অপয়া ( ছোট গল্প)
স্বামী দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর জাহেদা চার বছরের মেয়ে সানিয়াকে নিয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। সারা পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার মনে হচ্ছিল। স্বামীর বাড়িতে আদৌ সে থাকতে পারবে কিনা তা সে বুঝে উঠতে পারছিল না। কারণ এমনিতেই ননদ ও দুই দেওর কথায় কথায় তার সাথে ঝগড়া করতো। মেয়ের জন্মের পর থেকে শাশুড়িও তাকে সুনজরে দেখতেন না।
স্বামীর ক্রিয়া কর্ম যেদিন শেষ হয় সেদিন রাতে বাবা তার শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একেবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তখন শ্বশুর তাকে স্বান্তনা দিয়ে বলেছিলেন,' বেহাই সাব, ধৈর্য ধরুন, কাঁদবেন না। কে ভেবেছিল ছোট্ট একটা দূর্ঘটনায় ছেলে এভাবে অকালে চলে যাবে। আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আল্লাহর দেওয়া সব কিছুই আমার আছে। আপনার মেয়ে আর নাতনির কখনো কোন সমস্যা হবে না। এদের দায়িত্ব এখন আমার উপর।
বাবা সাজেদুর প্রথমে চেয়েছিলেন মেয়েকে কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে নিয়ে যাবেন কিন্তু বেয়াই সাহেব বললেন আপাতত সে এখানেই থাক, কয়েকদিন পর দেখা যাবে। সাজেদাও সে মুহূর্তে যেতে ঢায়নি।
স্বামী না থাকলে কি হলো বাড়ির শ্বশুর শাশুড়ি, দেবর ননদরা এখন তার প্রতি খুব ভালো ব্যবহার করতে লাগলো। বিশেষ করে ননদ সুহানার ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা গেলো। এর বিশেষ কারণও আছে। সে ইউনিভার্সিটিত পড়ছে। ফলে তার কাপড় ধোয়া, ইস্ত্রি করা এ সকল কাজ কর্ম সাজেদাই করে থাকে। সুহানার ভালোবাসা আর সহমর্মিতায় সে স্বামী হারানোর ব্যথা অল্প দিনের মধ্যেই ভুলে গেল এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলো।
দিন গড়িয়ে যায়। আরো দু'বছর পর সুহানার বিয়ে ঠিক হলো। এবার সে সদ্য ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছে। উপযুক্ত পাত্র, খুব উঁচু এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে, ওদিকে আবার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ওর সাথে তার বিয়ের আলাপ চলছে, সবাই খুব খুশি। বিয়ের দিন ক্ষণ ঠিক করতে পাত্র পক্ষের বাড়িতে যাওয়ার আয়োজন চলছে। স্থির করা হয়েছে দশটি মিষ্টির ডালা, দশ কার্টুন ফলমূল ও অন্যান্য সামগ্রী একটি ছোট গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হবে। পানের বাটার জন্য তাজমহল সাজানো হবে। বাড়ির অন্দর মহলে সবাই খুব খুশি হয়ে জিনিস পত্র সাজাচ্ছে। কিন্তু যেই মাত্র সাজেদা এসবের মধ্যে হাত লাগাতে চায় অমনি তার শাশুড়ি ও খালা, ফুফু শাশুড়িরা তাকে এসবের মধ্যে হাত লাগাতে বারন করে। প্রথমে সে কিছু টেরই পায়নি। কিন্ত সে যখন সুহানার ইউনিভার্সিটির ক্লাসমেট দুজন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পানের বাটার তাজমহল সাজাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে অমনি তার ফুফু শাশুড়ি এসে ওটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নেন। তিনি খুব রাগত স্বরে বললেন,' তুমি ওসবের মধ্যে হাত লাগাবে না।' সাজেদা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কানে এসে পৌঁছায়,' এই অপয়াকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। ওকে কোনো কিছুতে হাত লাগাতে দিও না।' সাজেদার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। চারিদিকে যেন অন্ধকার দেখতে লাগলো। অমনি চারপাশে ফিসফিস গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। 'ওর স্বামী নেই, সে তো অপয়া। ও যদি এসব স্পর্শ করে মেয়ের অমঙ্গল হবে।' বয়স্ক মহিলারা এ নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করল। পুরো বাড়ি জোড়ে এ নিয়ে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করে। কথাগুলো সাজেদাকে তীরের মত বিদ্ধ করলো। সে সম্বিত হারিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। পাশে থেকে কেউ একজন বললো,' আর কেঁদে লাভ কি? যা সত্য তা তো মেনে নিতে হবে।' কেউ বলছে,' অপয়ার মুখ দেখাও পাপ।' কেউ বলছে,' জানিনা কোন অশুভ সামনে আছে কি না। এই অপয়ার ছোঁয়া এসব ফেলে দেওয়াই ভালো হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত সাজেদা এখান থেকে সরে পড়লো। সে ঘরে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। মায়ের কান্না দেখে সানিয়াও কাঁদতে শুরু করলো। সে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করে,' মা তুমি কাঁদছো কেন? আমি কি দাদুর সঙ্গে যাবো না?' মা মেয়ের কথার কোন সদুত্তর দিতে পারে না। শুধু বলে,' না তোমার যাওয়া হবে না। '
ইতিমধ্যে সবকিছু প্রস্তুত করে তা নিয়ে তারা পাত্রের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো।
ওরা চলে যাওয়ার পর সুহানার সহপাঠীরা তার ভাবীকে অপয়া বলে যে অপমান করা হয়েছে তা তার কাছে তুলে ধরে এবং তার জন্য তারাও যে অত্যন্ত মর্মাহত এ কথা বলে তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানায়।
সুহানা ঘটনা জানতে পেরে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সাজেদার কাছে গিয়ে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা তিন জনই এই সব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে। সুহানা সোজা তার মা'কে গিয়ে আক্রমণ করে। তখন এ নিয়ে তার মা ও ঠাকুরমার সাথে একরকম ঝগড়া শুরু হয়। ঠাকুরমা রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রকাশ্যে অপয়া অসূচি বলে চিৎকার করে গালিগালাজ শুরু করেন। সুহানাও গলা সপ্তমে চড়িয়ে তার প্রতিবাদ করে বলে,' ভাবী যদি অপয়া হয় তাহলে ঠাকুরমা, তুমিও তো অপয়া।' কথা শুনে ঘরের ভেতরে বয়স্ক মহিলার যারা ছিল সবাই বেরিয়ে আসলো। তার ফুফু, খালা এরা সবাই ঠাকুরমার সঙ্গে যোগ দিল। একটা হুলস্থুল পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সুহানা ও তার ক্লাসমেট দুজন একদিকে আর বাকি সবাই একদিকে। তর্কবিতর্কের মাঝে সুহানা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল তার ভাবী জাহেদা স্বামী না থাকায় যদি অপয়া হয় তাহলে এখানে উপস্থিত বয়স্ক সকল মহিলাই তো অপয়া। কারণ এরাও তো সবাই বিধবা। জাহেদা রাগে গজগজ করে বলেই চললো,' পৃথিবীতে কেউ তো আর অমর নয়। আগেপিছে একদিন তো সবাইকে মৃত্যুর মুখ দেখতে হবে। কেউ স্বামী হারা হবে আর কেউ স্ত্রী হারা হবে। তাহলে একদিন তো সবাই অপয়া হয়।' শেষ পর্যন্ত সবাই মাথা নিচু করে স্বীকার করে নিল এটা একটা কুসংস্কার। সুহানা দের জয় হলো। জাহেদাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন