সন্তান ( ছোট গল্প)
স্কুল শিক্ষক রথীন বাবু সদ্য চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঘরে উপযুক্ত মেয়ে দুটিকে নিয়ে চিন্তিত। বড় মেয়েকে অনেক আগেই পাত্রস্থ করেছেন। ওর ঘর সংসার মুটামুটি ভালোই চলছে। কিন্তু ছোট মেয়ে দুটোর চিন্তায় রাতে ঘুম হয়না। পড়াশোনাতে ভালোই ছিল।দুজনই হাইয়ার সেকেণ্ডারী পাশ। দুজনই বিজ্ঞান শাখায় স্টার মার্কস পেয়েছে কিন্তু ছেলের পড়াশোনার খরচ যোগাতে হিমশিম খেয়ে বাধ্য হয়ে ওদের পড়াশুনায় ইতি টানতে হয়েছে।
ছেলে আজ নামকরা ডাক্তার। অনেক খরচ করে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ছেলেকে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে এ্যাডমিশন দিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়েছে। ছেলে আজ এম,বি, বি,এস পাশ করে শহরে কর্ম রত। বাবাকে না জানিয়ে নিজ ইচ্ছায় সে বিয়েও করেছে এবং শহরে সেটেল্ড হয়েছে। বাড়ীতে আসার সময় নেই। মাঝে মধ্যে অল্প স্বল্প টাকা পাঠায়, তা দিয়ে সংসার চালানো মুস্কিল। নিজে যেটুকু পেন্সন পান তা তো ওষুধ পত্তর আর লোন পরিশোধেই চলে যায়। এখন মেয়ে দুটো নিয়ে সমস্যা। অনেক ভালো ভালো জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে কিন্তু অভাবের তাড়নায় কিছু করে উঠতে পারছেন না। চিন্তা ভাবনায় দিন দিন তার শরীর ভেঙে পড়ে। অল্প দিনের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুগার প্রেসারও বেড়ে যায়।
স্ত্রী গীতা দেবী ছেলেকে ফোন করলেন বাবা অসুস্থ বলে। খবর পেয়ে ছেলে বৌ'কে নিয়ে বাড়ীতে আসলো। একটু ঔষধ পত্রের ব্যবস্থা করে দিয়ে পরদিন আবার চলে গেল। দু তিন দিন পর মা আবার ফোন করলেন, ' বাবা, তোর বাবার অসুখ বেড়ে গেছে।'
ছেলে জবাব দিল,' ঔষধ গুলো চালিয়ে যাও, আমার খুব ব্যস্ততা চলছে, আসার সময় নেই।' বলেই ফোনটা কেটে দিলো।
রথীন বাবু পাশে থেকে ফোনের কথা গুলো বুঝতে পারলেন।
বললেন, হাঁ,তাতো বটে, ও আসতে পারবে না।'
বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাঁর অতীত ইতিহাস মনে পড়লো। এই ছেলেকে মানুষ করার জন্য তিনি গ্রামে মা- বাবাকে ফেলে শহরে এসেছিলেন। তখন সংসারে তিন বোন ও দু' ভাইয়ের মধ্যে তিনিই বড়। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। মা- বাবা আর ভাই-বোনদের ছেড়ে এক প্রকার সাগরে ভাসিয়ে শহরে এসেছিলেন ছেলে মেয়েদের পড়াবেন বলে, এদের মানুষ করবেন বলে। সেদিন মায়ের সে কী কান্না! তবু মা আশীর্বাদ দিয়ে বলেছিলেন,' যা বাবা, নিজের সন্তানদের মানুষ কর।'
তাঁর মনে পড়লো, তিন মেয়ের পর একমাত্র ছেলের জন্মের পর পুরো পরিবার জুড়ে সে কী আনন্দ! ছেলের অন্নপ্রাশনের দিন মা অতিথি ও আত্মীয় স্বজনদের নাতিকে দেখিয়ে বলেছিলেন,' দেখবেন, আমার এই নাতি একদিন ডাক্তার হবে। আমাদের দুঃখ দুর্দশা দূর হবে, বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে।'
মনে পড়লো তার, সেদিনের সে অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব কেউই নিমন্ত্রণে বাদ পড়েননি। সেদিনের সে অনুষ্ঠানে হাজার পঞ্চাশেক টাকা খরচ হয়েছিল। অথচ বড় মেয়ে রীমার বিয়ে দিয়েছেন, কোন আয়োজনই করতে পারেন নি। এ নিয়ে লোক মুখে কত কথা শুনতে হয়েছে। বিয়েতে কিছু দিতেও পারেননি। এজন্য মেয়েকে কত খোঁটা সহ্য করতে হয়েছে। বেয়াই মশাই তো একদিন বলেই ফেললেন,' এমন জায়গায় ছেলের বিয়ে দিয়েছি, একদিন ঠিক মতো খাওয়াতেও পারে নি।' এত সব ভাবতে ভাবতে রথীন বাবুর শরীরটা দিন দিন আরও খারাপ হতে লাগল।
তাঁর মনে পড়লো সীমা আর জয়ার এইচ এস এর রেজাল্ট এর পর তাদের স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত এসে তাদের ভর্তির ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন,' মেয়ে দুটি পড়াশোনাতে এত ভালো, এদের কেন পড়াবেন না?' তাঁর সোজা কথা ছিল ছেলেকে মানুষ করবেন। মেয়েদের তো জন্মই হয় পরের ঘরে যাবার জন্য। তাছাড়া এদের পড়ার খরচ চালানোর মতো জো তার নেই।
ছেলেকে তো ডাক্তার বানিয়েছেন। কিন্তু আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন, এই মেয়ে দুটোই তার সম্বল। দিনরাত ওরা তাঁর পাশে বসেই সেবা করে যাচ্ছে। তাদের কোন আব্দার নেই, কোন অভিমান নেই। তারা নিজে না খেয়েও বাবার পরিচর্চা ঠিকই করে যাচ্ছে। বাবা যেদিন তাদের পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন সেদিনও তারা নীরবে কান্না কাটি করেছে, কোন অভিযোগ করেনি।
বড় মেয়ে রীতা বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে বাসায় এসেছে। সব কিছু দেখে শুনে মাকে বললো, ' মা, মুন্না আসেনি?' মুন্না মানে ওর ছোট ভাই ড: রূপ কুমার মান্না। বাবা বড় আদর করে এ নামটা রেখেছিলেন। সে মুন্না বলেই ডাকে।
মা বললেন,' ফোন করেছিলাম, ও ঔষধ এনে দিয়ে চলে গেছে। পরদিন আবার ফোন করাতে ওর সময় নেই বলে জানিয়েছে।
রীতা বলল, ' আমি একবার ফোন করে দেখি।' সে ফোন করল, ওপাশ থেকে মেয়েলী কণ্ঠ শোনা গেল,' উনি এখন রোগী দেখছেন।' বলেই লাইন কেটে দিল। রীতা বুঝতে পারল মুন্নার বৌ ফোন ধরেছে। সে আবার ফোন করল কিন্তু কেউ ফোন উঠালো না।
ঐদিন রাতে রীমা আবার মায়ের মোবাইল থেকে ফোন করলো এবার মুন্না ফোন রিসিভ করল। রীতা বলল,' মুন্না, বাবার শরীরটা কেমন যেন করছে, তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।'
মুন্না উত্তর দিল, ' আমার কাল একটা জরুরী মিটিং আছে, আসতে পারবো না। তোরা ঔষধটা খাইয়ে যা, আর বেশি অসুবিধা হলে হসপিটালে এ্যাডমিশন দিয়ে দিবি।' বলেই ফোনটা রেখে দিল।
বাবার অবস্থা বেগতিক দেখে রীতা মাকে বলল, ' মা বাবাকে এবার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এই আমার চেইনটা বিক্রি করে দাও।' কথা কটি শেষ হতেই সীমা বললো,' এই আমার কাছে হাজার দুই টাকা আছে, আমি টিউশন করে পেয়েছিলাম। চলো,আর দেরি নয়, এক্ষুনি বাবাকে নিয়ে হসপিটাল চলো।'
সকলে মিলে বাবাকে হসপিটাল নিয়ে গেলেন। সেখানে দুদিন মত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েও শেষ রক্ষা আর হলো না।
শেষ নিঃশ্বাসের পূর্ব মুহূর্তে রীতাকে পাশে ডেকে বিড়বিড় করে বললেন,' মাগো, আমি জীবনে বড় ভুল করেছি, তোরা আমাকে মাফ করে দিস। আর রীমা, যদি পারিস তবে তোর মেয়েটাকে একটু গুরুত্ব দিস, ওকে পড়িয়ে মানুষ করার চেষ্টা করিস।
মা মুন্নাকে খবরটা জানাতে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে বৌমা ফোন ধরেই বলল,' উনি এখন একটা পার্টিতে ব্যস্ত আছেন, একটু পরে ফোন করবেন।' মা'র ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বললেন,' হাঁ, তাতো ঠিকই আছে। যিনি নিজের সর্বস্ব হারিয়ে ছেলেকে মানুষ করেছেন আর আজ নাখেয়ে বিনা চিকিৎসায় মরতে হলো।' বৌমা চট করে বলে উঠলো,' কেন মা, উনি তো টাকা ওষুধ পত্তর দিয়ে এসেছেন, এতে আমাদের দোষ কি?'
মা উত্তর দিলেন,' দোষ তোমাদের নয়, দোষটা আমাদেরই। আমরাই নিজেদের মা-বাবাকে গ্রামে অসহায় অবস্থায় ফেলে এসেছিলাম, সন্তানকে মানুষ করার জন্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন