প্রভুভক্তি ( ছোট গল্প)



সেদিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে মদন পথের ধারে অদ্ভুত আকারের এক কুকুরের বাচ্চা দেখতে পেল। বাচ্চাটির সমস্ত শরীর ভেজা। ঠাণ্ডায় জড়োসড়ো হয়ে আগাছার আড়ালে লুকিয়ে বসে কাঁপছে। একদিকে কার্তিক মাসের শীতের রাত তার উপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া বইছিল। বাচ্চাটিকে দেখে মদনের দয়া হল। এত সুন্দর হৃষ্টপুষ্ট এবং লেজটা অনেক বড়। মদন অবাক হয়ে ভাবল এটা হয়তো বিরল কোন প্রজাতির কুকুর। কিন্তু এটা এলই বা কোথা থেকে? ভাবতে ভাবতে সে আদর করে এটাকে তুলে বাসায় নিয়ে গেল। কতক্ষন আগুনের পাশে রেখে এটাকে একটু চাঙ্গা করার চেষ্টা করল। তারপর একটি বাটিতে খাবার এনে দিল। কিন্তু খাওয়া তো দূরের কথা ও পালাবার চেষ্টা করতে লাগল। বারবার এরকম করায় মদন একে নোঙর এনে বেঁধে রাখল। 
বাড়িতে তার আগে থেকেই একটা কুকুর ছিল। এটাকে সে মতি বলে ডাকত। মতি ইতিমধ্যেই পাশে এসে ঘেউ ঘেউ করে ডাক শুরু করল এবং এটাকে মারতে উদ্যত হল। মদন তাকে ধমক দিয়ে বলল, ' এই এটা তোর নতুন বন্ধু, এর সঙ্গে খেলা ধুলা করবি,  ভালো ভাবে দেখা শুনা করবি। যদি দুষ্টুমি করে পালিয়ে যেতে চায় ধরে রাখবি। আজ থেকে এর নাম মুক্তা এবং এর দেখভালের দায়িত্ব তোর।'
        হতে পারে অবলা জীব। কিন্তু মনিবের প্রত্যেকটা কথাই তারা বুঝতে পারল। বিশেষ করে মতি দীর্ঘ তিন বছর থেকে এবাড়িতেই আছে। মদন তাকে অত্যন্ত স্নেহ করে। এবার এই নতুন অতিথির জন্য তার একটু খারাপ লাগল। কারণ সে দেখেই বুঝতে পারল এটা একটা শেয়ালের বাচ্চা কিন্তু তার মনিব একে চিনতে ভুল করেছেন। কিন্তু এ কথাটি তার মনিবকে বুঝানোর কোন উপায় নেই। তাছাড়া সে বুঝতে পারল এবার মনিবের তার প্রতি যে ভালোবাসা সেটা এখন দুভাগ হয়ে যাবে। এজন্য মুক্তার প্রতি তার খুব হিংসা হল কিন্তু কিছু করার নেই। উল্টে তার উপর একে দেখভালের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 
মতি অত্যন্ত প্রভু ভক্ত। তাই মনিবের কথা মত সে মুক্তাকে দেখভাল করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে চলাফেরা খেলা ধুলা করে ।
পরদিন মদন মুক্তাকে নোঙর খুলে খাবার দিল কিন্তু ছাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে পালানোর চেষ্টা করে তখন মতি ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করে তাকে আগলে রেখেছে। তা দেখে মদন বুঝতে পারল মতির প্রহরা থেকে মুক্তা আর কখনো পালাতে পারবে না। হলও তাই, সেদিন রাতে এক ঝাঁক শেয়াল এসে তাদের বাচ্চাটাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু মতির চিৎকারে লোকজন জমা হয়ে যায় তখন ওরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে।
ঐদিন রাতে মতি মুক্তাকে বলল,' দেখ, তুমি একটা শেয়ালের বাচ্চা, আমার মনিব তোমাকে ভাল প্রজাতির কুকুরের বাচ্চা মনে করে লালন পালন করছেন। তুমি কোন দিন ভুলেও এ বাড়ির কোন ক্ষতি করবে না, কোন ছাগল মোরগ খাওয়ার চেষ্টা করবে না। আমার মত প্রভু ভক্ত হয়ে থাকবে। আর কখনো এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবে না কারণ তোকে দেখভালের দায়িত্ব এখন আমার উপর। মুক্তা নিরুপায় হয়ে সায় দিল। অতঃপর তাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। একসাথে চলাফেরা, খাওয়া দাওয়া, খেলা ধুলা। অল্প দিনের মধ্যেই এ সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠল। এখন আর একে অপরকে ছেড়ে থাকার কথা চিন্তাই করতে পারে না।
দিন গড়িয়ে যায়। একদিন রাতে দু বন্ধুতে একান্ত নিরিবিলে একে অন্যের জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করল। একথাও কেউ কাউকে বলতে বাকি রাখলনা যে বংশপরম্পরায় জাতিগত ভাবে তারা একে অন্যের শত্রু। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে যে ভালোবাসার বন্ধন গড়ে উঠেছে তা জীবনেও ম্লান হবে না।
কথা বলতে বলতে প্রসঙ্গ ক্রমে মুক্তা মতিকে বলল,' আচ্ছা বন্ধু বলতো, তুমি আমাকে বেশি ভালবাস না মনিবকে।'
মতি বলল,' কি যে বল তুমি, কোথায় তুমি আর কোথায় মনিব। তোমার জন্য আমি প্রাণ দিতে পারি। ' 
তখন মুক্তা বলল,' তাহলে কাল বিকেলে যখন কেউ বাড়িতে থাকবেন না তখন আমরা দুবন্ধু মিলে ঐ লাল বড় মোরগটা খেয়ে ফেলব।' মতি একথা বলা মাত্র ঘাবড়ে গেল।সে বলল,'  অসম্ভব। এতবড় হারামি আমি করতে পারবনা। মনিব তো আমাদের খাবার দিচ্ছে, এত আদর যত্ন করছে।' 
মুক্তা বলল,' তোমার সাথে আমার এত ভালোবাসা, আর এই সামান্য চাওয়া --- । তাছাড়া খাব তো দুজন মিলে '  এ নিয়ে দু'বন্ধুর  মধ্যে প্রথমে কিছু কথা কাটাকাটি হলেও শেষে দুজন একমত হল এবং সিদ্ধান্ত অনুসারে পরদিন বিকালে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে দু'বন্ধু মিলে বড় মোরগটা খেয়ে ফেলল। 
সন্ধ্যায় মদন বাড়িতে ফিরে এসে দেখল তার বড় মোরগটা পাওয়া যাচ্ছে না। সে মতি মতি ডাকতেই হন্তদন্ত হয়ে মতি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো তার পেছনে পেছনে মুক্তা। তখনো তাদের মুখে রক্তের দাগ। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে মোরগের পলক। তার বুঝতে বাকি রইল না যে ওরাই তার মোরগটা খেয়েছে। মদনের খুব দুঃখ হল। সে বলল,' হারামজাদা বেইমান, এত বড় বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারলি? তোকে আমি নিজে নাখেয়েও খাইয়েছি।' বলে হাতের লাঠি দিয়ে মতি আর মুক্তাকে কয়েক ঘা দিতেই মতি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ দিয়ে অজস্র জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। যেন মনে হল মাফি চাইছে। আর মুক্তা কয়েক ঘা খেয়ে দূরে সরে পড়ল।
সেদিন সারারাত মতি ক্রন্দন করে কাটিয়েছে। একসময় মুক্তা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। ' যা হবার তা তো হয়ে গেছে, কেন এতো কান্না কাটি করছ?'
মতি বলল ,' মনিব যে আমাকে আঘাত করেছেন এজন্য আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি মনিবের যে বিশ্বাসটা হারিয়েছি সেজন্য। যেটা আর কোন দিন ফিরে পাবো না। আর এতসব হয়েছে তোমার জন্য। তোমার সঙ্গ না পেলে আমার এ অবস্থা হত না।'

( সমাপ্ত)

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়