শারদা পর্ব -০১( ধারাবাহিক ছোট গল্প)

নবেন্দু শেখরের চার মেয়ে, সুশীলা, সুলেখা,সরিতা এবং শারদা। শারদা ছাড়া বাকি সব কটি মেয়েই দেখতে খুবই সুন্দর এবং পড়াশোনায়ও ভালো। শারদা ছোট, খুবই সাদাসিধে এবং দেখতেও অসুন্দর। পাঁচ বছর বয়সে ওর মুখে প্রথম কথা ফুটতে শোনা যায় তাও তোতলায়। ওর নাম জিজ্ঞেস করলে অনেক কষ্ট করে বলে সা-সা--সাদা। তাই সবাই ওকে সাদা বলেই ডাকে। সা- সা সাদা বলতে বলতে কেউ কেউ আবার সিধে বলেও ডাকতে শোনা যায়।
একটা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্ম অথচ ওর ব্রেনটা ডাল এবং এত কুরূপা। মা বাবা অনেক সময় ভাবেন বাকি মেয়েদের তুলনায় কেন সে এরকম হল। কখনো ভাবেন,ওর জন্মের দু মাস আগে ওর মা একবার পুকুর ঘাটে পড়ে গিয়েছিলেন। হয়তো একারণে সে এরকম। আবার কখনো ভাবেন তিন মাস বয়সের কালে একবার সে দোলনা থেকে পড়ে গিয়েছিল এ কারণে। এ নিয়ে অনেক বার তারা ডাক্তার দেখিয়েছেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
   যখনই সে কোন কিছু বলে অন্য ছেলেমেয়েরা তা অনুকরণ করে চিড়ায় । এ জন্য সে বেশি কথাও বলে না। 
   নবেন্দু বাবু বড় মেয়ে গুলোকে শহরে প্রাইভেট স্কুলে পড়িয়েছেন। দুজন ইতিমধ্যে বি,এ, পাশ করেছে এবং তাদের ভাল জায়গায় বিয়েও দিয়েছেন। তৃতীয় মেয়েটি এবার মেট্রিক পাশ করেছে। কিন্তু শারদার বয়স এখন সাত বছর অথচ কানেও কম শোনে আর ভালভাবে কথাও বলতে পারে না। তাই তাকে আর স্কুলে ভর্তি করা হয়নি। তাকে নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। একদিকে কথা বলতে পারে না তার উপর দেখতেও কালো, অসুন্দর এবং নাক চ্যাপ্টা।
          ইতিমধ্যে গ্রামের সরকারি স্কুলে একজন নতুন শিক্ষক এসেছেন এবং স্কুলের ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটু চাঙ্গা করার লক্ষ্যে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে শুনিয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনার ব্যবস্থা করেন। একদিন ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে শাদার কথা শুনে তিনি ঐদিন সন্ধ্যার পর তাদের বাড়িতে উপস্থিত হন। তিনি বাড়িতে গিয়ে শাদা শাদা বলে ডাক শুরু করেন। ডাক শুনে নবেন্দু বাবু ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন সঙ্গে দৌড়ে শারদাও ছুটে আসে। নতুন শিক্ষক রতন বাবু তাঁর আসার কারণ বললেন এবং মেয়েকে আদর করে পাশে ডাকলেন।
‌' মা শারদা এদিকে আস তো ' শারদা খুশি হয়ে দৌড়ে তার পাশে আসলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,' , তোমার নাম কি গো?'
   সে উত্তর দিল,' শা- শা -শাদা।' 
তারপর নতুন শিক্ষক রতন বাবু তাকে আদর করে হাতে চকলেট দিলেন এবং স্কুলে যাওয়ার কথা বললেন। 
বাবা বললেন,' না সে কথা বলতে পারে না। একেবারে সাদা সিধে। তাছাড়া ওর বয়স একটু বেশি হয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ওর কথা গুলো রিপিট করে চিড়ায়।তাতে সে রাগ করে, কাজেই স্কুলে গেলে সমস্যা বাড়তে পারে।
নতুন শিক্ষক তাকে অনেক করে বোঝালেন এবং শারদাকে বললেন,' তোমাকে নতুন বই দেবো, নতুন জামা দেব চকলেট দেব ইত্যাদি ইত্যাদি।' এভাবে লোভ দেখানোতে তার শিশু মন খুশি হল এবং সে স্কুল যেতে রাজি হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হল কাল রতনবাবু নিজে এসে তাকে নিয়ে যাবেন।
#####
         পরদিন যথারীতি রতনবাবু নতুন একটা ছবি সম্বলিত বই এবং স্কুলড্রেস নিয়ে নিজে এসে তাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। নতুন পোশাক পেয়ে সে কী খুশি। আজ পর্যন্ত তাকে একটি নতুন কাপড় কিনে দেওয়া হয়নি। এতদিন বড় বোনদের ছোট হওয়া কাপড় গুলোই ছিল তার পরিধেয় বস্ত্র। 
   স্কুলে তাকে দেখেই সাদা সাদা,সিধে বলে অনেক ছেলেমেয়ে এগিয়ে আসে। শিক্ষক তাদের ধমক দিয়ে বললেন,' এ তোমাদের নতুন বন্ধু, এখন থেকে ও রোজ স্কুলে আসবে, তোমরা একে আদর করবে আর শারদা বলেই ডাকবে।'
   শারদার তো প্রথম দিনই স্কুলে এসে খুব ভালো লাগলো। সে ঘুরে ঘুরে পুরো স্কুল ঘরটা দেখল। যতই দেখে ততই তার ভালো লাগে। স্কুলে বসার ডেস্কবেঞ্চ, তার পাড়ার কত ছেলেমেয়ে বসে আছে, ঘরের দেয়ালে সুন্দর সুন্দর সব ছবি। এসব দেখে সে খুব খুশি হল। 
    স্কুলের হেড স্যার এরই মধ্যে এসে জিজ্ঞেস করলেন,' তোমার নাম কি?'  সে ভয়ে ভয়ে বললো,' সা -সা -সাদা।'
বাবার নাম, গ্রামের নাম জিজ্ঞেস করলে সে কিছু বলতে পারলো না। ওর মুখ থেকে আর একটি কথাও বেরোল না, শুধুই তোতলায়। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও কোন কথা বলতে না পারায় হেড স্যার একটু রাগ করেই বললেন,' রতনবাবু , 'ওকে স্কুলে ভর্তি না করাই ভাল। একেবারে সাদা সিধে, তাছাড়া ওর বয়স অনেক বেশি। এখন ওকে কোন ক্লাসে বসাবেন? ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে ওকে বেমানান লাগবে। ওর দ্বারা কিচ্ছু হবে না।'
কথাটা রতনবাবুর ভালো লাগলো না। কেন জানি তার খুব দয়া হলো। তিনি বললেন,' না স্যার আমাকে একটু সুযোগ দিন। আমি দেখি ওর মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারি কি না।' 
 তিনি তাকে হাতে আরও একটি ছবিওয়ালা বই দিয়ে বসে বসে ছবি গুলো দেখতে বললেন। সারদাতো বই পেয়ে মহা খুশি। শিক্ষক তাকে ছবি দেখিয়ে বলেন,' এটা কি, ওটা কি?' 
বুঝা গেল মেয়েটা ছবি দেখে সব চেনে কিন্তু বলতে পারে না। তবু তিনি চেষ্টা চালিয়ে যান। এবার একটা গরুর ছবি দেখিয়ে বললেন,' এটা কি, তুমি তো চেনো। সে মাথা নাড়িয়ে বলে হে। আবার তিনি বললেন মুখে বলো, তুমি পারবে। সে তখন বলল,' গ-গ-গরু।' এবার বানরের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,' এটা কি? এবার সে একটু সাহস পেয়ে বললো,' বা-বা--বানর।' 
শিক্ষক ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলে সে বইটার পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকে। বুঝা গেল তার শিশু মনে ছবি গুলো জায়গা করে নিয়েছে। সে বসে বসে তন্ময় হয়ে ছবি গুলো দেখছে আর মাঝে মধ্যে এগুলো আঁকার চেষ্টা করছে। 
এর ফাঁকে টিফিন হয়েছে। সব ছাত্র-ছাত্রী বেরিয়ে গেছে সারদা তা বুঝতেই পারেনি। তাকে বাইরে না দেখে রতনবাবু ক্লাসে এসে দেখেন সে বসে বসে কাঁদছে। তিনি দূর থেকে সাদা বলে ডাক দিলেন। সে ফিরে তাকালো। স্যারের সে ডাক যেন তার হৃদয় স্পর্শ করলো। মনে হলো এত আদর করে কেউ কখনো তাকে ডাকেনি। স্যার তার হাতে একটা চকলেট দিলেন এবং একজন সহপাঠীর সামনে তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল,'সা-সা-সাদা। তিনি দু তিনবার রিপিট করলেন। একসময় সে পরিষ্কার বলতে পারলো শারদা। 
নিজের নামটা পরিষ্কার বলতে পেরে সে আনন্দে অধীর হয়ে উঠলো। শিক্ষক আরও বেশি আনন্দিত হলেন। তিনি যেন এভারেস্ট জয় করেছেন। তিনি বললেন,' তুমি একটু চেষ্টা করলে সব কথাই পরিষ্কার বলতে পারবে। অন্যরা যেভাবে কথা বলে, পড়াশোনা করে তুমিও সেরকম পারবে। তুমি কাল থেকে রোজ সময় মতো স্কুলে এসো। সে মাথা নাড়ল। খুশিতে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। স্কুল ছুটি হলে মা এসে তাকে নিয়ে গেলেন।
বাড়িতে গিয়ে সবার কাছে তার আনন্দ প্রকাশ করল। মা অত্যন্ত খুশি। মা অনেকক্ষণ তার সাথে কথা বললেন। সে রাতে বসে বসে বই গুলো পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে দেখলো আর মাঝে মাঝে ছবি আঁকার চেষ্টা করল। মায়ের হৃদয় আশায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে চোখের জল ফেললেন। ওর মাঝে মা যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। ওর বাবাকে ডেকে বললেন,' ওগো, আমরা এতদিন কি ভুলই না করলাম। এই দেখছো ,' আমার আদরের শাদা এবার শারদা হয়ে গেছে।
#######
পরদিন যথারীতি মা আবার তাকে স্কুলে পৌঁছে দিলেন। 
দিন গড়িয়ে। শাদা এখন আর সাদাও নয়, সিধেও নয়, এখন সে শারদা হয়ে গেছে। কেউ তার নাম জিজ্ঞেস করলে পরিষ্কার বলতে পারে। 
শারদার জীবনের এই আমূল পরিবর্তন দেখে সবাই তো অবাক। বিশেষ করে রতন স্যার তো তাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কয়েক দিনের কঠোর পরিশ্রমে তিনি তাকে অক্ষর  জ্ঞান ও ছবি আঁকা শিখিয়ে তুললেন। এই কয়দিন পাশে থেকে তিনি বুঝতে পারলেন পড়াশোনা যদিও বেশি করতে না পারে মুটামুটি সে ছবি আঁকায় পারদর্শী হয়ে উঠলো। 
      ইতিমধ্যে একদিন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে জেলা পর্যায়ে অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। খবর পেয়ে রতন স্যার নিজ খরচায় তাকে নিয়ে অঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করান। একপ্রকার সকলকে আশ্চর্য করে দিয়ে সে জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করে এবং সার্টিফিকেট ও সোনার ক্রেস্ট লাভ করে। তার এই কৃতিত্বের জন্য সবাই রতন স্যারকে অশেষ ধন্যবাদ জানাল। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়