নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাস



ধলেশ্বরী নদীর তীরে ছোট একটি গ্রাম। নদীর তীরে একেবারে নদীর গা ঘেঁষে ছোট একটি কুঁড়ে ঘর। বর্ষাকালে  নদীর জল প্রায়ই ফুলে ফেঁপে উঠোন বেয়ে জল গড়িয়ে যায়। তিন পুরুষ থেকে সনাতনরা ওখানেই থাকে। বৎসরে এক দুবার বন্যার সময় ঘরে জল ঢুকে যায় তখন ঘর ছেড়ে অদূরে বাঁধের উপর আস্তানা পাততে হয়। 
বাবা মারা যাওয়ার পর তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট দু'ভাই কাজের সন্ধানে ভিটেমাটি ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যায়। বড় ভাই সনাতন দশ বৎসর থেকে একা স্ত্রী মীরাকে নিয়ে এখানেই ঘর সংসার করে আছে। নিঃসন্তান সনাতন দিন মজুরের কাজ করে কোন রকম স্ত্রীকে নিয়ে দিন যাপন করছে। 
দশ বৎসরের বিবাহিত জীবনে মীরা নিজেকে সুখী মনে করে। স্বামী দিনমজুরের কাজ করে যা পায় তা দিয়েই দুজনে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন যাপন করে। কখনো কাজ না পেলে না খেয়েও থাকতে হয় তবু মীরা কোন দিন কোন আব্দার করেনি।
মাঝে মধ্যে সনাতন দুই টাকা পাঁচ টাকার খুচরো কয়েন মীরাকে দিয়ে বলতো কখনো কোন প্রয়োজনে বা কিছু খাবার ইচ্ছে হলে পাশের দোকান থেকে কিনে আনার জন্য। মীরা সে টাকা খরচ না করে রেখে দিত। প্রতিদিন স্বামী কাজে চলে গেলে সে টাকা গুলো বের করে গুনতো আর খুচরো টাকার ঝনঝন শব্দ বাজাত। টাকার ঝনঝনানিতে তার মন আনন্দে ভরে উঠতো। সে বলতো,' এগুলো আমার সোনা, আমার সোনা বাড়বে। আরও অনেক সোনা হবে।' সারাদিনের নিঃসঙ্গতা সে এগুলোর শব্দ শুনে কাটিয়ে দিত। 
এরকম প্রায় দু'বছর অতিক্রান্ত হল। একদিন সে রোজকার মত কয়েন গুলোর ঝনঝনানিতে আর গুনতে গুনতে অবসন্ন হয়ে এগুলোর পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় পাশের বাড়ির ভোলা আর নুনু এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় একটু জল পান করবে বলে এগিয়ে যায়। কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ভোলা বৌদি বৌদি বলে ডেকে এগিয়ে গিয়ে দেখে বৌদি ঘুমে আচ্ছন্ন। টাকা গুলো দেখে  লোভ সামলাতে না পেরে সে অতি সন্তর্পণে ওগুলো তুলে নেয়। কিন্তু নুনু সঙ্গে থাকায় সে বলে দেবে এই ভয়ে তাকে অর্ধেক দেবে এই বলে তারা টাকা গুলো নিয়ে চলে যায়। 
মীরার ঘুম ভাঙলে চেয়ে দেখে পাশে মাত্র দু-তিনটে কয়েন পড়ে আছে। সে পাগলের মত উঠে এদিক সেদিক খুঁজল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। সে মাথায় হাত দিয়ে বসে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। সনাতন বাড়িতে এসে মীরার এ অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে। মীরা আদ্যোপান্ত সকল ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে সনাতন বুঝতে পারল কোন অবস্থাতেই তাকে স্বান্তনা দেওয়া যাবে না। তাই সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,' ও এই কথা, আমি দুপুরে বাড়ি এসেছিলাম। তোমাকে এই অবস্থায় ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে ভাবলাম টাকা গুলো কোন চোর বা ভিখারি কেউ নিয়ে যাবে তাই আমিই নিয়ে গিয়েছি। তুমি মিছিমিছি কান্নাকাটি করছ।' তাকে বিশ্বাস পাইয়ে দেওয়ার জন্য সে আরও বললো,' আমি তো অবাক, তুমি এত টাকা পেলে কোথায়?'
মীরা একটু আশ্বস্ত হল। বলল,' এ সব তোমারই দেওয়া টাকা, আমি তিলে তিলে এগুলো জমিয়েছি। ভাবছিলাম এবার পূজোয় তোমাকে একটা মোবাইল কিনে দেবো। ' সনাতন মীরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,' না মীরা, আমরা কাজের মানুষ, আমাদের এসবের দরকার কি? বরং এ টাকা দিয়ে পূজোয় তোমাকে একটা ভালো শাড়ি কিনে দেবো। মীরা বলল,' দেখি টাকা গুলো।' সনাতন ধরা পড়ে যাবে ভেবে চটজলদি উত্তর দিল,' আমি ওগুলো মহাজনের কাছে রেখে এসেছি। ওর দোকান থেকেই তো কাপড় কিনবো। ' মীরা বলল, না, আমার কাপড় আছে, বরং তুমি টাকা গুলো নিয়ে আসবে, আমি তোমার জন্য মোবাইল কিনবো। '
এদিকে ভোলা ও নুনুর মধ্যে চুরির টাকা গুলো ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ঝগড়া লেগে যায়। ভোলা বলছে, যেহেতু সে রিস্ক নিয়ে টাকা গুলো উঠিয়ে এনেছে, সে দু'শো টাকা বেশি নেবে। কিন্তু নুনু তা মানতে নারাজ। সে সমান অংশ দাবি করছে। ঝগড়া অনেক দূর গড়িয়ে শেষ পর্যন্ত মীরার কানে গিয়ে পৌঁছায়। মীরা শোনামাত্র ভোলার বাড়ি গিয়ে ভোলার মায়ের কাছে নালিশ জানায়। ভোলার মা সঙ্গে সঙ্গে নুনুর মা'কে ডেকে ছেলে দুটোকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে দুজনের কাছ থেকে টাকা গুলো নিয়ে মীরাকে দিয়ে ঘটনার নিষ্পত্তি করেন। টাকা গুলো নিয়ে মীরা ঘরে যেতেই সনাতন পকেট থেকে টাকা বের করে মীরার হাতে দিয়ে বলল এই নাও তোমার হাজার দুই টাকা। মীরা মুচকি হেসে বলল,' কিন্তু আমার ওখানে তো মাত্র বারো শো টাকা ছিল।' সনাতন বলল, ' হে, বাকি গুলো আমার কাছে ছিল তাই আমি এ্যাড করে দিলাম।' মীরা বুঝতে পারল সনাতন তাকে কত ভালবাসে। সে হাতের টাকা গুলো দিয়ে বলল,' আর আমি এই টাকা গুলো কুড়িয়ে পেয়েছি। এখানে বারো শো টাকা আছে।' ঘটনাটা সনাতনের বুঝতে বাকি রইলো না। সে বলল,' এবার পূজোয় তোমাকে একটা দামী শাড়ি কিনে দেবো।' মীরা বলল,' তার চেয়ে বরং আমরা একটা দামী মোবাইল কিনবো।' সনাতন মীরাকে জড়িয়ে ধরে বলল,' মীরা নামের অর্থই হলো সক্রিয় বা শান্তি, তুমিই আমার শান্তি, তুমিই তো আমার মোবাইল।' একে অন্যের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা ভেবে দু'জনেই অঝোরে চোখের জল ফেলতে লাগল।
####
দিন গড়িয়ে যায়। ইতিমধ্যে সনাতন কাজ করে আরো কিছু টাকা বাঁচাতে পারলো। সব মিলিয়ে হাজার পাঁচেক টাকা হয়ে গেছে। একদিন একটা লোক কয়েকটি ছাগল নিয়ে বাজারে যাচ্ছে। এরমধ্যে একটা কিছুটা লাল মতো রঙের ছাগল ছানা দেখে মীরার খুব পছন্দ হল। সে সনাতনকে ডেকে বললো,' পূজো তো এখনো অনেক দূরে। টাকা গুলো ঘরে রেখে লাভ কি? তাছাড়া আবার যদি কোন অঘটন ঘটে যায়? তার চেয়ে আমরা বরং ঐ ছাগল ছানাটি কিনে নেব। আমি তো সারাদিন একা বাড়ীতে থাকি। আমি এটাকে নিয়ে লালন পালন করব। তাতে আমাদের টাকাও বাড়বে।' কথাটা সনাতনেরও খুব ভালো লাগলো। তাছাড়া ছানাটি তারও  খুব পছন্দ হল। তাই সে ওর কথায়  রাজি হয়ে গেল। ছাগল ছানাটি তারা সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিল। 
  সনাতন কাজে চলে গেলে মীরা সারাদিন এই ছাগল ছানাটিকে এদিক সেদিক থেকে খাবার এনে দেয়। দেখতে দেখতে ছানাটি খুব হৃষ্টপুষ্ট এবং বড় হয়ে ওঠে। মীরা নিজের সন্তানের মতো এটাকে ভালোবাসে। এটি রাখার জন্য তারা ছোট একটা ঘর তৈরি করে। এর মধ্যে সে যেন নিজের ভবিষ্যৎ সুখের দিন খুঁজে পায়। 
  কিন্তু বিধি বাম, সুখের আয়ূ বড় স্বল্প। একদিন সন্ধ্যা রাতে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। একসময় ঝড়ে ঘরের ছাউনী উড়ে যায়। দুজন প্রাণ বাঁচাতে এই নিদারুণ ঝড়বৃষ্টির মধ্যে ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কতদূর গিয়ে মীরা আবার ফিরে এসে ছাগল ছানাটি নিয়ে যেতে চায়। তখন সনাতন তাকে বাধা দেয়। সে বলে ,' এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে এটাকে না সরানোই ভালো। ওর ঘরটি তো সুরক্ষিত আছে, দরজাটাও ভালো ভাবে লাগানো আছে।' তারা ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে অদূরে এক বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেদিন সারারাত মুষলধারে বৃষ্টির ফলে নদীর জল ফোলে ফেঁপে চতুর্দিক ভাসিয়ে দিল। নদীর জলস্রোতে তাদের কুঁড়ে ঘরটিও ভাসিয়ে নিয়ে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে তারা শুধু চেয়ে রইল। উচ্ছল জলের স্রোত তাদের হৃদয়েও প্রবাহিত হতে লাগলো। কোন কিছু বাচানো তো দূরের কথা, ঘরের পাশে যাওয়ার কারো সাধ্য নেই। তার সাধের ছাগল ছানাটার কথা ভেবে মীরা দূরে বসে অঝোরে চোখের জল ফেলতে লাগল। বুকে পাথর বেঁধে বসে আছে সনাতন। কে কাকে কি দিয়ে সান্ত্বনা দেবে? সবই নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাস!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়