দীপ মালা (ছোট গল্প) -পূর্ব প্রকাশিতের পর
দীপ বলেই চলল,' দাদু আমাকে আরও বলেছেন 'আমাদের জীবটাও নাকি ঐ ঘুড়ির মতো। আমি যেভাবে ইচ্ছে মত এটাকে ঘুরাচ্ছি আবার নাটাই টানলে যে ভাবে ঘুড়ি হাতের মুঠোয় চলে আসে ঠিক এভাবেই আমাদেরকেও ঈশ্বর নাকি ঘুরাচ্ছেন। সব মানুষই এক একটা ঘুড়ি আর তার নাটাই ঈশ্বরের হাতে। তিনি আমাদেরকে এ পৃথিবীতে অবাধে ঘুরার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন আবার যখনই নাটাই টান দিবেন তখনই আমাদের চলে যেতে হবে। ' মালা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ,' ঈশ্বর কোথায় বসে আমাদের ঘুরাচ্ছেন, তাঁকে তো আমরা দেখি না।' দীপ বলল,' ঈশ্বর তো অদৃশ্য এজন্য আমরা দেখিনা। কিন্তু তিনি ঠিক আমাদের দেখতে পাচ্ছেন। তিনি যখনই তাঁর হাতের নাটাই টানবেন, আমাদের এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।'
এবার দীপ মালাকে বলল ,' এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঘুড়িকে নামিয়ে আনতে হবে। চল আমরা ঘুড়ি নামানোর গান গাই। এই বলে সে গান ধরলো,'
' আয় ঘুড়ি ফিরে আয়
ঘুরেছিস বেশ,
আমার কাছে ফিরে আয়
আয়ু তোর শেষ।'
মালাও তার সাথে গান ধরলো। দু'জনে গান গাইতে গাইতে দীপ নাটাইয়ে সুতাগুলো গুছিয়ে নিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুড়িটা হাতের মুঠোয় চলে এল এবং তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল।
সন্ধ্যার সময় মালা অল্পক্ষণ স্কুলের পড়া শেষ করে আবার দীপের সাথে শিক্ষকতার খেলা শুরু করে দিল। হাতে একটা বেত নিয়ে সে দীপকে অক্ষর শেখাতে শুরু করে। এভাবে খুব আনন্দের মধ্যেই তাদের দিন কাটছিল। ইতিমধ্যে দীপ অক্ষর শিখে শব্দ গঠন করতে শিখে নিয়েছে। এখন সে নিজের নাম ধামও লিখতে পারে।
####
অল্প কয়েক দিন পরের ঘটনা। একদিন তারা আকাশে ঘুড়ি উড়াচ্ছিল। হঠাৎ চারদিক অন্ধকার করে দমকা হাওয়া বইতে লাগলো। অবস্থা বেগতিক দেখে দীপ মালাকে বলল,' বোধহয় বৃষ্টি আসবে, এবার ঘুড়ি নামাতে হবে।' সে খুব তাড়াতাড়ি নাটাই চালাতে লাগল। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করেও সে ঘুড়ি নামানোর আগেই ঝড়োহাওয়া শুরু হয়ে গেল আর সঙ্গে হালকা বৃষ্টি। মুহূর্তের মধ্যেই ঝড়ের তীব্র বেগে তার ঘুড়ি সুতো ছিঁড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। মালা ভয়ে কাঁদতে শুরু করল। এবার ঘুড়ির আশা ছেড়ে দিয়ে তারা বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করল। ঝড়ের ঝাপটায় মালা একবার মাটিতে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক আঘাত পেল। কোন ক্রমে তারা বাড়িতে পৌঁছতেই মা দৌড়ে এগিয়ে এসে মালাকে ধরে নিয়ে গেলেন। চেয়ে দেখেন তার মাথা ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরছে। মালার অবস্থা বেগতিক দেখে ধীরাজবাবু হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে খুব বকুনি করেন এবং দীপকে সজোরে দু-তিন থাপ্পড় দিয়ে তাকে পুলিশে দেওয়ার হুমকি দিলেন। দীপ কাঁদতে কাঁদতে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেল।
বৃষ্টি থামলে তারা মালাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেলেন। সেখানে ডাক্তার দেখলেন তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। মাথায় হয়তো পাথর জাতীয় কিছুর আঘাত। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় কয়েকটি সেলাই দিয়ে ব্যাণ্ডেজ করে দিলেন এবং কিছু ঔষধ লিখে দিলেন। ধীরাজবাবু ঔষধ নিয়ে মালা সমেত বাড়ি ফিরলেন।
বাড়িতে পৌঁছে তিনি দীপকে ডাকাডাকি করে অনেক খুঁজলেন কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না। সেদিন রাতে মালা জ্বরে আক্রান্ত হল এবং তা ক্রমেই বাড়তে লাগলো। অনেক দুশ্চিন্তা আর দুর্ভাবনায় সারা রাত তাদের ঘুম হয়নি।
পরদিন সকাল পর্যন্ত দীপের কোন সন্ধান না পেয়ে তিনি স্থির করলেন ঘটনাটা পুলিশে জানাতে হবে।
এদিকে মালার জ্বর ক্রমশ বেড়েই চলছে। সে ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকতে শুরু করেছে,' মা দীপ কোথায় গেল, ওকে তোমরা মেরো না। ওর কোন দোষ নেই। মা আমাদের ঘুড়ি কি আর ফিরে আসবে না? ঐতো ঐতো উড়ছে, ঐ--- তারার সাথে মিশে গেছে। দীপ তুমি তো বললে নাটাই টানলে আসবে কিন্তু নাটাই তো তোমার হাতে। ঘুড়ি আসছে না কেন?' মা পাশে বসে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। তিনি কাপড় ভিজিয়ে ওর মাথায় জলের পট্টি দিতে দিতে স্বামীকে বললেন,' ওগো আমাদের মালার কি হল, কিছু একটা কর?' তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন,' কোথাকার ঐ বদমাইশ ছোঁড়াটাকে আমি তখনই বাড়ি আনতে বারণ করেছিলাম। এখন তাকেই বা কোথায় গিয়ে খুঁজি। যদি ঐসময় আমরা একে না আনতাম তাহলে আজ এতসব ঝামেলায় পড়তে হতো না।'
এদিকে মালা প্রলাপ বকেই চলছে। ,' মা দীপ আসছে না কেন।' মা বললেন,' দীপকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ও বোধ হয় পালিয়ে গেছে। '
মালা বলল ,' ও যাবে না মা, ওর হাতে নাটাই আছে। ও ঠিকই আমাদের ঘুড়িটাকে নিয়ে আসবে।'
ইতিমধ্যে ধীরাজবাবু ঘটনাটা থানায় জানালেন এবং আসার পথে আবার ডাক্তার নিয়ে আসলেন।
ডাক্তার এসে ওর মাথায় হাত দিতেই সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,' দীপ এসেছিস, হাঁ আমি জানতাম তুমি ঠিক ঘুড়িটা নিয়ে আসবে।'
ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন,' ওঃ মাই গড্, এ কী অবস্থা, ওর নিউমোনিয়া হয়ে গেছে। ঔষধগুলো খাওয়ান, দেখা যাক কি হয়।'
ঔষধ খাওয়ালেন মালা কিছুক্ষণের জন্য নীরব হল। কিন্তু সেদিন রাতে তার অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগল। সে ঘুমের ঘোরে বকেই চলছে,' মা দীপ কোথায়? মা -- , বাবা, তোমরা ওকে মেরো না, ওর কোন দোষ নেই।'
আচ্ছা মা, দীপ বলেছে ঈশ্বর নাকি নাটাই হাতে আমাদের ঘুরাচ্ছেন। ঈশ্বর নাটাই টানলে আমাদেরও নাকি চলে যেতে হবে। তা কি সত্যি মা, তাহলে কি ঈশ্বর আমার ঘোরা শেষ করে দিয়েছেন? আমাকে কি এখন টেনে নিয়ে যাবেন? না না, আমি যাবো না মা।'
'আচ্ছা মা, দীপ আসছে না কেন? ওকে কি ঈশ্বর টেনে নিয়ে গেলেন?'
'হাঁ তাইতো। আমাকেও বুঝি ডাকছেন?' মালা করুন স্বরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় দীপের শেখানো সে গানটি গাইতে লাগলো।
' আয় ঘু- -ঘুড়ি ফি--ফিরে আয়
ঘু - ঘুরে - ঘুরেছিস -- বে - বেশ,
আমার কা-আ- কাছে ফি- ফিরে আয়
আয় আ - আয়ু - তো- তো - তোর ---শে -ষ।'
কথা বলতে বলতে মালা নিস্তেজ হয়ে গেল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন