প্রায়শ্চিত্ত ( ছোট গল্প)
হিফজুর রহমান লস্কর
ডাক্তার রূপ কুমারের আজ যেন আনন্দের সীমা নেই। হুইল চেয়ারে বসে বসে প্রায় শ'দুয়েক গরীব দুঃখী ও অনাথ শিশুর মধ্যাহ্ন ভোজন স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করছিলেন। মাসে দুদিন এভাবে খাবার আয়োজন করেন তিনি নিজ খরচায়। এ কাজের জন্য দুজন লোকও নিয়োজিত করেছেন। এদের মাসিক বেতনও তিনি দিয়ে যান। আজ প্রায় তিন বছর হল তিনি এ কার্যসূচী চালিয়ে আসছেন এবং স্থির করেছেন যতদিন তিনি জীবিত থাকবেন এভাবে খাবার দিয়ে যাবেন। উদ্দেশ্য একটাই হয়তো এ কাজের জন্য তিনি মুক্তি পাবেন। আর হয়তো এ কাজের জন্যই ঈশ্বর তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন
সেদিনের সে দূর্ঘটনাটি মনে পড়লে আজও তিনি শিউরে উঠেন।
আজ থেকে তিন বছর পূর্বে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি নার্সিং হোমে অপারেশনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ড্রাইভারটা অসুস্থ থাকায় তিনি নিজে কার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা ডাম্পারের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে স্ত্রীকে হারান। নিজে একটি পা হারিয়ে কোন ক্রমে বেঁচে আছেন। কোমরটা এখনও পুরো ঠিক হয়নি। তাই হুইল চেয়ারে বসে বসেই প্রহর গুনছেন।
আজ এ মধ্যাহ্ন ভোজন আসরে একজন লোককে দেখে তার সমস্ত পুরানো ইতিহাস মনে পড়ে গেল। এ লোকটাকে তিনি খুব ভালো ভাবেই চেনেন। লোকটা তার বাবার চিকিৎসার জন্য নিজের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে। তাঁর মনে পড়লো যেদিন তিনি নিউরো স্পেশিয়েলিস্ট হয়ে এ শহরে আসেন ঠিক এর পরদিনই এই লোকটা তার বাবাকে নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিল ট্রিটমেন্টের জন্য। সুদীর্ঘ দশ বৎসর তিনি ওর ট্রিটমেন্ট করেছেন। ক' দিন পর পর বেচারাকে দিয়ে ওর বাবার ব্লাড টেস্ট, সি,টি,স্কেন, এম,আর,আই স্কেন, সি,টি,মাইলোগ্রাম টেস্ট আরও কত কি টেস্ট করিয়েছেন এবং ঔষধও প্রেসক্রাইব করেছেন। বেচারা বাবার চিকিৎসা করাতে করাতে নিঃস্ব হয়ে গেছে কিন্তু বাবাকে সুস্থ করতে পারেনি। তাঁর মনে পড়লো, দীর্ঘ পঁচিশ বছরের ডাক্তারি জীবনে এমন হাজার হাজার রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা আর দেখভাল তিনি করেছেন। আজ তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। শহরে তাঁর নিজস্ব তিনটি ফ্ল্যাট আছে। ছেলেমেয়ে দুটোকেও মানুষ করেছেন। মেয়ে বড়, শহরের নামিদামি কলেজের লেকচারার। বিয়েও দিয়েছেন ইউনিভার্সিটির এক লেকচারের সাথে। ভালোই চলছে তাদের।
আজকের এ আয়োজনে তাঁর বেশি খুশি হওয়ার কারণ ছেলে এম,বি,বি,এস পাশ করে ইতিমধ্যে ইন্টার্নশিপ শেষ করে গতকালই স্থানীয় মেডিকেল কলেজে জয়েন করেছে। ছেলের মেডিকেল কলেজে যোগদানের খুশির মুহুর্তে তাঁর নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কালো অধ্যায় গুলো তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
মধ্যাহ্ন ভোজন শেষ করে সবাই চলে গেলে রূপ কুমার বাবু ছেলেকে পাশে ডেকে সে অধ্যায়টা বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন," বাবা স্বরূপ, তুমি হয়তো জাননা, আমি অত্যন্ত এক গরীব পরিবারের ছেলে। আমার বাবা এক গ্রাম্য কৃষক ছিলেন। পড়াশোনায় হয়তো একটু মেধাবী ছিলাম। মা-বাবার প্রচেষ্টা আর আত্মীয় স্বজন ও গ্রামবাসীদের অনুপ্রেরণা ও আশীর্বাদে আমি এ শহরের একজন নামকরা ডাক্তার হতে পেরেছিলাম। কিন্তু মোহে অন্ধ হয়ে আজীবন টাকার পেছনে ছুটেছি - যেমন সবাই ছুটে থাকে। গরীব দুঃখী, আপন পর বলে আমার কাছে কোন বিভেদ ছিল না। আর দশজন ডাক্তারের মতো ' রোগী মরুক আর বাঁচুক, আমার চাই শুধু টাকা ' এই মানসিকতা কেন জানি আমার মধ্যেও এসে গিয়েছিল। মেডিকেলের পাশে একটা ল্যাবরেটরী ছিল যেটা থেকে থার্টি পার্সেন্ট কমিশন নিতাম। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সব রোগীকেই ওখানে সব রকমের টেস্টের জন্য পাঠাতাম। এমনি করে টাকার পাহাড় জমিয়েছি। ফ্ল্যাট, বাড়ি,গাড়ি কোন কিছুই বাকি রাখিনি। সেদিন একটা অপারেশনের জন্য আশি হাজার টাকা কন্টেক্ট ছিল কিন্তু যাওয়ার পথে আমার জীবনের সবকিছুই হারাতে হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি, আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, আর বাকি জীবন এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেই কাটাতে চাই। তাই আমি মাসে দুদিন গণদেবতার ভোজন করাই। আমার শেষ ইচ্ছা, তুমি এরকম করোনা। অধিক টাকা পয়সার কী দরকার। সৎ পথে যতটুকু পার উপার্জন কর। ডাক্তার হয়েছ, গরীব দুঃখীর সেবা কর। যা বেতন পাবে তা দিয়ে সুখে সাচ্ছন্দে জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে। কাজেই যতটুকু পার গণদেবতার সেবা কর। আমি আমার জীবনে দেখেছি, মানুষ ডাক্তারকে ভগবান স্বরূপ মান্য করে। অন্যের কথা বাদ দাও। তোমার জীবনে এ মান্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর। " রূপ কুমারের দু'চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রুধারা। ছেলে বাবাকে স্বান্তনা দেয়," তাই হবে, বাবা।"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন