পরহিত তরে (ছোট গল্প)
সে অনেক আগের কথা। ঘোর জঙ্গলে এক কুঠিরে অনেক সাঙ্গপাঙ্গ ও শিষ্য সহ এক সাধুর আশ্রম ছিল। অনেক দূর দূরান্ত থেকে রোজই শত শত রোগী সাধুর কাছে আসত এবং সাধুর তন্ত্রমন্ত্র ও কবিরাজি জড়িবুটি ঔষধ নিয়ে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরত। অতি জটিল রোগীও তার সেবায় ভালো হয়ে উঠতো। যারাই আসতো অনেক ভালো ভালো ফলমূল ও উপহার সামগ্রী নিয়ে আসতো। সাধুর কুঠিরে অনেকেই এসে ভালো হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সেখানে থেকেও যেতেন। দেখতে দেখতে সেই জঙ্গলে অনেক স্বর্ণ কুঠির গড়ে উঠলো। অতি অল্প দিনের মধ্যেই এ খবর দেশ দেশান্তরে পৌঁছে গেল এবং মানুষের আনাগোনা দিন দিন বাড়তে লাগলো। এখানে যারাই যা দান করত সাধু তা তার ভক্ত ও গরীব দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। সাধুর ঐশ্বর্য এবং তাঁর পরহিতে তা সমর্পণ করার কথা কারো অজানা রইল না।
শহরের নামকরা দুজন চোর নবকান্ত ও লালুকান্ত এ খবর পেয়ে রোগী সেজে ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হল। সাধু দিব্যদর্শনে তাদের মনোভাব বুঝতে পারলেন তবুও তিনি তাদের সমাদর করে আপ্যায়ন করলেন এবং সেখানে আশ্রয় দিলেন। তারাও সাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সেখানে থাকতে মত প্রকাশ করল।
সেদিন রাতের অনুষ্ঠানে সাধু দুজন চোরকে দীক্ষা দিয়ে অন্যান্য শিষ্যদের সাথে থাকার পরামর্শ দিলেন। একজন শিষ্য তাদেরকে কুঠিরের নিয়ম কানুন ও দৈনন্দিন রুটিন বুঝিয়ে দিল। এখানে সকল শিষ্য ও অতিথিদের সমান মর্যাদা প্রদান করা হয়। সাধুর কুঠিরের সকল রুমে সকলের সমান প্রবেশাধিকার। এখানে গোপনীয়তা বলে কিছু নেই।
সেদিন রাতে সাধুর স্বর্ণ খচিত কুঠিরে দুই চোর সারারাত জেগে ঘুরে ফিরে সব দেখল। যতই দেখে ততই যেন নেশা লাগে আর ততই তারা অবাক হয়ে ভাবতে থাকে। সাধুর এত ঐশ্বর্য এবং তিনি যে এত উদাসীন। যে কোন সময় যে কেউ ইচ্ছা করলে লক্ষ লক্ষ টাকার স্বর্ণ মুদ্রা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। এমন খোলামেলা সম্পদ ভাণ্ডার যে পৃথিবীতে আছে তা তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি।
নবকান্তের দেরি যেন আর সয় না। সেদিনই সে সব সম্পদ চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে কিন্তু লালুকান্ত তাকে বাধা দেয়। সে বলে," একটু ধৈর্য ধর, আমরা সবার বিশ্বাসী হয়ে উঠি। এমন সুযোগ আমরা রোজই পাবো।"
দিন গড়িয়ে যায়। রুটিন মাফিক চলাফেরা আর আশ্রমে ভালো ভালো খাবার আর ভালো ব্যবহার দুজন চোরের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসলো। চুরির কথা তাদের মাথা থেকে একেবারে সরে গেল। এমন সময় একদিন এক রাজপুত্র এক রাজকন্যাকে নিয়ে সাধুর আশ্রমে এসে তাঁকে এক লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রা উপহার দিয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করল এবং সাধু তাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করালেন। সেদিন রাতে নবকান্তের মনোভাব বুঝতে পেরে সাধু তাদের দু'জনকে পাশে ডেকে তাদের পারিবারিক জীবনের খবরাখবর নেন এবং যেহেতু তাদের বাড়িতে ঘর সংসার বা ছেলে মেয়ে আছে, আগামী মাস থেকে তাদের জন্য মাসিক মাথাপিছু দুই হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানিয়ে দেন। কারণ যারা এখানে জনসেবা করবে তাদের সংসারের দায়িত্ব ভার বহন করা সাধুর এবং তাদের সবার কর্তব্য। তিনি বলেন জীবনে যা' ই কর পরহিতে কর। জনসেবাই ভগবত সেবা। তিনি আরো বলেন,' সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।' কিন্তু এতদ সত্বেও সেদিন গভীর রাতে নবকান্ত চুরির উত্তেজনায় লালুকান্তের সঙ্গে একরকম ঝগড়া করে তাকে রাজি করতে না পারায় নিজে একা চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে এক বস্তা স্বর্ণ মুদ্রা ও টাকা নিয়ে পলায়ন করে।
পরদিন নবকান্ত চুরি করা সামগ্রী বিক্রি করার জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। সে যেখানেই যায় ওগুলো বিক্রি করার জন্য সেখানেই সেগুলো নকল বলে কেউ কিনতে রাজি হল না। একজন সোনার দোকানদার উল্টে তাকে ধমক দিয়ে বলল এতসব নকল সোনা বহন করার জন্য ধরা পড়লে তার জেল পর্যন্ত হতে পারে। অগত্যা সে বাধ্য হয়ে সাধুর কাছে ফিরে গিয়ে আত্ম সমর্পণ করার চিন্তা করতে লাগল। সে ভাবল যেহেতু স্বর্ণ মুদ্রা গুলো নকল, ওগুলো সাধুকে ফেরত দিয়ে বলবে যে মানুষগুলো তাঁকে নকল মুদ্রা দিয়ে ঠকাচ্ছে। আর তাতে সে আবার সাধুর বিশ্বাস ভাজন হয়ে আবার সেখানে থাকার সুযোগ পাবে। কিন্তু এখন সে এক নতুন সমস্যায় পড়ে ভাবতে লাগল , কিভাবে সে ফেরত যাবে কারণ সে জানে,' চুরি করা যেমন সহজ, আত্ম সমর্পণ করে চুরি করা সামগ্রী ফেরত দেওয়া তার চেয়ে অনেক কঠিন।'
ওদিকে সাধু দিব্যদর্শনে নবকান্তের মনের ভাব বুঝতে পেরে লালুকান্তকে বলে পাঠালেন তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। লালুকান্ত আসামাত্র নবকান্ত চুরির সামগ্রী সহ সাধুর কাছে ফিরে গিয়ে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আজীবন তাঁর সেবার সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। সাধু নবকান্তকে ক্ষমা করে দিলেন। দুই চোরকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে পেরে সাধুও নিজের জীবন ধন্য মনে করলেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন