মাতৃভাষার জন্য
বর্ষিয়ান সাহিত্যিক রণধীর বাবু তাঁর নাতনিকে নিয়ে যখন তখন যেখানে সেখানে সভা সমিতিতে গিয়ে হাজির হন। বরাক উপত্যকার বাঙালি কোন সভাসমিতি বা সাহিত্য আড্ডায় রণধীর বাবু থাকবেন না এমন কোন কথা হতে পারে না। বয়স ৯৬ এর উপর। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা এখনো তাঁর মনে আছে। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী রণবীর বাবু। নিজ চোখে অতি পাশে থেকে তিনি ভাষা শহীদদের দেখেছেন যা কখনো ভুলতে পারেন না।
আগামী কাল ঊনিশে মে। ভাষা শহীদদের স্মরণে এক বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছে। রণধীর বাবু প্রধান অতিথি হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখবেন। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি নাতনি তানিয়াকে সকাল সকাল প্রস্তুত থাকতে বললেন। তানিয়াই এই বুড়ো বয়সে তাঁর অন্ধের যষ্ঠি। যেখানেই যান তানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে যান। সেও অনেক বড় হয়েছে। এবার পঞ্চম শ্রেণীতে প্রমোশন পেয়েছে। প্রতি বছরই সে দাদুর সাথে ভাষা শহীদদের বেদিতে ফুল চড়াতে ও মোমবাতি জ্বালাতে যায়।
আজ দাদু যখন তাকে প্রস্তুত হতে বললেন তখন হঠাৎ তার মনে একটা ভাবনার উদয় হলো। সে উৎসুক হয়ে দাদুকে জিজ্ঞেস করল ,' দাদু, মাতৃভাষা শহীদ দিবস বছরে ক' বার পালন করা হয়? এইতো সেদিনই আমরা দুজন বেদিতে ফুল চড়ালাম, মোমবাতি জ্বালালাম'। রণধীর বাবু তখন নাতনিকে বললেন,' হাঁ, বছরে দু'বার আমরা ভাষা শহীদদের স্মরণ করি। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আর ঊনিশে মে ভাষা শহীদ দিবস। '
তানিয়া অবাক হয়ে দাদুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে। সে আবার জিজ্ঞেস করে,' দাদু, একটু বুঝিয়ে বলো না।'
রণধীর বাবু বললেন, ' ঊনিশে মে বরাক উপত্যকার এগারো জন বাঙালি মাতৃভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন এজন্য তাদের স্মরণে আমরা এই দিবসটি পালন করি।'
তানিয়া আবার জিজ্ঞেস করে,' আর একুশে ফেব্রুয়ারি?'
রণধীর বাবু বললেন, সে এক ইতিহাস, তাহলে শোন।' তিনি বলতে আরম্ভ করলেন -
' আমাদের মূল বাসস্থান বাংলাদেশের ঢাকায়। তখন অবিভক্ত ভারত, আমি তখন সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন নিয়েছি। ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে স্বাধীনতা লাভের পরই দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। আর তখনই মানুষের মধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হয়, এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলা আর ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলা। আমার বড় কাকা আর মেজো কাকা এ সময় সপরিবারে ভারতের বরাক উপত্যকায়, এখন আমরা যেখানে আছি, সেখানে চলে আসেন। আমার বাবা আসতে চাননি বলেই আমরা সেখানে থেকে গেলাম। এর অল্প দিন পরেই ভাষার সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাপ্রেমী রাষ্ট্র নায়করা পূর্ব বঙ্গের উপর উর্দু ভাষা কে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে চাপিয়ে দিতে চায়। স্বৈরাচারী শাসকের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সমস্ত বাঙালিরা সোচ্চার হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এই উপলক্ষে ১৯৪৮ সালে গঠিত হয় ' রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ'। তারা দাবি করেন, ভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানের ( বর্তমান বাংলাদেশের) ভাষা হবে বাংলা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি বরং ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। ফলে বাঙালিদের আক্রোশ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। আর তার ই ফলস্বরূপ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেদিন আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্মম ভাবে পুলিশ গুলি চালনা করে। নিজের চোখের সামনে ই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রফিক, সালাম,বরকত শফিউল্লাহ সহ আরো অনেকে। ঢাকার পিচ চাপা রাজপথ সেদিন রক্তাক্ত হয় তরুণদের তাজা রক্তে।
বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির এই প্রাণ দান গোটা বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে তুলে। রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারির এই অদম্য অনুপ্রেরণা সমস্ত বাঙালির রক্তে সঞ্চারিত হয়। ক্ষোভে দুঃখে পরদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেখানে শহীদ মিনার স্থাপন করে। যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। সেখানে আজও সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায়। অবশ্য পরবর্তীতে সেটা আরো উঁচু করে নির্মাণ করা হয়। শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালেই অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। আর এই বাংলা ভাষার উপর ভিত্তি করেই জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। বাংলা ভাষার জন্য এই আত্মবলিদানের বিরল দৃষ্টান্তের কথা চিন্তা করে পরবর্তীতে ১৯৯৯খৃষ্টাব্দের ১৭ ই নভেম্বর ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০সনের ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। '
তানিয়া আবার জিজ্ঞেস করে, ' দাদু আপনারা তাহলে কখন এদেশে আসেন?'
দাদু আবার বলতে শুরু করলেন,' ভাষা আন্দোলনের আনুমানিক পাঁচ ছয় বছর পর কাকু দের পিড়াপিঁড়িতে বাবাও আমাদেরকে নিয়ে এখানে আসতে বাধ্য হন। সেই থেকে এখানেই আমাদের বসবাস।
আমাদের বরাক উপত্যকার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ বাঙালি। কিন্তু আমাদের আসাম রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ অসমীয়া ভাষাভাষী হওয়ায় তারাই এ রাজ্যের সরকার গঠন করে আর সরকারি ভাষা অসমীয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যদিও বরাক উপত্যকার প্রায় সব মানুষই বাঙালি তথাপি আসাম সরকার বরাক উপত্যকা বাসির উপর অসমিয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। ১৯৬০ সালে সরকার আইন প্রণয়ন করে বাঙালিদের উপর অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে চায়। আর তখনই এখানে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়।'
১৯৬১ সালের ৫ ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মাতৃভাষা রক্ষার্থে কাছাড়ে গণ সংগ্রাম পরিষদ' সংস্থাটির জন্ম হয়। এই সংস্থার অধীনে বরাক উপত্যকার হাজার হাজার বাঙালি আসাম সরকারের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেন। অতঃপর ১৯ শে মে তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি তথা সমগ্র বরাক উপত্যকায় হরতাল ও পিকেটিং সাব্যস্ত করা হয়। ঐদিন শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের সামনে সত্যাগ্রহীদের দমন করতে আসাম রাইফেল ও প্যারামিলিটারি বাহিনী প্রথমে লাঠি চার্জ করে এবং এর অব্যবহিত পরে গুলি চালায়। সেদিনের সেই আন্দোলনের সময় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। এই ঘটনাও আমার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছিল। সেদিনের গুলি চালনায় বহু লোক হতাহত হয় এবং নয়জন সত্যাগ্রহী ঐ দিনই মারা যায়; পরদিন আরও দুজন শহীদ হন। এই মোট এগারো জন শহীদ হয়েছিলেন বলে এই ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে বলা হয় ' একাদশ শহীদ স্মরণ।' তানিয়া ঢোক গিলে বললো,' যারা শহীদ হয়েছিলেন এরা কারা, আপনি কি তাদের চিনেন?'
রণধীর বাবু এক নাগাড়ে শহীদদের নাম বলে গেলেন। এরা হলেন,' কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডী চরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদ রঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরুণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য।'
একাদশ শহীদদের নাম বলা শেষ হলে রণধীর বাবু আক্ষেপের সুরে বলেন,' এতোটা তাজা প্রাণের বিনিময়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আজকাল আধুনিকতার নামে এই মাতৃভাষাকে অবমাননা করা হয়। বাঙালি হয়েও বাঙালিরা নিজেদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করতে উৎসাহিত করে। এমনকি নিজের ঘরে ছেলেমেয়েদের সাথে বাংলায় কথা বলতে যেন লজ্জাবোধ করে। যেন ইংরেজিতে এক্সপার্ট হতে হবে। যেন ইংরেজিতে কথা না বললে নিজেকে খাঁটো মনে করে। তাই অফিস আদালত, সভা সমিতিতে ইংরাজিতে বুলি আওড়ায়। তুমি দেখবে, এমনিতে কোন অনুষ্ঠান বা সভাসমিতিতে থাকে মানুষের উপচে পড়া ভিড় কিন্তু কোন সাহিত্য আসরে হাতে গোনা কয়েকজন বয়স্ক মানুষ উপস্থিত থাকে।'
' হাঁ, তা তো ঠিক। গত ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ বেদীতে যাওয়ার আগে আমি আমার ক্লাসের কয়েকজনকে বলেছিলাম কিন্তু তারা কেউ যেতে ঢায়নি। এই মাত্র আট দশজন মানুষই তো সেখানে ছিল।'
কথাটা অপ্রিয় সত্য। তানিয়ার কথায় রণধীর বাবুর আরো দুঃখ হলো। তিনি বললেন,' মাতৃভাষার পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় শিক্ষার গুণগত মানও নিম্নমুখী হচ্ছে। মাতৃভাষাকে অবহেলা করে কোন জাতিই উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে পারে না। আর আজকাল তো আরও বড় সমস্যা হলো, কেউ তো গল্প উপন্যাস পড়তেই চায় না। ভালো মন্দ জ্ঞান আসবে কোথা থেকে?
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, এতো রক্তক্ষরণের পরও অধিকাংশ জায়গায় মাতৃভাষা আজো উপেক্ষিত। বিশেষ করে আমাদের বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষার গুরুত্ব একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। তাই ঊনিশে মে ভাষা শহীদ দিবসেই সেই উপেক্ষা কাটিয়ে উঠতে হবে। এদিন মাতৃভাষার হৃত গৌরব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফের শপথ নিতে হবে যাতে শিক্ষাঙ্গনে মাতৃভাষা বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পায়। প্রত্যেক বাঙালিকে গুরুত্ব দিতে হবে অফিস আদালতে, সরকারি কাজকর্মে। নিজ মাতৃভাষার জন্য প্রত্যেক বাঙালির উচিত অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় এ ভাষাকে রক্ষা করা।'
দাদুর কথাগুলো শুনে তানিয়ার খুব ভালো লাগলো। সে বুঝতে পারলো, তার দাদু একজন খাঁটি বাঙালি। বরাকের বাঙালি হয়ে নিজেকে গর্বিত মনে হলো। সে দাদুকে বলল,' দাদু, আজ আপনি আমার ধারণা টা পাল্টে দিলেন। আরো দশজন ছেলেমেয়েদের মতো আমিও মনে করতাম, ইংরাজি জানাটা একটা ফ্যাশন, একটা ভালো শিক্ষিত হওয়ার পরিচয়। কিন্তু আজ আপনার কথায় নিজ মাতৃভাষার জন্য আমার গর্বে হৃদয় ভরে গেল।'
তানিয়ার কথায় দাদুও খুশি হয়ে বললেন,' ঠিক আছে, আজ ঘুমুতে যাও, কাল আবার একটু সকাল সকাল বেরোতে হবে।'
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন