প্রতারক( ছোট গল্প)



সবাই জানে হ্যারি একজন সৎ এবং ভালো মানুষ।বয়স তিরিশের পাশাপাশি। এ শহরে তার আসার প্রায় তিন মাস হল। দ্বিতলের একটা রুমে ভাড়া থাকে। দিনের প্রায় অর্ধেক সময় সে বাইরে থাকে। কিন্তু কোথায় যায় কি করে কেউ জানেনা। বিকেল দুই থেকে তিনটার সময় সে রুমে ফিরে আসে। আর বাকি সময় রাত বারোটা পর্যন্ত সে বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দু এক দিন পর পরই দেখা যায় হাতে নতুন বই নিয়ে ঘরে আসছে। সময় কাটানোর জন্য এটাই সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থা। এতে দুদিক থেকেই লাভ। একটা হল টাইম পাস আর অন্যটা হল জ্ঞান আহরণ। 
সত্যিই লোকটা খুব ভালো এবং সৎ। কিন্তু এত সততার পেছনেও কিছু একটা লুকিয়ে আছে, সেটা হয়তো কেউ জানেনা। কারণ ভালো বই পড়তে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু টাকা আসে কোথা থেকে এটা সে ছাড়া অন্য কেউ জানেনা এবং কেউ জানারও প্রয়োজন মনে করে না। কিন্তু যে লাইব্রেরী থেকে সে বই কিনে আনে সে লাইব্রেরীর মালিক একজন মহিলা। তার নাম এ্যালি। বয়স আনুমানিক আঠাশ বা ত্রিশ বছর হবে। এখানেই এ্যালির সাথে তার পরিচয়।
এ্যালি নিজেও একজন লেখিকা। ইতিমধ্যে সে অনেকগুলো বই লিখেছে এবং বাজারে এগুলোর সমাদরও যথেষ্ট। সে কথা প্রসঙ্গে হ্যারির কাছে নিজের লেখা বইগুলোর খুব তারিফ করল ,' এগুলো নিয়ে পড়ে দেখুন। আজকাল আমার বইয়ের চাহিদা খুব বেশি। একেকটা বই কয়েক বার প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। এই কয়েক কপি মাত্র রয়েছে।' একনাগাড়ে এতগুলো কথা সে বলে গেল।
হ্যারি বলল,' আপনি কি শুধু বই লেখেন না পড়েনও।' 
এ্যালি অবাক হয়ে বলল,' একি বলছেন, আমি যখন নিজে লেখছি, আমার কি আর পড়ার দরকার আছে? তাছাড়া সময়ইবা কোথায় ? '
হ্যারি বলল,' এখানেই আমার সাথে আপনার তফাৎ। আপনি লিখছেন কিন্তু কোন কাজে লাগাচ্ছেন না আর আমি পড়ছি এবং প্রত্যেকটি বই থেকে জ্ঞান আহরণ করে কাজে লাগাচ্ছি।' 
হ্যারি আবার বলল,' আচ্ছা বলুন তো, যে লিখে সে জ্ঞানী না যে পড়ে সে জ্ঞানী?'
এ্যালি বোধ করি এবার একটু লজ্জিত হল। আর বেশি কথা বাড়াতে চাইল না। শুধু বলল,' সেটা নির্ভর করে পাঠকের উপর। কেউ বই পড়ে জ্ঞান আহরণ করে নিজের জীবনে কাজে লাগায় আর কেউ শুধু শুধু পাঠ করে সময় কাটায়।' 
হ্যারি বলল,' এ্যাডজেক্টলি সো। আমি ওটাই বলতে চাইছি। লেখকরা বই লিখেন, তাঁদের লেখনীতে সমাজে পরিবর্তন আসে কিন্তু তাঁদের জীবনে সে লেখনীর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। এদিক দিয়ে বিচার করলে পাঠকরাই বেশি জ্ঞানী বলতে হয়।' কারণ পাঠকরা বই পড়ে জ্ঞান আহরণ করে এবং সেটা নিজের কাজে লাগায়।' আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন আপনার ঐ " নতুন পথের যাত্রী" বইটা দিয়ে দিন, পড়ে দেখব।'
এ্যালি আর কথা বাড়াল না। বইটা দিয়ে তাকে বিদায় দিল। তবে তার মনে খুব একটা আগ্রহ থেকেই গেল, মানুষটা কি করে, যে এত দামী দামী বই প্রায়ই কিনে নিয়ে পড়ে। বিশেষ করে লেটেস্ট ম্যাগাজিন, কারেণ্ট এ্যাফেয়ার্স এবং ডিটেকটিভ বইগুলো। 
এ্যালি একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় থাকেন কি করেন। কিন্তু হ্যারি তাকে পাত্তাই দেয়নি। সে বলেছিল তার অন্য শহরে ব্যবসা আছে। এখানেও একটা ছোট খাটো ব্যবসা খোলা যায় কিনা তাই চিন্তা করছে। কথাগুলো এ্যালির বিশ্বাস হয়নি। তবুও তার কথায় সায় দিল। সে বুঝতে পারলো বেশি কথা বললে তারই ক্ষতি।
      হ্যারি চলে গেলে এ্যালি নিজে নিজে ওর কথা ভাবতে লাগল। কেন এই অজানা অচেনা মানুষটা সম্বন্ধে তার জানার এত আগ্রহ? তবে কি হ্যারির প্রতি তার কোন দূর্বলতা ---?
     আসলে হ্যারি একজন সিদ্ধহস্ত চোর। তবে সে যেমন তেমন চোর নয়। বৎসরে মাত্র দুটো বা তিনটে চুরি করে আর বাকি দিন বসে বসেই কাটিয়ে দেয়। তার বই পড়ার সার্থকতা এখানেই। শহরের নামীদামী ঘরগুলোর নির্মাণ থেকে শুরু করে ঘরের রুমগুলো  থাকে তার নখদর্পণে। দিনের বেলায় সে বেরিয়ে যায় এই সকল সন্ধানে। সে এমন সিদ্ধহস্ত যে যেকোন ঘরের বা লকারের তালা যদি একবার দেখে ফেলে তাহলে মন্ত্রের মতো তার চাবি প্রস্তুত করতে পারে।
    এই শহরে সে অনেক দিন থেকেই ঘোরাফেরা করছে এবং একটি বিশেষ ঘর তার নজরে এসেছে সেখানে সে চোখ রেখে ফেলেছে। সে ঘরের মালিকের একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্ক আছে যেখানে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ করেন। তাদের দুটি ছেলে আছে যারা বিদেশে পড়াশোনা করে। বাসায় আপাতত তারা দুজন আর একজন বিধবা মহিলা ও তার একটা মেয়ে থাকে। 
       ব্যাঙ্কের মালিক বিশ্বম্বর বাবু রোজই সস্ত্রীক নিজস্ব কারে সকাল ন'টায় বেরিয়ে যান আর সন্ধ্যে বাড়ি ফেরেন। বাকি সমস্ত দিন বয়স্ক বিধবা তার মেয়েকে নিয়ে ঘরে থাকেন। বাড়িতে এছাড়া একটি কুকুর থাকে। কুকুরটি খুব বড় এবং ভয়ানক। যার ভয়ে কেউ ধারেকাছে আসে না।
হ্যারি অনেক দিন থেকেই এই ঘরটিই নজরে রেখে চলছে। ইতিমধ্যে সে বিশ্বম্বর বাবুর সাথে দেখা করার বাহানায় তার অনুপস্থিতিতে বাড়িতে প্রবেশ করে সবকিছু দেখে শুনে রেখেছে। কুকুরটিকেও সবার অলক্ষ্যে খাবার দিয়ে বশ করে রেখেছে। 
     সে যখন এ ঘরটাকে নজরদারি করে চলেছে তার অজান্তে তাকেও একজন নজরদারিতে রেখেছে, সেটা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। ব্যাঙ্ক মালিকের ঠিক বিপরীত ঘরের দ্বিতলে এ্যালি থাকে। সে যখন দুপুরের খাবার খেতে আসে তখন একদিন হ্যারিকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। আর তখন থেকেই সে একটু খেয়াল করে। প্রায় প্রতিদিনই সে হ্যারিকে এদিকটায় দেখে। সেদিন হ্যারি যখন কুকুরটাকে খাবার খেতে দেয় তখন তার একটা সন্দেহ হয় এবং তখন থেকে সে এর রহস্য উদঘাটন করতে তৎপর হয়ে উঠে। 
        কয়েক দিন পরের ঘটনা। বিধবা মহিলাটি তার মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি গিয়েছে। এই সময় হ্যারি জানতে পেরেছে , পরের রোববার ব্যাঙ্ক মালিক একটি বিয়েতে যাবেন। সন্ধ্যায় সেখানে যাবেন, ফিরতে হয়তো রাত এগারোটা/ বারোটা বাজতে পারে। হ্যারি এ দিনের অপেক্ষাতেই ছিল। 
     রবিবার বিকেল তিনটায় সে একটা কারে এসে ঐ বাড়ির পাশের দোকানের সামনে এসে নামল। ড্রাইভারকে বলল, ' তুমি রাত ন'টায় এখানে আসবে, আমাকে রাত সাড়ে দশটার ট্রেন ধরতে হবে। ততক্ষণে আমি আমার মামার বাড়ি থেকে বের হব। কথাগুলো এলি দ্বিতলের ঘর থেকে আঁচ করতে পারল। সে বুঝতে পারল আজ এখানে বড়সড় কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সে আজ বিকেলে আর লাইব্রেরীতে যাবেনা স্থির করল। তাড়াহুড়ো করে শাড়ি গয়না পত্র লাগিয়ে একেবারে ফিটফাট হয়ে নামল। 
   ব্যাঙ্ক মালিক বিশ্বম্বর বাবু কার বের করে স্ত্রীকে নিয়ে রওয়ানা হতেই হ্যারি তাকে অনুসরণ করল। এক ঘন্টা পর আবার হ্যারিকে এখানে আসতে দেখা গেল আবার কোথাও চলে গেল। 
রাত তখন আটটা। হ্যারি আবার ফিরে আসল। এবার সে কুকুরের জন্য ভালো খাবার নিয়ে আসল। খাবার গুলো দিয়ে সে বিশ্বম্বর বাবুর ঘরে প্রবেশ করল। মেইন দরজা খুলে  রুমের ভেতর প্রবেশ করতেই পেছনে একটা শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়ালো। দেখে বেশভূষায় সজ্জিত মহিলা, হাতে সোনার বালা, গলায় মুক্তোর হার। শাড়ীর আঁচলে মুখ অর্ধ ঢাকা। হ্যারি থতমত খেয়ে বলল 'আপনি --।'
'  হাঁ আমি, আমরা যাচ্ছি একটি বিয়ে বাড়ি। অর্ধ রাস্তায় গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হলো আমার হীরের হার আর দামি চুন্নিটা ভুলে গেছি। ওগুলো নিতে এসেছি কিন্তু চাবিটা ভুলে স্বামীর কাছে রয়ে গেছে। এখন গোদরেজটা কিভাবে খুলব তাই ভাবছি। ভালোই হলো তোমাকে পেয়ে গেলাম। তুমি তো এ ব্যাপারে খুব এক্সপার্ট। ওটা খুলতে পারবেতো?' 
হ্যারি খুব বাহাদুরি করে বলল,' হাঁ, এটা তো আমার বাঁ হাতের খেল।' বলেই সে আস্তে আস্তে গোদরেজটা খুলল। মহিলাটি গোদরেজ থেকে সমস্ত গয়নাগাটি আর টাকা, সোনার বিস্কুট ব্যাগে পুরে নিল। সব মিলিয়ে কম করেও পাঁচ লাখ টাকার সামগ্রী।
     এবার মহিলাটি তাকে বলল,' তুমিতো নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে কর। এবার তোমাকে কে রক্ষা করবে? এই ঘরের চুরির দায়ে এবার তোমার জাবজ্জীবন জেল হবে।'
হ্যারির তো চক্ষু চড়কগাছ। " একী! আপনিই তো বললেন গোদরেজটা খোলার জন্য। জিনিস গুলো সব আপনিই তো ব্যাগে পুরে নিলেন, আর আমি কেন জেলে যাব?' 
এ্যালি বলল,' আমি এখনি ফোন করছি, পুলিশ এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। এই ঘরের দরজা - গোদরেজ সবকিছুতেই তোমার হাতের ছাপ পড়ে আছে। সুতরাং তুমি যে চুরি করেছ, একথা প্রমাণের অপেক্ষা করতে হবে না।
       হ্যারি পনেরো বছরের চুরির জীবনে এই প্রথম এতবড় ফাঁপরে পড়ল। হাতে হাত মোজা থাকা সত্ত্বেও চেয়ে দেখে ওটা সে হাতে পরেনি। সে ভয়ে আঁতকে উঠল। এবার সে মহিলার কাছে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো। 
এ্যালি মাথার ঘুমটা আবার একটু টান দিয়ে বলল,' তুমি কি মনে করছ তুমি যে বই পড়ে জ্ঞান আহরণ করে একজন লেখকের চেয়ে বেশি জ্ঞানী হয়ে গেছ?' 
হ্যারির নিজের উপর খুব রাগ হল। বুঝল সে মারাত্মক ভাবে প্রতারিত হয়েছে। সারাজীবন সে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। সে ভাবত তার চেয়ে বড় প্রতারক আর কেউ নেই। এ নিয়ে তার খুব গর্বও ছিল।কিন্তু আজ এই মহিলার কাছে প্রতারিত হয়ে বুঝতে পারল তার চেয়ে বড় প্রতারক আরও একজন আছে ,আর সে হলো এই মহিলা। এবার তার কাছে তাকে হার মানতে হল। সে এবার একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল ,' পাঠক না থাকলে লেখকের কি মূল্য আছে?' 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়