দীপ মালা (ছোট গল্প) প্রথম পর্ব
ধীরাজবাবু একবার সস্ত্রীক পুরী যাত্রা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। সঙ্গে তাদের একমাত্র মেয়ে মালা। তখন তার বয়স মাত্র ছয় কিংবা সাত। ধীরাজবাবু ট্রেনে বসে বসে ঝিমোচ্ছিলেন এমন সময় একটা ছেলে ট্রেনের কামরায় এদিক থেকে সেদিকে যাওয়ার পথে ধীরাজবাবুর মুখোমুখি হলে তিনি চোর ভেবে প্রশ্ন করলেন,' কি চাই?' ছেলেটি মুখ কাচুমাচু করে বলল ,' বাবু, একটু কাজের সন্ধান করছি। আপনার কি কাজের ছেলে লাগবে?' পরনে ছেড়া ময়লা পোষাক কিন্তু কথাবার্তায় বেশ মার্জিত বলেই মনে হল। তিনি বললেন,' তোমাকে তো দেখতে খুব ভালো ঘরের ছেলে বলেই মনে হয়। কিন্তু --
কথা শেষ করার আগেই তাঁর স্ত্রী মাতঙ্গীনির বুঝি একটু দয়া হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,' তোমার নাম কি, বাড়ি কোথায়? তোমার কি কেউ নেই?' ছেলেটি বলল,' আমার নাম দীপ। আমি আগে এখানে এক বাবুর বাসায় কাজ করতাম। উনার ট্রেন্সফার হয়ে গেছে তাই আমি এখন নিরুপায় হয়ে কাজের সন্ধান করছি। ছেলেটির কথা শুনে মাতঙ্গীনির আরও একটু দয়া হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,' তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে? মালার সঙ্গে খেলবে আর আমাকে ঘরের কাজে একটু সাহায্য করবে। বাসন মাজা কাপড় কাচা এগুলো কাজ পারবে তো? দীপের ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা দেখা গেল। সে বলল,' হাঁ, মাসিমা পারবো।' ' তোমাকে মাসে কত দিতে হবে? সে বলল,' 'আমাকে দুবেলা দুমুঠো খাবার দেবেন আর বেতন হিসেবে আপনারা যা দেবেন তাতেই আমার হবে।'
ধীরাজবাবু চোখ বড়বড় করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ইশারায় ওকে না করলেন। তিনি বললেন,' না জেনে না বুঝে কোথাকার অপরিচিত ছেলে, চোর ওতো হতে পারে।'
অমনি তার মেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,' ঠিক আছে মা, খুব ভালো হয়েছে, আমি দীপের সাথে খেলা করব।'
ব্যাপারটা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হলেও শেষ পর্যন্ত মাতঙ্গীনি দেবী জয়লাভ করলেন। সিদ্ধান্ত হল দীপকে তারা সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
বাড়িতে পৌঁছে মাতঙ্গীনি দেবী দীপকে কিছু কাজ কর্ম বুঝিয়ে দিলেন এবং বাকি সময় তার মেয়ে মালার সাথে খেলা করবে। এর বিনিময়ে তাকে মাসে পাঁচশত টাকা বেতন হিসেবে দেবেন বলে জানিয়ে দিলেন।
নতুন বন্ধু পেয়ে মালার তো খুশীর সীমা নেই। সে স্কুল থেকে এসেই সারা দিন দীপের সাথে খেলা করে। দীপ লেখা পড়া জানে না, তাই রাতের বেলা বেত হাতে নিয়ে সে দীপের শিক্ষক হয়ে তাকে পড়াতে বসে। প্রথম দিনেই সে দীপকে কয়েকটি বর্ণ পরিচয় করিয়ে দেয়। পড়া শেষ হলে দুজন খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়ে দীপ মালাকে গল্প শোনায়। এই ভাবেই তাদের দিন চলতে থাকে।
অল্প দিনের মধ্যেই দীপের সাথে মালার বন্ধুত্ব এমন হল যে এক মুহুর্ত ওকে ছাড়া তার চলে না। বাসন মাজা , কাপড় কাচা ইত্যাদি কোন কাজেরই দীপের এখন আর সময় নেই। মালা এসে মাকে বলে," কাজ গুলো তুমি করে নাও মা, দীপকে ছেড়ে দাও, আমরা খেলবো।'
মা-বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে। তাই সবসময় ওর খুশিতেই তাদের খুশি। ফলে দীপ এখন হয়ে উঠলো মালার সর্বক্ষণের সঙ্গী। ঘরের সমস্ত কাজকর্ম এখন মা নিজেই করেন। তারা দুজন তো এখন শুধু খেলা আর গল্প গুজব নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
একদিন গল্প করতে করতে দীপ মালাকে ঘুড়ির গল্প শোনাল। ঘুড়ি কি জিনিষ মালা কোন দিন দেখেওনি শোনেওনি। দীপের কাছে ঘুড়ির গল্প শোনে সে তা দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। রোজ ই দীপকে সে ঘুড়ির কথা বলে। দীপ তখন ঘুড়ি বানানোর জন্য কাগজ আর সুতার প্রয়োজন একথা বলে আর বাঁশ দিয়ে শলা আর নাটাই প্রস্তুত করে। সে বলল মামাকে দিয়ে কাগজ আর সুতা আনাতে হবে।
ইতিমধ্যে পূজোর সামনে একদিন তারা মালার বাবার সঙ্গে বাজারে গেল। মালা নিজ পছন্দ মতো নিজের এবং দীপের জন্য পোশাক কিনল। বাজার থেকে ফেরার সময় মালা বাবাকে দিয়ে ঘুড়ির জন্য কাগজ আর সুতা কিনল। মালার আনন্দ আর ধরে না। সে দিন রাতেই তারা ঘুড়ি প্রস্তুত করল আর নাটাইয়ে সুতা সংযোগ করে রাখল। মালার আগ্রহ আর আনন্দের যেন শেষ নেই। কিভাবে ঘুড়ি আকাশে উড়ে তা এক্ষুনি দেখতে চায়। দীপ তাকে বলল,' রাতের অন্ধকারে ঘুড়ি পথ দেখবে না, তাই পরদিন বিকেলে সে স্কুল থেকে আসার পর তারা ঘুড়ি উড়াবে।' অতঃপর মা তাদের দু'জনকে খাবার দিলে দুজন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে দীপ মালাকে ঘুড়ি উড়ানোর অনেক গল্প শোনাল। কিভাবে ঘুড়ি ঘুড়ি খেলা হয়, কি ভাবে একবার সে এক বন্ধুর ঘুড়ি সুতা দিয়ে কেটেছিল এবং আকাশে তা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এসব গল্প করতে করতে দুজন ঘুমিয়ে পড়ল।
#####
পরদিন মালা স্কুল থেকে আসার পর তারা ঘুড়ি নিয়ে মাঠে উড়াতে গেল। দীপ মালাকে শিখিয়ে দিল কিভাবে ঘুড়ি উড়াতে হয়। এরপর দুজন মিলে ঘুড়ি আকাশে উড়াল। মালার যেন আনন্দের সীমা নেই। দীপ নাটাইয়ের সমস্ত সুতা ছাড়তে ছাড়তে সুর করে বলতে লাগল,
' যাও ঘুড়ি উড়ে যাও
নীল আকাশের পরে,
আসবে ফিরে যখন তোমায়
টানবো নাটাই ধরে।'
মালাও তার সঙ্গে সুর করে গানটি গাইতে লাগলো।
দুজনের গানে যেন আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে আর ঘুড়িও ছুটতে থাকে। এক সময় হাওয়ায় ভর করে তাদের ঘুড়ি একেবারে ঊর্ধাকাশে উঠে গেল।
দীপ মালাকে বলল,' দেখবে ঘুড়িটা উপরে উঠে গিয়ে পাখি হয়ে যাবে।' মালা চেয়ে দেখল, সত্যিই তো ঘুড়িটা পাখি হয়ে গেছে। সে বই'য়ে চিল পাখি দেখেছিল। আনন্দে চিৎকার করে উঠল,' কি মজা, কি মজা ঘুড়িটা চিল পাখি হয়ে গেছে। একেক সময় ঘুড়িটা চোখের সীমা অতিক্রম করে অদৃশ্য হয়ে যায়। মালা তখন ভয়ে চিৎকার করে উঠে, আমাদের ঘুড়ি কি আর ফিরে আসবে না? ' দীপ বলল,' এই যে আমার হাতে নাটাই আছে। আমি ঠিক ওকে আবার টেনে আমার হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসব।' সে মালাকে বলল,' তুমি দেখবে, এখন আমি এই ঘুড়িটাকে তারকারাজ্যে প্রবেশ করাব। তারপর এটা অদৃশ্য হয়ে তারকার সঙ্গে মিশে যাবে। আবার আমি যখন ডাক দেব তখন সে ফিরে আসবে।' এভাবে তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুড়ি উড়ালো। এদিক থেকে ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে দীপ ঘুড়িটাকে ঘুরাতে ঘুরাতে মালাকে বলল,' তুমি ভয় পেয়ো না, যখন ই আমি চাইবো তখনই আবার এটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসব।'
মালা দীপকে জিজ্ঞেস করল,' ঘুড়ি উড়ানো প্রথমে কে আবিষ্কার করেন?' দীপ উত্তর দিল,' খ্রিস্টাপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক মোজি প্রথম ঘুড়ি নির্মাণ করেছিলেন। এরপর ভারত জাপান ইত্যাদি দেশে ঘুড়ি উড়ানো শুরু হয়। অতঃপর এই ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের চিন্তা ভাবনা করে এবং তা থেকেই এরোপ্লেন আবিষ্কারের পথ সুগম হয়। তুমি কি জানো,' রাইট ব্রাদার্স এই ঘুড়ির ধারণা থেকেই এরোপ্লেন আবিষ্কার করেন।' মালা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,' তুমি এতসব কোথা থেকে জানলে?' সে বলল,' আমার দাদু আমাকে এসব বলেছেন। '
' তুমি কি জানো,এটা একটা বিনোদন মূলক খেলা। অতীত কালে রাজা বাদশাহরা এই খেলা খেলতো। পরবর্তী কালে এই খেলাটি অনেক দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৮৯সনে গুজরাটে প্রথম আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। আর তখন থেকেই প্রতি বছর ১৪/ ১৫ জানুয়ারি তারিখের মকর সংক্রান্তিতে ভারতের আহমেদাবাদে ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করা হয়। এটাকে পতঙ্গ উৎসবও বলা হয়। চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এতে অংশ গ্রহণ করতে আসে। এজন্য আহমেদাবাদকে ঘুড়ির রাজধানী বলা হয়।'
### (ক্রমশ)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন