অটোওয়ালা (ছোট গল্প)



সাতসকালে মেয়েকে কোচিং সেন্টারে দিয়ে রীতিকা ঘরে ফেরার জন্য রাস্তায় একটা অটো রিকশাতে সিগন্যাল দিল। গাড়িটি তার সামনে এসে থামতেই রীতিকার চক্ষু তো চড়কগাছ! সে ভাবতেও পারেনি হঠাৎ করে এমন একটা অসুবিধার মধ্যে পড়ে যাবে। ড্রাইবার ডাকলো , ' কি হলো, উঠুন ম্যাডাম।' রীতিকা আমতা আমতা করে বলল,' না মানে আমি তো একটু বি,বরুয়া রোডে যাব,তাই ভাবছি -'
মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয় ড্রাইবার সুমিত। বলে' তাতে কোন সমস্যা নেই, আমি দিয়ে আসবো আপনাকে।' অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও রীতিকা অটোতে উঠে বসলো। সুমিত গাড়ি চালিয়ে দিল। কারো মুখে কোন কথা নেই। রীতিকা সামনের গ্লাসের দিকে ঠায় চেয়ে আছে সুমিতের দিকে। পরনে শার্ট প্যান্ট আর চোখে সানগ্লাস। সেই কলেজ জীবনের সুদর্শন চেহারা যদিও আজ আর নেই তবু সব সময় ফিটফাট চলাফেরার অভ্যাসটা বোধ করি আজও তার মধ্যে বর্তমান। 
     অটো দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললো। তার সাথে এগিয়ে চলছে রীতিকার স্মৃতির দর্পণ। 
   কলেজের নবীনবরণ উৎসবের দিন তার প্রথম পরিচয় সুমিতের সাথে। পড়াতে যদিও দু ক্লাস জুনিয়র তাদের চলাফেরা কিন্তু একসাথে। প্রথমে বন্ধুত্ব পরে প্রেম। তার মনে পড়লো সুমিত একদিন বলেছিল, পড়াশোনা গরীবের জন্য নয়। হাইয়ার সেকেণ্ডারীতে ৮৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাশ করেছিল সুমিত। কিন্তু টাকার অভাবে কোচিং নিতে পারেনি যার কারণে তার মেডিকেল পড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। ভেবেছিল মেডিকেল নাপড়লেও সায়েন্সে মাস্টার্স করবে তাও হলনা। সায়েন্সে পড়তে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন,যা তার দ্বারা সম্ভব নয় তাই আর্টসেই মাস্টার্স ডিগ্রি নিল। কিন্তু বিধাতার কি নির্মম পরিহাস। ভালো মার্ক্স থাকা সত্ত্বেও কোন জব পেলোনা।
রীতিকার মনে পড়লো, একদিন কলেজ কেণ্টিনে বসে সুমিত বলেছিল," অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।" রীতিকা তখন বলেছিল, ' এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যা আপনা থেকেই জন্মায়, তা কখনো জোর করে আদায় করা যায় না। এখানে টাকা পয়সা, ধনীগরিবের কোন প্রশ্নই আসে না। অনেক কোটিপতি ঘরের মেয়েরাও সম্পূর্ণ ত্যাগ করে শুধু ছেলের হাত ধরেই পালিয়ে যেতে দেখা যায়।' রীতিকা বলেছিল ,' আমি তো তোমাকে ভালোবেসেছি, আমার প্রাণ যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ কেউ তোমাকে আলাদা করতে পারবে না।'
সুমিত তখন বলেছিল,' জব না পেলে হয়তো আমার ভালোবাসাও একদিন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। তুমিও হয়তো সেদিন আমাকে চিনবে না।'
হলোও তাই, এম এ পাশ করার পরও কোন চাকরি না হওয়ায় রীতিকার বাবা তাকে মেনে নিতে পারেননি। রীতিকা কাকুতি মিনতি করে মা'কে বলেছিল সে সুমিতকে ছাড়া বাঁচবে না। মা'ও প্রথমে মেয়ের পক্ষে কথা বলেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কে কার কথা শোনে? বাবা তাকে একপ্রকার নজর বন্দি করে অন্যত্র বিয়ের আয়োজন করেন। সম্পূর্ণ গোপনেই বিয়ের আয়োজন ছিল। সুমিত এ খবর জানা তো দূরের কথা, রীতিকা নিজেও জানতো না।
রীতিকার বিয়ে হয়ে গেল ডি সি অফিসের এক কেরানির সাথে। তারপর ----------। 
 অবশ্য এখন সে অনেক সুখেই আছে।
রীতিকা স্মৃতি তর্পণে এতোটাই তন্ময় হয়েছিল যে সুমিত ইতিমধ্যে দু'বার তাকে জিজ্ঞেস করেছে, বি বরুয়া রোডের কোন গলিতে সে যাবে, সেখানে সেকি একা থাকে। কিন্তু রীতিকা সেকথা শোনেনি। চোখে মুখে বিষাদের ছাপ লক্ষ্য করে সুমিত এবার গাড়ি থামিয়ে ওর দিকে ঘুরে একটু জোরেই জিগ্যেস করল, ' আমরা কি আপনার গন্তব্য স্থল ছেড়ে চলে যাচ্ছি, এটাতো বি বরুয়া রোডের শেষ প্রান্ত। রীতিকা যেন সম্বিত ফিরে পেল। বলল,' হে, এইতো সামনেই।'  সুমিত গাড়ি থামালে রীতিকা পার্টস থেকে টাকা বের করতে করতে বলল,' আপনি কোথায় থাকেন, ছেলে মেয়ে কয়জন?' সুমিতের দুচোখ জলে টলমল করছে। সে বলল,' খাওয়াতে পারবো না বলে বিয়ে থা করিনি। রীতিকা পার্টস থেকে টাকা বের করে চেয়ে দেখে সুমিত চলে গেছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়