শ্রমিক দিবস ( ছোট গল্প)



নিতাই আজ একটু সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে পড়ল। তার মালিক বিধু বাবু গতকাল বলে দিয়েছেন একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য। আজ নাকি কিছু অতিথি বাড়িতে আসবেন। অনেক কাজ আছে। তাই সে খুব তাড়াতাড়ি পথ চলছিল। শহরের কাছে যেতেই নিতাই থমকে দাঁড়াল। রাস্তার দুধারে লাইন ধরে মিছিল চলছে। মিছিলের আগে আগে মাইকে স্লোগান চলছে, তাই সে মিছিলের পেছনে পেছনে চলছে আর স্লোগান শুনে যাচ্ছে,
' শ্রমিক দিবস পালন কর,
পালন কর, পালন কর।।
শ্রমিক মালিক ভাই ভাই,
মোদের মাঝে বিভেদ নাই,
বিভেদ নাই বিভেদ নাই।।
শ্রমিকদের সম্মান দিতে হবে -
দিতে হবে দিতে হবে।।
শ্রমিক মজদুর ----------।।    
এতটুকু শুনেই নিতাই পাশ কেটে চলে যাবে এমন সময় দেখল সামনেই পাশে অনেক বড় করে পোস্টার টাঙানো, পাশে একটা স্টেজে অনেক গুলো চেয়ার রাখা আর সামনে মানুষ গুলো গিয়ে বসছে। নিতাইয়ের পড়াশোনা যদিও কম তবু সে পোস্টার গুলো পড়তে পারে। সে চেয়ে দেখল সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা," আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস" 
সে বুঝতে পারল আজ এখানে একটা অনুষ্ঠান হবে। একবার ভাবলো সেখানে গিয়ে বসবে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল , স্যার বলেছেন আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। সে চলে যাবে এমন সময় তার পরিচিত একটি ছেলে জোর করে তাকে বসিয়ে দিল বলল , ' আরে এটা তো শ্রমিকদের অনুষ্ঠান, একটু শুনেই যাও না। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হবে।' অগত্যা সে কিছুক্ষণ বসলো। অনেক নেতা মন্ত্রীকে ফুলের তোড়া ও গামছা দিয়ে বরণ করা হল। তাদের গ্রামের সভাপতিকেও  সেখানে ভাষণ দিতে দেখা গেল। দু-তিন জনের বক্তব্য শুনে নিতাই উঠে দাঁড়ালো। এবার সে জোর কদমে এগিয়ে চললো। তার মনে একটা আতঙ্ক এসে গেল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাবু অনেক বকুনি দেবে। দেরি হওয়ার জন্য হয়তো আজ পারিশ্রমিক পুরো পাবে না। আর তা যদি হয় তাহলে মায়ের ঔষধ নিতে পারবে না।
    বিধু বাবু বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাকে দেখামাত্র খুব রাগতস্বরেই বললেন,' কি রে হতচ্ছাড়া, আজ তোর এত দেরী কেন? সে আমতা আমতা করে বলল,' ' না স্যার, আমি ঠিক সময়েই এসেছিলাম। কিন্তু রাস্তায় এসে দেখি অনেক লোকের মিছিল তারপর মিটিং। ভীড় ঠেলে আসতে পারছিলাম না। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।' 
আচ্ছা বাবু, ' এরা যে চিৎকার করে করে স্লোগান দিচ্ছে- শ্রমিক দিবস পালন কর, শ্রমিকদের -----------। 
কতজন বলছে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজ করবে। 
কিন্তু কই, আজকেও তো সব শ্রমিক কাজে গিয়েছে, আমিও তো কাজে আসলাম। ছুটি পেলাম কই? কোথায় শ্রমিক দিবস? তাহলে কি শ্রমিক দিবস বাবুদের জন্য? তাদের আনন্দ ফুর্তি আর ফটো শট নেওয়ার জন্য? 
বিধু বাবু মুচকি হেসে বললেন,' আরে, ওসব কথার কথা। শোন কেন? কে বলল ৮ ঘণ্টা কাজ করার কথা? কে দেয় উপযুক্ত পারিশ্রমিক। সবাই তো গরীব আর শ্রমিকদেরকেই ঠকায়। ওখানে মিছিল মিটিং এ তুমি যাদের দেখেছ ওরা সত্যিই আসলে শ্রমিক নয়। এগুলো সব ভাঁওতাবাজি, সব অভিনয়। 
নিতাই বলল,' আপনি ঠিকই বলেছেন। ওখানে একজন মন্ত্রী, গ্রামের সভাপতি এবং আরও গন্যমান্য কয়েকজনের বক্তব্য শুনলাম। ওরা মুখে বলে একরকম আর দেখা যায় অন্য রকম। রাস্তা ঘাটে তো এখনো অনেক শিশু শ্রমিক দেখা যায়। সবাই বলছেন শিশুশ্রম প্রতিরোধ করার কথা। এটা নাকি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু স্যার এখনো তো চায়ের দোকানে, হোটেল রেস্টুরেন্টে হাটে ঘাটে অনেক শিশু শ্রমিক দেখা যায়। 
হে, ' তাইতো বলি এসব চিন্তা করে তোমার লাভ নেই। গরীব আর শ্রমিক যারা তারা এ পৃথিবীতে কষ্ট করার জন্যেই আসে। একদিন কাজ না করলে এদের উপোস করে থাকতে হয়। তখন কি কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায়? আর বৃদ্ধ বয়সে এরা কাজ করতে পারে না বলে ব্যারাম হলে ঔষধ পত্তর পায় না, এমনকি অনেকেই উপোস করে মরে। এদের জন্য কেউ চিন্তা করে না।'
নিতাইর কপালে দেখা গেল রেখার ভাঁজ। সে বলল,' সত্যিই তো, এগুলো লোক দেখানো ভাঁওতাবাজি। সত্যিই তো সবাই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা নিয়েই ব্যস্ত। আমাদের কথা কেউ ভাবে না।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়