একটা অবলা জীবের জন্য
সে অনেক আগের কথা। রণজয় বাবু একবার তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে শহরে মেলা দেখতে গিয়েছিলেন। ছেলেমেয়েদের বায়না পূরন করতে করতে আর এটা সেটা কেনাকাটা করতে করতে রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল। মেলা শেষ করে যখন তারা বেরিয়ে আসছিলেন, রাত তখন প্রায় এগারোটা।
কিছুদূর যাওয়ার পর রাস্তার উপর একটা কুকুরের বাচ্চা তারা দেখতে পান। হলুদ- সাদা রঙের ডোরাকাটা,বাচ্চাটি রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র কোন একটা গাড়ি হয়তো এটাকে পার্শ্ব চাপা দিয়ে চলে গেছে। রণজয় বাবুরা চলে যাচ্ছিলেন কিন্তু হঠাৎ বাচ্চাটা একটু বড়ো করে চিৎকার করায় দিয়ার কেমন যেন দয়া হলো। দিয়া মানে রণজয় বাবুর মেয়ে। বয়স চার কিংবা পাঁচ বছর হবে। সে হঠাৎ সেখানে দাঁড়িয়ে পডলো, বাবাকে বললো,' বাবা, দেখো দেখো, কেমন সুন্দর ডোরাকাটা বাঘের বাচ্চা ঠিক যেন আমার বইয়ের ছবির মতো। কী সুন্দর বাচ্চা, আহারে! বেচারা।'
লাইটপোস্টের আলোতে বাচ্চাটিকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিল। রণজয় বাবু একটু নাড়াচাড়া করে দেখে বললেন,' মনে হচ্ছে, গাড়ি ধাক্কা মেরে ওর কোমর টা ভেঙ্গে দিয়েছে।' এই বলে তিনি দিয়াকে বললেন,' এটা একটা কুকুরের বাচ্চা, চলো এবার।'
বাচ্চাটা কষ্টে কাতরাচ্ছে দেখে দিয়ার খুব দয়া হলো। সে বাবাকে বললো, "বাবা আমরা এটাকে নিয়ে যাই। '
দিয়ার মা অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,' চলো এবার, খেয়েদেয়ে কাজ নেই, কুকুর বাচ্চা বাড়িতে নিয়ে যাবে।' তিনি তাতে রাজি হলেন না কিন্তু দিয়া জ্বেদ ধরে, ' একটা অবলা প্রাণী এইভাবে কষ্টে কাতরাচ্ছে আর আমরা মানুষ, সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হয়েও এটাকে এভাবে ফেলে যাবো,এটা কেমন কথা।' হাতের পুতুল ফেলে দিয়ে সে বলল,' বাবা, আমি আর কিছু চাই না কিন্তু এই বাচ্চাটাকে আমার চাই।' শেষ পর্যন্ত তার পীড়াপীড়িতে রণজয় বাবু মেয়েকে খুশি রাখতে বাধ্য হয়ে বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে যান।
রণজয় বাবু আর দিয়ার প্রচেষ্টায় অল্পদিনেই কুকুর বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে উঠলো। দিয়া আদর করে তার নাম রাখলো, মুক্তা' । দিয়া রোজই মুক্তাকে ভালো ভালো খাবার দেয় আর তার সাথে খেলাধুলা করে। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো।
একটা কুকুর, একটা অবলা প্রাণী, যে কতটুকু প্রভু ভক্ত হতে পারে তা মুক্তাকে না দেখলে কেউ অনুমানই করতে পারবে না।
দিনে দুপুরে কেউ যখন বাড়িতে থাকে না তখন মুক্তা একা একা বারান্দায় বসে থাকে। অন্য কোন প্রাণী এসে যে এবাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে পারবে তার কোন ইয়ত্তা নেই। প্রাণী তো দূরের কথা কোনো মানুষ ও ঘরের ধারে কাছে আসতে পারে না।
দিয়া রোজই মুক্তাকে নানাভাবে আদর করে আর কাজ কর্মের শিক্ষা দেয়। অল্পদিনেই সে এখান থেকে ওখানে কোন কিছু আনা নেওয়া ও ছোটখাটো আদেশ উপদেশ পালন করতে শিখে নেয়।
একদিন রণজয় বাবুর একটি ছাগল হেরে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছাগল টিকে আর পাওয়া গেল না। তিনি ছাগলটি পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এর তিনদিন পর হঠাৎ একদিন দেখা যায় মুক্তা কোথা থেকে রশিতে ধরে টেনে টেনে ছাগল টিকে নিয়ে আসছে।
######
তিন চার বছর পরের ঘটনা। একবার রণজয় বাবু সপরিবারে সমুদ্র তটে বেড়াতে যাবেন বলে বাড়িতে আলোচনা করেন। স্থির করেন মুক্তাকে বাড়িতে রেখে যাবেন। সে বাড়ি পাহারা দেবে। পাশের বাড়ির আন্টিকে দায়িত্ব দিয়ে যাবেন মুক্তাকে খাবার দেওয়ার জন্য। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে তারা মুক্তাকে সবকিছু বুঝিয়ে সমঝিয়ে রওয়ানা দিতে গিয়ে দেখেন মুক্তা তাদের আগেই গিয়ে গাড়িতে উঠে বসে পড়ে। মুক্তাকে তারা অনেক করে বোঝাতে চেষ্টা করেন কিন্তু কোন অবস্থাতেই তাকে রেখে তারা যেতে পারলেন না। শেষে রণজয় বাবু রাগ করে তার হাতের লাঠি দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দেন। মারের চোটে ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করতে করতে সরে যায়। তারা যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু ছয় ঘণ্টার রাস্তা অতিক্রম করে তারা যখন গাড়ি থেকে নামলেন, দেখেন মুক্তা সেখানে উপস্থিত। প্রথমে তাদের বিশ্বাসই হয়নি। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারেন সে তাদের গাড়ির পেছনে লটকে সঙ্গে এসে গেছে তারা টেরই পাননি।
তারা অদূরে গাড়ি রেখে সমুদ্র তটে বেড়াতে যান। অনেকদূর ঘোরাঘুরি করে তারা একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেন। ক্লান্তি আর সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়ায় রণজয় বাবুর চোখে ঘুম আসে। ফলে একটু রেস্ট নিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। দিয়া আর তার ছোট ভাই মুক্তাকে নিয়ে সেখানে দৌড়াদৌড়ি, ছোঁয়া ছুঁয়ি খেলা করতে থাকে। একসময় খেলতে খেলতে তারা কিছু দূরে চলে যায়। সেখানে পায়ে কাঁদা লেগে যাওয়ায় দিয়া জলে পা ধুতে যাবে অমনি একটা প্রকাণ্ড কুমির এসে তাকে ধরতে উদ্যত হয়। মুক্তা তখন দূর থেকে দেখছিল। সে দৌড়ে এসে কুমিরকে আক্রমণ করে। উভয়ের মধ্যে সেখানে অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি হয়। বারবার কুমির দিয়াকে ধরতে যায় আর বারবার মুক্তা দিয়াকে বাঁচাতে কুমিরকে আক্রমণ করে। চিৎকার চেঁচামেচি আর প্রাণপণ লড়াই করে মুক্তা দিয়াকে কুমিরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু কুমিরের সাথে দীর্ঘক্ষণ লড়াই করাতে তার সমস্ত দেহ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে শুরু করে। চিৎকার শুনে রণজয় বাবু দৌড়ে এসে সেখানে উপস্থিত হন। দিয়া কাঁদতে কাঁদতে তাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। ভাগ্যিস আজ যদি মুক্তা না থাকতো তাহলে দিয়াকে খুঁজে পাওয়া যেত না।
রণজয় বাবু সঙ্গে সঙ্গে তাদের সকলকে নিয়ে গাড়িতে উঠেন। মুক্তাকে নিয়ে তারা আগে হাসপাতালে যান। সেখানে অনেক চেষ্টা করেও ডাক্তার তাকে বাঁচাতে ব্যর্থ হন। অধিক রক্তক্ষরণে মুক্তা মারা যায়।
দিয়া হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। সে অভিযোগ করে বলে উঠলো,' হে ঈশ্বর! মুক্তাকে আমার জীবনে এনে দিলে কেন আর এনে দিলেই যদি তাহলে ফের কেড়ে নিলে কেন?'
দিয়ার আক্ষেপের শেষ নেই। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল বাবা,' ঐ কুমিরটা যদি আমাকে খেয়ে নিত তবুও ভালো ছিল। তবু আমার মুক্তা তো বেঁচে থাকতো।' মেয়েকে শান্তনা দেবার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন রণজয় বাবু। একটা অবলা জীব একটা মেয়ের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে যে এভাবে শেষ করে দিতে পারে তা তার স্বপ্নের ও অগোচর ছিল। তিনি মেয়েকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে অশ্রু মুছালেন। নিজের অজান্তেই একটা অবলা জীবের জন্য নিজের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বিষাদের অশ্রুধারা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন