শারদা পর্ব -০২( ছোট গল্প)

শারদা 
(ছোট গল্প) পূর্ব প্রকাশিতের পর

ইতিমধ্যে নবেন্দু বাবুর তৃতীয় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। শহরের এক নামিদামি ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে। বাড়িতে এখন শুধু শারদা আর তার মা-বাবা। 
একদিন সন্ধ্যাবেলা মা লক্ষ্য করলেন ঘরে টিভিতে একটি মেয়ে নৃত্য করছে আর শারদা তা দেখে দেখে নাচার চেষ্টা করছে। তিনি আরো অবাক হয়ে দেখলেন সে হুবহু গানের তালে তালে নেচে যাচ্ছে। কথাটা একদিন প্রসঙ্গ ক্রমে তিনি তার স্কুল শিক্ষক রতনবাবুকে বললেন। রতনবাবু বললেন তিনি ব্যাপারটা দেখবেন। পরে স্কুলে একজন নাচের শিক্ষক এনে ওকে নাচ শিখিয়েছেন এবং স্কুলের কালচারেল প্রোগ্রামে সে চমৎকার নেচেছে এবং পুরস্কারও পেয়েছে।
তার নাচ দেখে ঐ ম্যাডাম বলতে বাধ্য হয়েছেন যে,' ঈশ্বর হয়তো তাকে কুৎসিত এবং বিশেষ ভাবে সক্ষম করে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কিন্তু তার মধ্যেও অনেক গুণাগুণ দিয়েছেন,যেটা হয়তো অনেক সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের মধ্যেও নেই।' 
শারদা অত্যন্ত খুশি তার এই সফলতায়। শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি সে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে রতন স্যারের কথা তার আজীবন মনে থাকবে। 
####
দিন গড়িয়ে যায়। ইতিমধ্যে সে কিছুটা হলেও লেখা পড়া শিখেছে। স্কুল কিন্তু সে কখনো বন্ধ করেনি। এবারের বার্ষিক পরীক্ষায় সে নবম শ্রেণীতে প্রমোশনও পেয়েছে। 
       একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সে ওয়াশরুমে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার কানে একটা কথা পৌঁছতেই থমকে দাঁড়ালো। বাবা বলছেন,' পঞ্চাশ হাজার টাকা পণ দিতে হবে।'  কথাটা শোনামাত্র সে নীরবে আরও একটু এগিয়ে গেল। দেখলো মা- বাবার মধ্যে কথোপকথন চলছে। 
মা বললেন, 'এতো টাকা কোথা থেকে দেবেন?'
বাবা,' টাকা নাহয় ব্যবস্থা করলাম, কিন্তু সমস্যা হল, ওর আগের স্ত্রীর দুটো বাচ্চা আছে।'
মা বললেন,' আগের স্ত্রীর কি হয়েছে?'
- ওর স্ট্রোক হয়ে মারা গেছে, আজ তিন বছর হলো।'
মা- ,'ওর বয়স কত হবে?'
- এই ধর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে।'
মা-'একদিকে বয়স বেশি, তার উপর পঞ্চাশ হাজার টাকা, তাও আবার আগের তরফে বাচ্চা দুটো -- আমার মনে হয় এখানে বিয়ে না দেওয়াই ভালো।'
বাবা,--'কিন্ত মেয়ের কথাও তো ভাবতে হবে। কী দেখে একজন ওকে বিয়ে করবে? ওর বয়স তো চৌদ্দ পনের বছর হয়ে গেছে এখনো একেবারে সাদা সিধে। কানেও কম শোনে, তোতলায়, তাছাড়া কালো এবং অসুন্দর।
মা বললেন,' বয়স তো এখনো তেমন বেশি হয়নি, আমরা আরো একটু ওয়েট করতে পারিনা?'
--- 'না। বেয়াই বলেছেন, জায়গা ভালো, ওদের অনেক ব্যবসা সম্পত্তি আছে।
মা- ' কিন্তু মেয়ে কি মানবে?'
বাবা,-' ও আর কি বুঝবে? আর ভালো জায়গাই বা পাব কোথায়?'
     ---- এতটুকুই শুনে শারদা আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না। চোখের জল মুছতে মুছতে ঘরে চলে গেল। সেদিন রাতে তার আর ঘুম হয়নি। মা-বাবার প্রতিটি কথা বার বার তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। সারা রাত তার চোখের জলে বালিশ ভিজলো। সে বুঝতে পারলো সে অবলা, তার করার কিছুই নেই।
পরদিন নবেন্দু বাবু বেয়াইকে জানিয়ে দিলেন তিনি বিয়েতে রাজি আছেন। এরপর দুপক্ষে কথা হল, তারিখ ঠিক হল ডিসেম্বরের ষোলো।
    স্কুল শিক্ষক রতন বাবু যখন শুনলেন , তিনি নিজে বাড়িতে এসে বাবাকে অনেক করে বুঝালেন,' মেয়ের বয়স কম। কেন এতো তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিচ্ছেন। বাবা বললেন,' ভালো জায়গা পেয়েছি। এমন পাত্র হাতছাড়া করা যায় না। তাছাড়া, আপনারা তো জানেন এমন সাদা সিধে মেয়েকে কে বিয়ে করবে?' 
####
যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে বিয়ের পর্ব আরম্ভ হবে, সবাই উপস্থিত। বরের বড়ভাই কানে কানে নবেন্দু বাবুকে বলল 'পণের টাকাটা ---'
নবেন্দু বাবু সঙ্গে সঙ্গে টাকার একটা বাণ্ডিল বের করে দিলেন। উনি টাকা গুলো গুনে বললেন,' এখানে তো চল্লিশ হাজার কিন্তু কথা ছিল পঞ্চাশ হাজারের।'
নবেন্দু বাবু বললেন,' অনেক কষ্টে সৃষ্টে দুধের গাইটি পর্যন্ত বিক্রি করে এ টাকা ম্যানেজ করেছি। ঠিক আছে বাকি টাকা আমি মেয়েকে আনতে যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।'
কথা কটি শেষ হতে না হতেই পুরো বিয়ে বাড়ি জুড়ে একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। বরবেশী আধবুড়ো লোকটা মাথার টুপি খুলে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,' টাকা হাতে না পেলে এ মেয়েকে আমি বিয়ে করব না। ' 
নবেন্দু তখন সামনে যাকে পেল তাকে বলল,' দোহাই আপনাদের, আমি হাতে ধরে পায়ে ধরে বলছি, আমার মেয়ের এতবড় সর্বনাশ আপনারা করবেন না। আমি যেমন করে পারি মাসের ভেতর টাকা গুলো শোধ করে দেব।' 
ততক্ষণে কথা গুলো শারদার কানে গিয়ে পৌঁছল। সে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলে উঠলো," আমি বৃদ্ধকে বিয়ে করতে রাজি আছি কিন্তু এত লোভী এবং অসম্মানি কাপুরুষকে আমি বিয়ে করবো না।' 
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সমস্ত বিয়ে বাড়ি নিস্তব্ধ।
যে মেয়ে তোতলায়, কথা বলতে পারে না, আজ কেমন অগ্নিমূর্তি ধারণ করে শত মানুষের ভিড়ে স্পষ্ট ভাষায় কেমন কথা গুলো বলল। বাবা তখনো হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছেন। 
শারদা দৌড়ে গিয়ে বাবাকে ধরে বলল,' বাবা তোমার কোন ছেলে নেই, আজ থেকে আমি তোমার ছেলে। যেমন করে পারি আমি তোমার এবং মায়ের বাকীটা জীবন সেবা করে যাব। এই অমানুষ জানোয়ারদের এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দাও। তোমার সিধে আজ থেকে সিধে নয়, সাদা, না না সাদাও নয় শারদা হয়ে গেছে। আর সবাই মনে রেখো শারদার আরেক নাম দূর্গা। হাঁ, আমি সেই দশভুজা ধারী দূর্গা।' - একনাগাড়ে এতগুলো কথা যে সে বলতে পারলো, অন্য কেউ তো দূরের কথা তার নিজের মা-বাবা কল্পনাও করতে পারেন নি। 
         সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সর্বত্রই নীরব নিস্তব্ধ। হঠাৎ দেখা গেল দুজন পুলিশ এসে বর কে খুঁজছে। 
এমন সময় দেখা গেল হাততালি দিয়ে এগিয়ে আসছেন রতন স্যার, যিনি প্যাণ্ডেলের এক কোনায় বসে সমস্ত নাটক দেখছিলেন। তাঁর চোখ দিয়ে ঝরছে জীবনের সার্থকতার অশ্রুধারা।
(সমাপ্ত)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়