ভুল না শুদ্ধ (ছোট গল্প)



সীমান্তে তখনও খুব উত্তেজনা চলছে। দেশী সেনার সাথে বিদেশি সেনাদের গুলিবর্ষণে উভয় পক্ষের কম করেও দশ জন লোক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অনেক। গুলিবিদ্ধ হয়ে কে কোনদিকে পালিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। রাত দশটায় সমস্ত অঞ্চল জুড়ে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। 
  খুব ভোরে উঠে ডাক্তার সুমন রোজকার মত প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন এমন সময় রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে একটা লোকের কাতরানোর শব্দ শুনে একটু এগিয়ে যেতেই বিদেশি সেনার পোশাকে একটা লোক দেখতে পান। লোকটার কোমর ও পা বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। দেখে বুঝা যায় গুলি বিদ্ধ। লোকটা হেল্প হেল্প বলে কাতরাচ্ছে। ডাক্তার সুমন প্রথমে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু লোকটা আবার জল, একটু জল বলে কাতরাচ্ছে শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন। প্রথমে একটু ইতস্তত করলেন কিন্তু পরমুহূর্তে মানবিকতার কারণে এগিয়ে গেলেন এবং পাশের নালা থেকে এনে জলপান করালেন। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ে জড়িয়ে ধরে,' বাচান, আমাকে বাঁচান বলে কাতরাতে লাগলো।'  ডাক্তার সুমন এবার উভয়সঙ্কটে পড়ে গেলেন। একদিকে দেশের শত্রু অন্য দিকে একজন মুমুর্ষ রোগী। একদিকে তিনি একজন দেশ ভক্ত নাগরিক আর অন্য দিকে তিনি একজন ডাক্তার। 
মুহূর্তের মধ্যে তিনি নানা ভাবনার মধ্যে পড়ে গেলেন। দেশের নাগরিক হিসেবে তার উচিত লোকটাকে দেশীয় সেনার হাতে তুলে দেওয়া। আবার ডাক্তার হিসেবে তার প্রথম কর্তব্য লোকটাকে বাঁচানো।  তিনি তার প্রথম কর্তব্যকে গুরুত্ব দিলেন এবং স্থির করলেন লোকটাকে আগে বাঁচাতে হবে তাই  তিনি কোন রকমে লোকটাকে তুলে বাসায় নিয়ে গেলেন। 
সেখানে নিজের স্ত্রী ও কাজের লোকের সহায়তায় ওর শরীর থেকে গুলি বের করে ব্যাণ্ডেজ করে দিলেন এবং ওষুধ পত্তর দিয়ে সুস্থ করে তুললেন। গুলি বের করতে গিয়ে লোকটার পরিহিত পোশাক কেটে ফেলতে হয়েছে। তখন তিনি তাঁর নিজের পোশাক লোকটাকে পরিয়ে দিয়েছেন। 
সুস্থ হয়ে পুরো জ্ঞান ফেরার পর সেনাটি মৃদু হেসে ডাক্তার সুমন ও তাঁর স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল। তাঁরা তাকে জানালেন যে তার পা ও কোমর থেকে দুটি গুলি বের করা হয়েছে, তার অপারেশন সফল হয়েছে এবং এখন সে বিপদ মুক্ত। তবে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে। 
সেনাটি ডাক্তার সুমন ও তাঁর স্ত্রীর পায়ে জড়িয়ে ধরে বলল,' দোহাই আপনাদের, যে মহত্ত্বতায় আপনারা আমাকে বাঁচিয়েছেন সে মহত্ত্বতায় আমাকে আবারো বাঁচান। এ কাজটি করবেন না।'
চার পাঁচ দিনের মধ্যে লোকটা সুস্থ হয়ে উঠলে ডাক্তার আবার চিন্তায় পড়ে গেলেন। এখন উপায় কি? একে এভাবে ছেড়ে দেওয়া তো ঠিক হবে না। কারণ সে দেশের শত্রু। তিনি কি ভুল করলেন এর শুশ্রূষা করে? এখন এর কি ব্যবস্থা করা যায়? অনেক চিন্তা ভাবনার পর স্থির করলেন তাকে দেশীয় সেনার হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু সে মুহূর্তে আরও নানা ধরনের দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করে ফেললো। একে সেনার হাতে তুলে দিলে হয়তো তাঁকে নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তিনি কেন একে বাড়িতে আশ্রয় দিলেন, কেনই বা সুস্থ করে তুললেন? কেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে একে সেনার হাতে তুলে দেননি? একজন শত্রুকে আশ্রয় দেওয়া মানেই তো দেশদ্রোহী। তাছাড়া ওর সঙ্গে কি কোন আগ্নেয়াশ্ত্র ছিল, থাকলে ওগুলো তিনি কি করেছেন। ডাক্তার সুমন তন্ময় হয়ে এসকল কথা ভাবছিলেন। এরই ফাঁকে লোকটা কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেল। 
স্ত্রীর ডাকে তিনি সম্বিৎ ফিরে পেলেন। চারিদিকে খুঁজা খুঁজি করে সেনাটাকে পাওয়া গেল না। সেদিন রাতে তাদের ঘুম হয়নি। কোন মুহুর্তে সেনাটি ধরা পড়বে আর দেশদ্রোহীতার অপরাধে দেশীয় সেনাবাহিনী তাদেরকে ধরে নিয়ে যাবে, এই ভয়ে। 
দীর্ঘ একমাস এভাবে চিন্তা ভাবনা ও উত্তেজনায় কাটার পর হঠাৎ একদিন তিনি একটি চিঠি পান। চিঠিতে লেখা ছিল,
পরম পূজনীয়,
' ডাক্তার ভগবানের আরেক রূপ। আপনারা যেভাবে সেবা শুশ্রূষা করে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছেন তা আমি জীবনেও ভুলতে পারবো না। আপনারা আবারো প্রমাণ করে দিলেন যে ডাক্তারের কোন জাতি ধর্ম নেই, শত্রু মিত্র বলে কোন প্রভেদ নেই। আমি জানি আপনারা অনেক টেনশনে আছেন। হয়তো ভয়ে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। হয়তো ভয়ে আপনাদের ঘুম নিদ্রা হচ্ছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি পালিয়ে এসেছি, কারণ আমাকে বাঁচানোর দায়ে হয়তো আপনারা অপরাধী হয়ে যাবেন এজন্য। তবে চিঠিটা পাওয়ার পর জানবেন আমি ধরা পড়িনি তাই আপনাদের আর কোন ভয় নেই। আমি আপনাদের দেওয়া জীবন নিয়ে দেশে পৌঁছতে পেরেছি এবং সুস্থ আছি। ঈশ্বর আপনাদের দীর্ঘ জীবন দান করুন, এই প্রার্থনা করি। ইতি 
                 আমি সেই সেনা, যার জীবন দান আপনারা করেছেন।'
চিঠিটা পড়ে ডাক্তার সুমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তবে তার সেই দ্বিধা দ্বন্দ্ব আজও থেকেই গেল। কাজটা তিনি ভুল করলেন না শুদ্ধ করলেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়