপ অব ইণ্ডাস্ট্রীজে জেনারেল ম্যানেজারের কাজ করে। কোম্পানির কাজে সাধারণত সকল কর্মচারীদের সাথে যে সদ্ভাব নিয়ে কাজ করতে হয়, তার মধ্যে এ গুণ গুলো ছিল খুব ভালো। সে অফিসে ইলা নামের একটা মেয়ে কাজ করে। আর দশজনের মতো ইলার সাথেও সে খুব ভালো সম্পর্ক রাখে এবং স্নেহ করে আর ওখানেই বিপত্তি। ওখানেই তার সাথে শীলার ভুল বোঝাবুঝি।
দিব্যেন্দু অনেক করে বোঝালো যে ইলা তার অফিসের জুনিয়র এ্যাসিস্টেন্ট। ইণ্ডাস্ট্রীজের কাজকর্মের স্বার্থে সবসময় পরামর্শ দরকার, এ ছাড়া ইলার সাথে তার আলাদা কোন সম্পর্ক নেই। তবু শীলা তা সহ্য করতে পারে না। দিন দিন তার সন্দেহ বাড়তেই থাকে। প্রতিদিন রাতে দিব্যেন্দুর অজান্তে সূযোগ বুঝে গোপনে তার মোবাইলের কল লিস্ট খুলে চেক করে। শুধু ইলা ই নয়, আরও কয়েকজন মেয়ের নাম মোবাইলে সেভ করা দেখে এবং তাদের কল হিস্ট্রি চেক করে আর এদের সাথে তার কি সম্পর্ক এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়।
নিজ সহধর্মিণীর সন্দেহের আবর্ত থেকে বাঁচতে সে অনেক সময় কোন মেয়ের নাম মোবাইলে সেভ করতে ছেলেদের নাম দিয়েই সেভ করে। কিন্তু "যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত্রি হয়" একবার তো সে এরকম একটা ঘটনায় ধরা পড়ে অনেক স্পষ্টিকরণ দিতে হয়েছে এবং অনেক লজ্জাও পেয়েছে। ফলে তাদের সংসারে অশান্তি দানা বাঁধতে থাকে।
এরই মধ্যে একদিন শীলার এক বান্ধবীর বিয়ের নিমন্ত্রণ ছিল। কথা ছিল দিব্যেন্দু সেদিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে দুজন মিলে বিয়ে বাড়ীতে যাবে। যথারীতি দিব্যেন্দুও অফিসের কাজ জুনিয়রদের সমঝে দিয়ে বেলা একটায় বেরিয়ে পড়ে। বাসে বাসায় পৌছতে দুঘন্টা সময় লাগবে। তারমানে তিনটায় বাসায় পৌছে অনায়াসে চারটায় তারা বিয়ে বাড়ীতে যেতে পারবে। কিন্তু রাস্তা জাম থাকায় তার অনেক লেট হচ্ছিল। ইতিমধ্যে শীলা তৈরি হয়ে অপেক্ষা করতে করতে একসময় ফোন করে। কিন্তু সে কয়েকবার ফোন ধরার চেষ্টা করে দিব্যেন্দুর ফোন বিজি পায়। আর তখন থেকেই সে রাগে ফুঁসতে থাকে।
দিব্যেন্দু বাসে বসে বসে অনেক গুলো ফোন এ্যাটেণ্ড করে এরপর সে শীলাকে ফোন করে। শীলা প্রথমে রাগ করে ফোন উঠাতে চায় নি। দু-তিন বার রিপিট ফোন করার পর সে ফোন উঠিয়েই দিব্যেন্দুকে যা তা বকুনি দিতে শুরু করলো। সে বলল,' তিনটের মধ্যে বাড়িতে আসার কথা কিন্তু বেলা চারটা বেজে চলেছে, তুমি এতক্ষণ কাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলে? আমি সেই একঘণ্টা থেকে ফোন করেই চলেছি। নিশ্চয়ই তুমি কোন মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলে আর ডিস্টার্ব না হওয়ার জন্য ফোনটা বিজি মোড করে রেখেছিলে। দিব্যেন্দু যত ই বলে,' না ,ডার্লিং তেমন কিছু নয়, আমি অফিসের জরুরি কাজে ফোনে ব্যস্ত ছিলাম। তাছাড়া রাস্তায় জাম থাকায় দেরি হয়ে যাচ্ছে।' শীলা যেন আর থামতেই চায় না। ফোনে রীতিমতো ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। আর ফোনে ঝগড়া হলে যেমনটা হয়, সে এত জোরে জোরে কথা বলছিল যে পাশের যাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। পাশের সিটে বসা এক মহিলা রাগ করে তার স্বামীর দিকে চেয়ে জোরে বলে উঠলো,' কোথায় একটু শান্তি পাবো, লাইনটা কেটে দিলেই হয় ডার্লিং ।' ফোনের মাঝে এ কথাটি শীলাকে যেন তীরের মত বিদ্ধ করলো। সে ভাবল দিব্যেন্দু কোন মেয়ের সাথে আড্ডা মারছে। মেয়েটির ঐ কথাটা তার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো,' ফোনটা কেটে দিলেই হয়, ডার্লিং!' তাই সে ফোনটা কেটে দিলো। বেচারা দিব্যেন্দু কোন কিছুই বুঝতে পারল না। রাস্তায় জাম থাকায় বাড়ি পৌঁছতে তার ছ'টা বেজে গেল। ততক্ষণে শীলা ড্রেস চেঞ্জ করে মুখ ভার করে বসে আছে। বাড়ি পৌঁছেই দিব্যেন্দু শীলাকে বলল,' রাগ করোনা ডার্লিং, রাস্তায় জাম থাকায় দেরি হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হও, পার্টিতে যাবে না?'
শীলা অগ্নিশর্মা হয়ে বলে উঠলো,' আর পার্টির দরকার কি, তুমি তো এতক্ষন পার্টিতেই ব্যস্ত ছিলে। ' দিব্যেন্দু তাকে বুঝানোর চেষ্টা করল কিন্তু শীলা কিছুই শুনতে চাইল না। সে বলে উঠলো,' মেয়েটার কণ্ঠস্বর আমি নিজে শুনেছি। তুমি ওকে নিয়ে কোন আড্ডাখানায় ব্যস্ত ছিলে? আমার সঙ্গে কথা বলতে তোমার প্রেমিকার বড় কষ্ট হয়েছে। তোমাদেরকে একটু শান্তিতে থাকতে দিতেই তো আমি ফোন টা কেটে দিতে বাধ্য হই। আমার তো আর বুঝতে বাকি নেই যে প্রথমে দীর্ঘক্ষণ ফোনালাপ করে ওকে বাধ্য করেছ তোমার সাথে আড্ডাখানায় যেতে তারপর ওকে নিয়ে ----।' নিজের কথায় নিজেই শীলা আরও উত্তেজিত হয়ে বলল,' আমি চললাম, তুমি ওকে নিয়েই সংসার করো বলেই সে হাত থেকে মোবাইল ছুঁড়ে দিয়ে হনহন করে চলে গেল। কোথায় যাবে সে নিজেই জানে না। এইভাবে মিথ্যা সন্দেহ করে শীলা নিজের সংসার তছনছ করে দিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন