সততা যেখানে

শিরোনামঃ সততা যেখানে
রচনা:  হিফজুর রহমান লস্কর
তারিখ-০২/০২/২০২২

শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিল সত্যজিত। নিজের কথা, পরিবারের কথা- ছেলে মেয়ে গুলোর কথা। ছোট্ট একটা চাকরি, অফিসের কেরানী। মাসে যা বেতন পায় তা দিয়ে কোন ক্রমে বেঁচে থাকাটাই সমস্যা। তার উপর ছেলে মেয়ের পড়াশুনার বয়স হয়েছে। স্কুলে ভর্তি করেছে। প্রতিযোগিতার যুগ।সবাই প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছে। গিন্নীর পিড়াপিড়িতে ওদেরকে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করেছে।মাস শেষে যে ক' টা টাকা পায় তা থেকে স্কুল ফিস্ সময় মতো দিতে পারে না। তার উপর অফিসে কাজের চাপ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গাধার মত খাটুনি। এসব ভাবতে ভাবতে দু চোখে জ্বালা ধরে গেল। ভাবনা আর ক্লান্তিতে চোখ বুজলো সত্যজিত।
         গিন্নীর ঝাঁঝালো আওয়াজ তখনও কানে ভাসছিল। এই যে শুনছো - 'চাল ডাল সব শেষ হয়ে গেছে, এদিকে মিনির স্কুল থেকে নোটিশ দিয়েছে।ওর তিন মাসের বেতন জমে আছে। এগুলো এ মাসে না দিলে ওর নাম কেটে দেবে। ছেলে দুটোরও
বেতন দেওয়া হয় নি। ওদিকে মায়ের ঔষধও শেষ। 
সত্যজিত কোন কথাই বলছেনা দেখে সর্বানির রাগ হলো। বলে চললো , ' নিজের কাপড়ের কথা নাহয় বাদই দিলাম। দৈনন্দিন তেল নুন না আনলে তো আজ না খেয়েই থাকতে হবে।'
সত্য এরকম কথার সাথে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। তার অভাবের সংসারে এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সে নীরবে সহ্য করে। আজও হয়তো সহ্য করে নিত। কিন্তু আজ তার কি হলো সে নিজেই বুঝতে পারলো না। রাগ করে বললো, ' রাতের খাবার নেই এটাতো আমাকে আগে বলতে পারতে।'
স্বল্প আয় বিশিষ্ট লোকের এটাই স্বাভাবিক। খাবার শেষ হচ্ছে এটাতো আগে থেকেই জানা দরকার।
         রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে বলে উঠলো,' তুমি তো বলেই খালাস। টাকা আসবে কোত্থেকে শুনি- চুরি করবো না ডাকাতি করবো?'
কথাটা শুনে সর্বানিরও রাগ হলো। গলা সপ্তমে চড়িয়ে বলে উঠলো,' ঠিক আছে আমি চুরি করতেও বলবো না আর ডাকাতি করতেও বলবো  না। এভাবে সাধুবাবা সেজে বসে থাকো। এগুলো না আনলে আজ রাতের খাবার বন্ধ।' বলেই দুম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
     সত্যজিত আত্মবিস্মৃত হল। স্ত্রী'র ঐ সাধুবাবা শব্দটা কানে যেতেই অসহ্য বোধ করলো। তার মনে পড়ে গেল অফিসের কথা।
     সত্যজিত লোকটা অত্যন্ত ভালো, সহজ এবং সরল। সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকে। কোন দিন অফিসের কোন কাজে সে ফাঁকি দেয়নি। দিনভর অফিসের কাজ করে। দীর্ঘ পনেরো বছরের চাকরি জীবনে কোন দিন কোন কাজের জন্য কারো কাছ থেকে কোন ঘোষ নেয়নি। যখনই কোন কাজের জন্য কেউ আসতো সে সেটা করে দিত। কোন দুনম্বরী কাজ সে করতোনা। এজন্য তার অন্য একটা নামও আছে। তাকে সবাই সাধুবাবা বলেই ডাকতো।
সেদিন একটা লোক এসেছিল একটা কাজের জন্য। একটা মোটা অংকের টাকাও শুনিয়ে ছিল।
সত্যজিত বলেছিল , কাজটা যদি ভালো হয়,সে করে দেবে, কোন টাকা লাগবে না। কিন্তু লোকটার হয়তো বিশ্বাস হয়নি। তাই আজ সে একটা খামের ভেতর কুড়ি হাজার টাকা এবং একটি কাগজ তার কাছে দিতে যাচ্ছিল এবং বলতে চাইছিল 'এই নিন, আর কাজটা হয়ে গেলে আপনাকে আরও দেবো।'
এমন সময় ইন্সপেক্টর এসে উপস্থিত। সত্যজিত থতমত খেয়ে গেল।
ইন্সপেক্টর সত্যজিতের হাতে টাকা এবং কাগজটি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কি? ঐ লোকটাই বা কেন এসেছিল। কথাটা শেষ করেই ফিরে দেখেন লোকটি অন্তর্ধান হয়ে গেছে।
ইন্সপেক্টর বললেন, ' সত্যজিতবাবু, আপনার মত লোকও---। আপনার সম্বন্ধে আমার ধারণাটা পাল্টে গেল।'
সত্যজিত আমতা আমতা করে কি যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু সাহেব তো আর শুনতে চাননি। বললেন,'আজ আর কিছুই শুনবো না। কাল ঐ লোকটাকে নিয়ে অফিসে এসো।
সত্যজিত মনে অত্যন্ত আঘাত পেল।
টিফিন আওয়ারে কেন্টিনে রোজকার মত চা পান করতে গেলে ওখানে ফিস্ ফিসফিস, কানাঘুষা--কেউ বলছে সাধুবাবার একী অবস্থা! 
কেউ বলছে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিল, 
কেউ বলছে'ধর্মের কল বাতাসে নড়ে' - ইত্যাদি ইত্যাদি।
অফিস শেষে বাজারে গেলে সেই একই অবস্থা। কথাগুলো যেন তার পিছু পিছু চললো। ফিসফিস, গুঞ্জন। কেউ বলছে সত্য নাকি। কেউ বলছে লোকটা অত্যন্ত ভালো। কেউ আবার বলছে' ভালো না ছাই।' মরবে এবার, চাকরিটাও যাবে। এত বড় সংসার,খাবে কি করে? কেউ বলছে গলায় দড়ি দেবে হয়তো।'
বাজার শেষে বাড়ি আসছিল, এমন সময় কেউ একজন দূর থেকে চিৎকার করে ডাকছিল, ' সাধুবাবা , সাধুবাবা আমি আপনাকেই খুঁজছি।'
বিকট চিৎকারে সত্যজিতের ঘুম ভেঙ্গে গেল।
ভয়ে ভয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুললো। চেয়ে দেখে সর্বানি সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে একটা খোলা চিঠি।
সত্যজিতের প্রমোশন হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়