একদিন এক ভিখারি
স্কুল শিক্ষক গৌরেশ বাবু তার ছোট বেলার এক বন্ধুর সাথে চা পান করে দোকান থেকে বেরোতেই দেখেন সামনে ভিড় জমে আছে। একটু এগিয়ে যেতে দেখেন মানুষ যে যার কাজে সরে যাচ্ছে। জানা গেল দুটি ছেলের মধ্যে কিছু টাকার লেনদেন নিয়ে বচসা বেঁধেছিল। গৌরেশ বাবুও ফিরে যাচ্ছিলেন এমন সময় একটা ছেলে তার পথ আগলে বলল,' বাবু আজ তিন দিন থেকে আমি কিছু খাইনি, কিছু টাকা দিন।' ছেলেটাকে দেখতে ভিখারি বলে মনে হল না । বয়স আনুমানিক ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছর হবে। গৌরেশ বাবু জিজ্ঞেস করলেন,' তোমার নাম কি, বাড়ি কোথায়,কি কর?'
ছেলেটি বলল আমার নাম লালু, মানে লালুকান্ত। পেশায় আমি একজন শিক্ষক ছিলাম। কিন্তু আমার উপর একটা মিথ্যা ব্লেম তুলে আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। চাকরি হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছি। বাবু, একটু টাকা দেন না, কিছু খাবো।' গৌরেশ বাবু ওর চেহারা দেখে বুঝলেন ও মিথ্যা কথা বলছে। তবু পকেটে হাত দিয়ে কিছু দিতে যাবেন এমন সময় তার নজর পড়ল লোকটার হাতের লোহার বালার দিকে। অমনি তার নজর পড়ল লালুর পরনের ছেঁড়া লাল শার্টটার উপর। শার্টটি এমন ভাবে ছেঁড়া আর সেলাই করা, দেখতে ঠিক যেন ভারতের মানচিত্র দেখা যায়। তখনই তার মনে হলো লোকটাকে কোথাও যেন দেখেছেন। বললেন,' তোমাকে তো খুব চেনা চেনা লাগছে। মনে হয় ইতোমধ্যেই তোমাকে কোথাও দেখেছি।' গৌরেশ বাবুর মনে পড়ে গেল এইতো গত পরশু দিন বাস স্টেশনের সামনে তিনি একে দেখেছেন। তিনি বললেন,' তখন তো তুমি বলছিলে তোমার টি,বি হয়ে গেছে, ডাক্তার দেখাবে। এতসব মিথ্যা কথা বলে ভিক্ষা করার দরকার কি? দেখে তো সুস্থ সবল বলেই মনে হচ্ছে। লজ্জা শরম বলে কি কিছু নেই। ' লালু প্রথমে অস্বীকার করে। বলে,'ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি আমি মিথ্যে বলছি না, এই দেখুন না ' বলে পকেট থেকে কাগজ বের করার উপক্রম করে আবার বলল ' এই দেখুন স্যার আমি যে শিক্ষক ছিলাম তার প্রমাণ আছে।
গৌরেশ বাবু,' এটা তো ভিক্ষা চাওয়ার বাহানা। সেদিনও তোমার হাতে ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন ছিল। তুমি কি জানো বার বার মিথ্যা বলার অভিযোগে তোমাকে এখনই পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারি।' লালু এবার ভয় পেয়ে গেল । সে কাকুতি মিনতি করে বলল,' হাঁ স্যার, আমি স্বীকার করছি, আমি মিথ্যে কথা বলছি কিন্তু এছাড়া আমার কাছে আর কোন উপায় নেই। অভাবের কারণে বিয়েও করিনি। সংসারে আপনার বলতে আমার আর কেউ নেই। আপনি বিশ্বাস করবেন না, আমার কোন বাড়িঘরও নেই। এভাবে মিথ্যা না বললে কেউ সাহায্যও করে না। সত্যি বলছি স্যার, আমি আমার অল্প পরিসর ভিখারির জীবনের অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি তা হলো, যে যত বেশি মিথ্যা কথা বলতে পারে সে তত বেশি মানুষের মন জয় করতে পারে আর ততই বেশি সাহায্য লাভ করতে পারে।'
গৌরেশ বাবু তিতিবিরক্ত হয়ে বললেন,' এসব ছাড়। মানবতাবোধটা জাগ্রত কর। সারা জীবন কি ভিক্ষাই করবে?, বরং কাজ কর। তোমার মতো হাজার হাজার মানুষ কাজ করে অনেক বড় বড় পরিবার চালিয়ে যাচ্ছে।' লালু ইতস্তত করে বলল,' কাজ হয়তো করতাম, কিন্তু কাজ তো পাওয়া যায় না। যারা আগে থেকেই কাজ করছে তাদেরই রুটি মিলছে না। আমি আর কাজ কোথায় পাব?'
গৌরেশ বাবু বললেন,' ঠিক আছে, তুমি কি কাজ করবে? আমি তোমাকে কাজ দেব। চল আমার সঙ্গে। সারাদিন মিথ্যা কথা বলে ভিক্ষা করে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ক'টাকাই বা পাও? তার চেয়ে বরং সৎ পথে কাজ কর, অনেক টাকা পাবে। মানসম্মান ও বাঁচবে আর নাখেয়ে মরতে হবে না।' বুঝা গেল একথা শুনে সে একটু চিন্তায় পড়ে গেল। পরে সে রাজি হল কাজ করতে,' বলল ঠিক আছে চলুন।
লালুকে নিয়ে গৌরেশ বাবু চললেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।
বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ' নিপা, এদিকে আসো তো। ' নিপা এলে তিনি বললেন,' এই লোকটাকে আমি এনেছি কাজ করার জন্য। ও আমাদের এখানে থাকবে আর কাজ করবে। ওর হাতে একটি কোদাল দিয়ে আমাদের ঐ সব্জি বাগানে মাটি খুঁড়ার জায়গাটা দেখিয়ে দাও।
নিপা কোদাল হাতে লালুকে সঙ্গে নিয়ে সব্জি বাগানে কাজ দেখিয়ে দিল কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ না করায় আর কিছুটা নেশা পান করায় সে এতটাই অলস আর দুর্বল হয়েছিল যে কোদাল চালাতে পারছিলনা। মাত্র কয়েক ঘা কোদাল মেরেই সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। শরীরটা কাঁপতে শুরু করে। নিপা প্রথমে খুব রাগ করে ওকে গালিগালাজ করে,বলে ' ব্যাটা জোচ্চোর তোদের মত ছোট লোক গুলো কেন যে এ পৃথিবীতে আসে। শুধু শুধু গিলবি আর মানুষ ঠকিয়ে ভিক্ষা করবি। তোদের তো আত্ম সম্মান বলে কিছুই নেই।' লালুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। বলল,' ম্যাডাম একটু জল খাব। নিপার কেমন যেন দয়া হল। সঙ্গে থাকা বোতল থেকে তাকে জল দিল আর বলল কোন বাহানা চলবে না, কাজ তোমাকে করতেই হবে। এই বয়সে ভিক্ষা করার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। লালু কাকুতি মিনতি করে বলল,' ম্যাডাম আজ তিন দিন হল আমি পেট ভরে কিছু খাইনি , আমাকে যেতে দিন। নিপা বলল,' কেন, কোথায় যাবে, চুরি করবে? তুমি এখানে বস, কাজ কিভাবে করতে হয় আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। একবার যখন এখানে এসেছ, তোমাকে মানুষ করে ছাড়ব।' এই বলে নিপা কোদাল চালাতে লাগল। অনেকক্ষণ মাটি খুঁড়ার পর আবার কিছু বকুনি দিল তারপর তাকে নিয়ে বাড়ি চলে গেল। লালু তখন ভয়ে কাঁপছে। নিপা ঘরে গিয়ে স্বামীকে বলল,' লোকটা কাজে ভালো আছে। আজ অনেক জায়গা খুঁড়ে ফেলেছে।' কথা শুনে গৌরেশ বাবু সঙ্গে সঙ্গে দু'শো টাকা বের করে দিলেন আর নিপাকে বললেন ওকে খাবার দিতে। সে খেয়েদেয়ে বেশ চাঙ্গা বোধ করল। তাকে পাশের ছোট একটা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।
পর পর দু-তিন দিন এভাবেই চলল। লালুকে কাজে নিয়ে গিয়ে নিপা নিজেই কাজ করে এসে স্বামীর কাছে মিথ্যা কথা বলে ওকে মজুরি পাইয়ে দেয়।
দিনের পর দিন নিপার বকুনি খেয়ে ধীরে ধীরে একটু আধটু কাজ সে করতে শুরু করে। এক সময় লালুর বিবেক জেগে ওঠে। সে নিপাকে বলে,' না ম্যাডাম আপনাকে আর করতে হবে না আমি পারবো। আরও প্রায় মাস তিনেক এভাবেই চলল। এখন সে কাজ সুন্দর ভাবে করতে পারে। ইতিমধ্যে মজুরিও অনেক টাকা জমা হয়ে গেছে।
একদিন গৌরেশ বাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন সে কতটুকু লেখাপড়া করেছে, হিসেবনিকেশ পারে কিনা। সে বলল এসবে তার কোন অসুবিধা নেই। তখন তিনি তার এক বন্ধুর দোকানে তাকে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে দোকান কর্মচারী হিসেবে সে কাজ শুরু করল। অল্প দিনেই সে দোকানদার সন্তুষ্ট হয়ে তাকে মাসে দুহাজার টাকা বেতন দেবার কথা জানালেন সঙ্গে থাকা খাওয়া ফ্রি। লালুর আনন্দের সীমা নেই। এখন আর তার টাকার কোন প্রয়োজন নেই তবু ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলে সে মাসে মাসে টাকা রাখতে লাগলো।
ইতিমধ্যে একদিন লালু তার মনিবকে বলে হাজার দুই টাকা নিয়ে একদিনের ছুটি নিল। সে গৌরেশ বাবু ও তার স্ত্রীর জন্য কিছু ফলমূল আর কাপড় নিয়ে তাদের সাথে দেখা করার জন্য গেল। গৌরেশ বাবু তখন সব্জি বাগানে কাজ করছিলেন। লালু সেখানে উপস্থিত হতে অবাক হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,' কি হে লালু কেমন আছো, ওখানে কিরকম চলছে।' লালু বলল,' খুব ভালো আছি স্যার, আমার তো ওখানে পারমানেণ্ট চাকরি হয়ে গেছে, মাসে দুহাজার টাকা বেতন।'
' বলিস কি রে? ' গৌরেশ বাবু যেন আনন্দে আত্মহারা। বললেন,' তাহলে জীবনে অন্তত ভালো একটা কাজ করলাম, তোকে মানুষ করতে পরলাম।' লালু খুশি হয়ে বলল,হে,স্যার আপনার জন্য আমি ধন্য। তবে আমার সফলতার পেছনে আপনার চেয়ে আরও বেশি অবদান যার, তিনি হলাম ম্যাডাম নিপা। উনি না থাকলে হয়তো আজও আমি ভিখারি হয়েই থাকতাম।' কথাটা শুনে গৌরেশ বাবু আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ' তা কেমন করে?'
লালু বলল,' নিপা ম্যাডামের বকুনি আর গালাগালই আমাকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছে। জানেন বাবু, আপনার বাড়িতে আমি প্রথম দশ/পনেরো দিন কোন কাজই করিনি। কিন্তু নিপা ম্যাডাম আপনাকে তা বুঝতে দেননি। তিনি নিজে সব্জি বাগানে কাজ করে আপনাকে গিয়ে বলতেন আমি করেছি। আর উনার শ্রমের টাকা আপনি আমাকে দিতেন। উনার সে অবদান আমি জীবনেও ভুলতে পারবো না।
( সমাপ্ত)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন