নারীর আসল পরিচয়



লাবন্যেরা চায় বোন। লাবন্য ছাড়া বাকি সবার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে এবং ওরা ঘর সংসার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। বাবা মারা যাওয়ায় লাবন্যকে নিয়ে একটু সমস্যা। ছোট দু'ভাই যদিও বর্তমান কিন্তু ওরা কোনো কাজের না। এতদিন বাবা ছিলেন বলে ভবঘুরে জীবন কাটিয়েছে। এখন দায়িত্ব উপরে পড়ায় দুজনের মধ্যে একটু ঠেলাঠেলি। যার ফলে লাবন্যের জীবনে নেমে আসে অমাবস্যা। শেষ পর্যন্ত মা এবং একমাত্র মামার প্রচেষ্টায় কোন রকমে একটা কলেজের কেরানির সাথে বিয়ে ঠিক করেন। 
লাবন্য ছোট বেলা থেকেই খুব শৌখিন। যদিও মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম, সবার ছোট হিসাবে একটু বেশি আদর যত্ন পেয়েছে। কিন্তু ততটুকু সে পেয়েছে তাতে সে কোন দিনও সন্তুষ্ট নয়। তার আকাঙ্ক্ষা সবসময় গগনচুম্বী। কলেজে পড়াকালীন সময়েও সবসময় তার আব্দার ছিল বড়। যা পেত তাতে সে কোন দিনও সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাই সবসময় সে মনমরা হয়ে থাকতো। যে কোন বড়লোকের মেয়েরা যেভাবে শৌখিন জীবন যাপন করত তা ই সে অনুসরণ করার চেষ্টা করতো। আর তা করতে পারতো না বলেই সে নিজেকে বড় অসুখী মনে করত। তার মনে সবসময় একটা হায় হুতাস ছিল, কেন সে বড়লোকের ঘরে জন্ম নিল না।
কলেজ জীবনে তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল শীলা। সে ছিল এক পি,ডব্লিউ,ডি, ইঞ্জিনিয়ারের মেয়ে। লাবন্য তার সাথে চলাফেরা করত আর সেই সুবাদে তাদের বাড়িতে যেত। ওখানে গিয়ে তার সমস্ত প্রসাধনী, তার ড্রইং রুম তন্ন তন্ন করে দেখত। নিজে এরকম নাপাওয়ার জন্য সে মানসিক পীড়া অনুভব করত। নিজেকে নিজে ধিক্কার দিত , কেন সে এরকম মা-বাবার ঘরে জন্ম নিল না। 
  বিয়ের দিন ক্ষণ ধার্য হলে সে মাকে সবসময় ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চাইতো তার বিয়েতে কি কি দেওয়া হবে। কিন্তু বাবা না থাকায় ভাই দুটি আর কিইবা করবে, কোন রকমে স্বামীর ঘরে পাঠালেই যেন রক্ষা। ফলে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুলো অধরাই থেকে গেল। কোন রকমে বিয়ের পর্ব শেষ হল।
    বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে সে যেন আরো হাঁপিয়ে উঠলো। স্বামী আদিত্য কলেজ ক্লার্ক হলে কি হল, সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং অত্যন্ত নম্র ভদ্র। সে লাবন্যের মনের কথা খুব ভালো বুঝতে পারে। কিন্তু তার গগনচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা সে কোন মতেই পুর্ন করতে পারে না। ফলে সেখানে সবার আদর যত্ন পাওয়া সত্ত্বেও সে নিজেকে অসুখী মনে করে।  আদিত্য মনেপ্রাণে তাকে ভালোবাসে , শত কাজের ফাঁকেও সে লাবন্যকে নিয়ে মাঝে মধ্যে কখনো মেলাতে,  কখনোবা কোন অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে চায় কিন্তু সে বলে তার এসকল স্থানে ঘুরতে যাওয়ার মতো ভালো ড্রেস নেই, ভালো অলঙ্কার নেই। যদিওবা কখনো যায় তার মনটা থাকে দুর্বল, যেন তার এসকল ড্রেস এসব পরিবেশের জন্য মানানসই নয়। 
  এতদসত্ত্বেও লাবন্যের কিছু গুণাগুণও ছিল। সে যেমন সুন্দর ছিল তেমনি ছিল সহজ ও সরল। অল্প দিনেই সে পরিবারের সবাইকে আপন করে নিয়েছে। শাশুড়ি ও ননদরা তাকে খুব ভালোবাসতো। 
একবার শাশুড়ি অসুস্থ হলে তাকে ডাক্তার দেখাতে লাবন্য শহরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তখন আদিত্য কাজের চাপে ব্যস্ত থাকায় লাবন্যকে বলল মাকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে। সঙ্গে সঙ্গে সে আদিত্যকে বলল মায়ের জন্য ভাল একটা শাড়ি আনতে। শাশুড়িকে নতুন শাড়ি পরিয়ে ভালো ভাবে সাজিয়ে গুজিয়ে সে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তার সেবা শুশ্রূষায় তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন। তখন থেকে সে শাশুড়ির কাছে আরো প্রিয় হয়ে ওঠে।
  ####
একদিন অফিস থেকে ফিরে আদিত্য লাবন্যের হাতে একটি আমন্ত্রণ পত্র তুলে দিল। লাবন্য বলল ,' এটা কি?'
আদিত্য,' আমন্ত্রণ পত্র, পড়েই দেখোনা।'
লাবন্য পাত্রটি খুলে পড়ে দেখল, কলেজের সভাপতি স্থানীয় এম,এল,এ, এর মেয়ের বিয়ে। তাদের দুজনের নামে ইনভাইটেশন। লাবন্য এটা পড়ে খুশি না হয়ে বরং পাত্রটি আদিত্যকে ফেরত দিয়ে বলল,' এটাতো আমার জন্য নয়, আমি যাবো না।' আদিত্য আশা করেছিল ইনভাইটেশনটা পেয়ে লাবন্য খুব খুশি হবে। তারা এতবড় একটা অনুষ্ঠানে একসঙ্গে যাবে। কিন্তু লাবন্যের এহেন ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে সে জিজ্ঞেস করল,' কেন? পাত্রটিতে তো দুজনেরই নাম রয়েছে। এতবড় একটা অনুষ্ঠান, শহরের নামিদামি সব মন্ত্রী মিনিস্টার, এডুকেশনিস্ট আসবে আর আমরা দুজন ইনভাইটি। লাবন্য একটু বিরক্তি ভরে তার দিকে চেয়ে বলল,' তাতো আসবে, তুমিও যাও অন্য কাউকে নিয়ে, আমি যাবো না।' আদিত্য কারণ জানতে চাইলে সে বলল,' আমি যে সেখানে যাবো তেমন ড্রেস তো আমার নেই।'  বলেই সে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। আদিত্য বলল,' ও এই কথা? ঠিক আছে ভালো ড্রেস আই মিন একটা ভালো শাড়ি কিনবে, এইতো? কত টাকা লাগবে বল?' লাবন্য জানে তাদের অভাবের সংসার। স্বামীর তেমন সামর্থ্য নেই অথচ মানানসই একটা শাড়ি কিনতে কত লাগবে, সে একটু চিন্তা করে বলল ,' এই ধরুন হাজার তিনেক। আদিত্য বলল,' আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা আজই তা কিনে নিয়ে আসবো। ' শাড়ি তো নিয়ে আসা হলো। কিন্তু বাড়িতে এসে লাবন্যের সেই হায়হুতাস। ' শাড়ি তো কিনলাম কিন্তু ভালো গহনা নেই, কি করা যায়?' 
দুজন মিলে সারারাত এব্যাপারে চিন্তা আর আলাপ আলোচনা চলল। শেষে আদিত্য বলল,' আমাদের কলেজের সামনে একটি জুয়েলারি আছে। ওখানে নকল সোনার চেইন পাওয়া যায়। যার দাম মাত্র সাত আটশো টাকা হবে। অথচ কেউ পরখ না করে চিনতেই পারবে না।ওখান থেকে নাহয় একটা কিনে নেব।' লাবন্য তাতে রাজি হল। 
####
অনুষ্ঠানের দিন একটু সকাল সকাল তারা জুয়েলারিতে গিয়ে চেইন দেখল। দোকানের মালিক তাদের আসল নকল সবটাই দেখাল। কিন্তু নকল তো নকলই। লাবন্য খুব ভালো ভাবে চেয়ে দেখল দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। তবু সহজে কেউ ধরতে পারবে না। দাম জিজ্ঞেস করে তারা জানল আসলটার দাম এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা আর নকলটার দাম মাত্র বারো শো টাকা। আদিত্য বলল ,' যেটা সম্ভব নয় সেটা চিন্তা করে লাভ নেই। আমরা ঐ নকলটাই কিনে নেই। 'লাবন্য তাতে রাজি হল। কিন্তু লাবন্যের হাবভাব দেখে দোকান মালিক বলল,' আসলটা যদি আপনারা ভাড়া নেন আমি দিতে পারি। তবে তার জন্য এ্যগ্রিমেণ্ট দিতে হবে।' লাবন্য জিগ্যেস করল,' এ্যাগ্রিমেন্ট মানে?' তখন দোকানি বলল,' মানে তার জন্য আপনাকে একদিনের জন্য একহাজার টাকা দিতে হবে, আর যদি জল ময়লা ইত্যাদি লাগে বা নষ্ট বা ডেমেজ হয় তাহলে পুরো দাম দিতে হবে।' লাবন্য তাতে রাজি হয়ে গেল। সে বলল,' তাহলে ঐটাই নিয়ে যাই। লাবন্যকে খুশি রাখতে আদিত্য বলল,' ঠিক আছে।' তারা এ্যাগরিমেন্ট করল এবং চেইন নিয়ে চলে গেল। 
  বিকেল পাঁচটায় তারা বিয়ের পার্টিতে রওয়ানা দিল। দীর্ঘ দিন পর লাবন্যের মুখে যেন হাসি ফুটে উঠল। এতবড় পার্টিতে লাবন্য এই প্রথম। শহরের অনেক নামিদামি অতিথির সাথে তার পরিচয় হল, কথা হল। অন্যান্যদের সাথে হঠাৎ তার সেই কলেজ ফ্রেণ্ড শীলার সাথেও দেখা হয়ে গেল। শীলা একেবারে সাধারণ বেশে পার্টিতে এসেছে। তার আগের সেই জৌলুস যেন এখন আর নেই। শীলা তার স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। স্বামীর পরনে শার্ট প্যান্ট কোট আর দামি সব জুতা একেবারে ফিটফাট দেখে লাবন্য এখন একটু লজ্জায় পড়ে গেল। এতদিন সে শুধু নিজেকে নিয়েই চিন্তা করেছে। স্বামীই যে নারীর আসল পরিচয় একথাটা সে একদিনও ভাবেনি। আজ শীলা এবং শীলার স্বামীকে দেখে তার নিজের ভুল কিছুটা ভাঙলো। এখন শীলাকে কিভাবে স্বামীর সাথে পরিচয় করাবে। কারণ আদিত্য একেবারে সাধারণ শার্ট প্যান্ট পরে এসেছে। তবু শেষ পর্যন্ত শীলাকে নিয়ে স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
অতঃপর তারা দুজন একান্তে বসে সুখ দুঃখের অনেক কথা হল। লাবন্য বলল,' শীলা, তোমার এত পরিবর্তন কিভাবে হল। তোমার আগের সেই সৌখিনতা সেই জৌলুস , অথচ তোমার স্বামী কি ফিটফাট।' শীলা একটু মুচকি হেসে বললো, ' সে এক সময় আর এখন আরেক। বিয়ের পর স্বামীই তো নারীর আসল পরিচয়।' 
  অনুষ্ঠান শেষে খাওয়া-দাওয়া করে তারা বিদায় নিল। 
গাড়িতে বসে লাবন্য হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,' আমার চেইন, আমার চেইন কোথায়?' গাড়িতে কিছু খোঁজাখুঁজি করে আদিত্য বলল,' যা হবার তাতো হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই।' ঘরে পৌঁছে সেদিন সারারাত লাবন্যের ঘুম হয়নি। আদিত্য তাকে কোন মতেই সান্ত্বনা দিতে পারছে না। লাবন্য এখন বুঝতে পারল সে কত বড় ভুল করেছে। সে আদিত্যকে বার বার বলতে লাগলো,' ওগো আমাকে ক্ষমা করে দাও। ওই সময় যদি তোমার কথাটা শুনতাম তাহলে আজ এদিনের মুখ দেখতে হতো না। মালিকের এত টাকার ঋণ আমরা কিভাবে পরিশোধ করব?' আদিত্য মনে মনে হেসে বলল,' সে দায়িত্ব আমার, তুমি চিন্তা করো না।' লাবন্য দুহাতে মাথায় মারতে লাগলো। বলল,' আমি প্রতি পদে পদে অনেক ভুল করেছি, আজ ঐ পার্টিতে গিয়ে আমার চোখ খুলে গেছে। যদি পার আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি আর বাকি জীবন কিছু চাইব না। 
আদিত্য বলল,' শান্ত হও। আমি জানতাম এরকম কিছু হতে পারে, তাই তোমার অজান্তে আমি ঐ নকল চেইনটাই নিয়েছিলাম।'

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়