কুমির ও কাঁকড়া ( ছোট গল্প)



সে অনেক আগের কথা। ধলেশ্বরী নদীর ঘাটে এক কুমির বাস করত। সেই নদীতে অনেক বড় বড় মাছ পাওয়া যেত। কুমির মনের আনন্দে মাছগুলো ধরে খেত আর পাশে নদীর ঘাটে গিয়ে বিশ্রাম নিত। সেই ঘাটে সে একা থাকত বলে খাবার কোন অভাব ছিল না। ফলে তার চেহারা ছিল খুব নাদুসনুদুস। প্রতিদিন দুপুর বেলা ক্লান্ত হয়ে সে ঘাটের পাশে যখন বিশ্রাম নিত তখন একটা কাঁকড়া তাকে দেখত এবং কখনো কখনো তার উচ্ছিষ্ট খাবার কাঁকড়াটা খেত। একদিন এভাবে ক্লান্ত হয়ে কুমির যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন কাঁকড়া লক্ষ্য করল দূর থেকে এক শিকারী এদিকে আসছে। দেখামাত্র কাঁকড়া চুপে চুপে গিয়ে কুমিরের কানের পাশে এক চিমটি কাটতেই কুমির জেগে উঠলো এবং কাঁকড়াটাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হল। সঙ্গে সঙ্গে কাঁকড়া জোড় হাত করে ক্ষমা চেয়ে বলল,' মহামান্য, আমি অনেক দিন থেকেই আপনার উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে আসছি। এজন্য আমি চির কৃতজ্ঞ। ওই যে দেখুন একজন শিকারী এদিকে আসছে, তাই আপনাকে রক্ষা করতেই আমি আপনাকে জাগানোর জন্য আপনার গায়ে চিমটি কেটেছি।' কুমির সঙ্গে সঙ্গে তাকে ক্ষমা করে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল। 
পরদিন যখন কুমির সেখানে আসল তখন কাঁকড়াকে পাশে ডেকে বললো,' যেহেতু সেদিন তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ , এখন থেকে তুমি আমার পরম বন্ধু। এই নাও তোমার জন্য খাবার এনেছি বলে সে বড় মাছের টুকরা এক খণ্ড তার দিকে এগিয়ে দিল।' কাঁকড়া মনের আনন্দে সেটা খেল এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। এই ভাবে প্রতিদিন কুমির বড় বড় মাছ ধরে সেখানে নিয়ে এসে খেত এবং কিছুটা কাঁকড়াকে দিত। কাঁকড়া সেটা খেয়ে আনন্দ প্রকাশ করত। অল্প দিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে গাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারা প্রতিদিন বালুচরে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করতো। অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে কুমিরের ঘুম পেলে সে ঘুমিয়ে পড়ত তখন কাঁকড়া পাশে বসে পাহারা দিত। 
সেই ঘাটে কয়েক দিন থেকে একটা কচ্ছপের আগমন ঘটে। সে দূর থেকে কুমির ও কাঁকড়ার আনন্দ দেখে হিংসায় জ্বলে। কিন্তু সাহস করে কুমিরের পাশে আসে না। সে মনে মনে ফন্দি আঁটে কিভাবে ঐ কাঁকড়াটাকে জব্দ করা যায়। 
নদীর ঘাটে একখণ্ড কাঠ ছিল। কচ্ছপ সেই কাঠ খণ্ডের নীচে ওঁত পেতে বসে থাকত কাকড়াটাকে ধরে খাবার জন্য। অনেক দিন থেকে এভাবেই চলছে কিন্তু সে সুযোগ পায়না। কুমির যখনই চলে যায় কাঁকড়া সঙ্গে সঙ্গে গর্তে ঢুকে যায়। 
কাঁকড়া একদিন তার বন্ধু কুমিরকে ঐ কচ্ছপের হিংসা এবং নিজের ভয়ের কথা বললে কুমির বলল, ' হিংসা করে কেউ কারো কোন ক্ষতি করতে পারে না। হিংসুক তার হিংসার ফল পাবেই। তাছাড়া আমি থাকতে কার এতবড় সাধ্য যে আমার বন্ধুকে খেয়ে ফেলবে। তুমি একটুও ভয় করোনা, আমি ব্যবস্থা করব। ' 
দিন গড়িয়ে যায়। কুমির ও কাঁকড়ার বন্ধুত্ব গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। কখনো কখনো কুমির কাঁকড়া পিঠে নিয়ে নদীর এপার ওপার ঘুরে বেড়ায়। তা দেখে কচ্ছপের সহ্য হয় না কিন্তু সে কাঁকড়া ধরার সুযোগও পায় না। 
আবার একদিন এক জেলে নদীর ঘাটে এসে কুমিরকে দেখতে পায়। তাকে দেখে কুমির নদীর জলে নেমে যায়। পরপর দু-তিন দিন কুমিরকে এভাবে দেখে জেলে তাকে ধরার চিন্তা করে।  একদিন সে খুব সন্তর্পণে জাল নিয়ে আসে। তখন কুমির ঘুমিয়ে ছিল। দূর থেকে কাঁকড়া জেলেকে দেখে কুমিরকে জাগিয়ে তোলে। সঙ্গে সঙ্গে কুমির কাঁকড়া কে পিঠে নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে সেই কাঠের টুকরোর পাশে ডুব দেয়। জেলে অমনি দৌড়ে গিয়ে কাঠের টুকরো ঘিরে জাল ফেলে। ইতিমধ্যে কুমির মাঝ নদীতে ভেসে ওঠে এবং দু বন্ধুতে মিলে খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করলো। কারণ তারা চেয়ে দেখল সেই কচ্ছপটি জালে ধরা পড়েছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়