শুকনো পাতা
কলেজের বকুলতলায় প্রথম দেখা।
আরিফের নোটখাতা না হলে রূপার প্র্যাকটিক্যাল জমা পড়ত না। রূপা হাসলে আরিফের দুপুর রোদও শীতল লাগত। ক্যান্টিনের তিন টাকার চা দুজন ভাগ করে খেত। কথা ছিল — তুই ডাক্তার হবি, আমি প্রফেসর। দুজন মিলে একটা লাইব্রেরি দেব, গরিব ছেলেমেয়ে পড়বে।
সময় গড়াল। রূপা মেডিকেলের সাদা অ্যাপ্রন গায়ে দিল, আরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সিঁড়িতে এম.এ. পাশ ঠেকাল। চাকরির বাজারে তার সার্টিফিকেটটা শুকনো পাতার মতোই হালকা। টিউশনি করে মাসে আট হাজার। রূপার বাবা সরকারি সার্জন। একদিন ডেকে বললেন, “বাবা, আবেগ দিয়ে সংসার চলে না। আমার মেয়ের জন্য আমি একজন প্রতিষ্ঠিত পাত্র চাই।”
আরিফ রূপার হাত ধরতে চাইল। রূপা চোখ নামিয়ে বলল, “বাবা যা বলে ঠিকই বলে, আরিফ। বাস্তবতা মানতে শেখো। আমার এখন দায়িত্ব অনেক।”
সেই রাতে আরিফদের বাড়ির সামনের শিউলি গাছটায় হাওয়া দিল খুব। সকালে উঠে দেখে গাছের নিচে শুকনো পাতার স্তূপ। গাছ নিজেই ঝেড়ে ফেলেছে। মা বলল, “গাছ জানে কোন পাতা আর রস টানবে না, তাকে রাখা মানে বোঝা।”
আরিফ হাসল। বুঝে গেল — মানুষের হৃদয়ও গাছের মতো। রস মানে স্বার্থ, রঙ মানে প্রয়োজন। যে পাতা আর আলো দেয় না, জল দেয় না, তাকে হৃদয়ও রাখে না।
পাঁচ বছর পর। ডা. রূপা সেন এখন নামকরা গাইনোকলজিস্ট। গাড়ি, ফ্ল্যাট, সেমিনার। আরিফ একটা এনজিওতে কাজ করে, গ্রামের স্কুলে বাচ্চা পড়ায়। বেতন বিশ হাজার। একদিন ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে দেখা। রূপার চোখে সার্জিক্যাল মাস্ক, আরিফের চোখে চশমা।
রূপা বলল, “কেমন আছো?”
আরিফ ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই বাচ্চাটার হার্টে ছিদ্র। আপনার হাসপাতালে যদি একটা সিট...”
রূপা ফাইল দেখে বলল, “লিস্ট অনেক লম্বা, দেখি কী করা যায়।”
আরিফ মাথা নেড়ে চলে এল। বাইরে সেই শিউলি গাছটা এখনো আছে। বাতাসে আবার পাতা ঝরছে। সে গাছটার গুঁড়িতে হাত রাখল।
মনে পড়ল — দুনিয়ার স্বরূপ তো এটাই। বসন্তে গাছ পাতাকে বুকে টানে, আলো লাগে বলে। হেমন্তে রস শুকোলে নিঃশব্দে ঝরিয়ে দেয়। মানুষও তাই। প্রেম, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা — সবই রসের হিসাব। স্বার্থ ফুরোলে নামটাও মনে থাকে না।
তবু আরিফের কষ্ট হলো না। শুকনো পাতা ঝরে গিয়ে মাটিতে মিশে সার হয়। সে সারেই নতুন পাতা গজায়। সে ঠিক করল, সে সার হবে। যে ভালোবাসা ঝরে গেছে, সেই ভালোবাসা দিয়েই সে আরও দশটা বাচ্চার জীবন সবুজ করবে।
কারণ গাছ তো কখনো ঝরে যাওয়া পাতার জন্য শোক করে না। সে শুধু জানে, আবার বসন্ত আসবে।
কে কাকে হৃদয়ে রাখবে? হিসাবটা সহজ — যতক্ষণ রস আছে, ততক্ষণ পাতা আছে। রস ফুরোলে গাছও নিষ্ঠুর হয়। এটাই দুনিয়া। তবু কেউ কেউ শুকনো পাতা হয়েও মাটির জন্য সার হয়ে যায়। তাদের গল্প কেউ লেখে না, কিন্তু তাদের জন্যই বন বাঁচে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন