অপেক্ষার সমাপ্তি

 রহমান লস্কর

সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে রীমা। বি ,এ, ফার্স ইয়ারে। মা বাবার আদরের একমাত্র মেয়ে। কোন চাহিদাই কখনো অপূরণ থাকে না। কলেজে নবীনবরণ উৎসবে অংশ গ্রহণ করবে। নতুন একটা শাড়ি পরে বেশ সেজেগুজে সেদিন একটু সকাল সকাল কলেজে উপস্থিত। এমনিতেই রীমা খুব সুন্দর তার উপর লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে এমন ভাবে সেজেগুজে এসেছে ঠিক যেন এক পরী। অনেক ছেলেই কথা বলতে চায়, একটু ভাব করতে চায়। কিন্তু রীমা যে সে মেয়ে নয়। চালচলন দেখে বুঝা যায় অত্যন্ত রুষ্ট এবং দেমাগী। কেউ এগিয়ে এসেও কথা বলতে সাহস করে না।
অনুষ্ঠান আরম্ভ হল। অনুষ্ঠানে রীমা সেদিন যে গানটি গাইল সবাই হতবাক। এ যেন কোন সিদ্ধহস্ত ছায়া ছবির গায়িকা। যেমন কণ্ঠ তেমন গানের ভাব বস্তু। গান শেষে হাত তালি আর চীৎকার থামতেই চায় না।
অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফিরবে। ওর সেই ছোট বেলার সাথী শান্তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলছিল। হঠাৎ পেছন থেকে একটা শব্দ এল,'এইযে শুনছো। রীমা পেছনে ফিরে তাকাতে ছেলেটি বলল, 'হে রীমা তোমাকেই বলছি আজ যে গানটি তুমি গাইলে দারুন হয়েছে , সবাই মুগ্ধ। আর আমি তো একেবারে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলাম। আচ্ছা তুমি কি গান প্র্যাকটিস কর?
হাঁ, তাতে তোমার কি?
না, এমনিতেই বলছিলাম। সে ঢোক গিললো। গানটা দারুন হয়েছে আর তোমাকেও দারুন লাগছিল।
রীমা হজম করে নিল। কোন কথাই বললো না। ছেলেটি বলেই চললো আমার নাম রজত। তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় খুব ভালোই লাগছে, তোমার ঐ গানটা কোন দিন ভুলতে পারবো না --গড় গড় করে আরও কত কি বলে গেল রীমা সে কথা কানেই তুলেনি। আচ্ছা কাল কথা হবে এখন তাহলে আসি। রজত চলে গেল।
শান্তা ও রীমার মুখে কোন কথা নেই। অনেকক্ষণ পর শান্তাই প্রথমে নিরবতা ভঙ্গ করলো। বললো ছেলেটি খুবই ভালো। ও কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি। জানিস রীমা তুই যখন গান গাইছিলি তখন দুতিনটা ছেলে চীৎকার করছিল। ওদের সঙ্গে কী যেন কথা কাটাকাটি করছিল।
শান্তার কোন কথাই রীমা শুনতে পায়নি। কারণ রজতের ঐ 'কোনদিন ভুলতে পারবো না' কথাটি বারবার তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল '। ইতিমধ্যে রীমা বাড়িতে পৌঁছে গেল।
পরদিন কলেজে আসতেই দেখে রজত দুতিনটা ছেলের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত। রীমা বুঝতে পারল ওটা আগের দিনের সেই ঝগড়ার রেশ। রীমাকে দেখেই তাদের ঝগড়াটা থেমে গেল। বোধকরি রীমাকে ওরা ভয় করল। 
টিফিন আওয়ারে সূযোগ পেয়ে রীমা রজতকে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছিল। রজত বলল,'ও কিচ্ছু না।'
এভাবে মাঝে মধ্যে তাদের দেখা হয়, কথা হয়। আর এভাবেই তাদের মধ্যে গড়ে উঠে সখ্যতা।প্রথমে বন্ধুত্ব তার পর তা ধীরে ধীরে প্রেম এবং একসময় চাওয়া পাওয়ায় রূপান্তরিত হয়।
দেখতে দেখতে রজত ফার্স ক্লাস বি,এস,সি অনার্স পাশ করে। ওর মাবাবার অনেক দিনের শখ ওকে ইউ,পি,এস,সি করার জন্য দিল্লি পাঠাবেন। কিন্তু রীমাকে ছেড়ে সে দিল্লি যেতে চাইছিল না। রীমাকে কথাটা বলতেই সে সোজা বলেছিল হাঁ তুমি মাবাবার কথামত সেখানে যাও, পড়াশোনা কর। আমি চাই তুমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও। 
কিন্তু --
'আর কোন কিন্তু নয়। তুমি অবশ্যই সেখানে যাবে। আমি কথা দিলাম তোমার অপেক্ষায় থাকবো। রোজ ফোন করো।' রীমা একটু কঠোর ভাবেই কথাগুলো বলল। 
রজত চলে গেল।
এদিকে রীমা সবসময় রজতের চিন্তায় তন্ময় হয়ে থাকে। রাতে ফোনে কথা হয়। অপেক্ষা আর দুশ্চিন্তায় ওর পড়াশোনায় ভাটা পড়ে। বি,এ,আর পাশ করা হয়ে উঠলো না। 
ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু সে রাজি হয় নি।
রীমার মা সবই জানেন। তিনি রীমাকে অনেক করে বুঝালেন, ' তুই ওই কুচিন্তা থেকে সরে আয় রজত আর কোন দিনও ফিরে আসবে না, অযথা নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না।'
রীমা চট করে জবাব দেয় ' না মা, রজত সে রকম ছেলে নয়। যতদিন রজত আসে না আমি অপেক্ষায় থাকবো।'
ওদিকে রজত এখন আর আগের মতো ফোন করে না। রীমা ফোন করলে দুএকটি কথা বলে লাইন কেটে দেয়। বলে সময় নেই। এক সময় ফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 
কোন যোগাযোগ নেই। দুশ্চিন্তা আর অনাহারে রীমা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। মাবাবার কোন কথাই এখন আর শুনে না।
রজত এবার ইউ পি এস সি ক্র্যাক করে চাকুরীতে জয়েন করেছে। অনেক দিন কেটে গেল। সেখানে একটি ডাক্তার মেয়েকে পছন্দ করল আর মাবাবার সহযোগিতায় বিয়েও করে নিল। 
রীমাকে শান্তা এসে এ খবরটা দিল। রজত বৌ নিয়ে বাড়ি আসছে। খবর পাওয়া মাত্র রীমা মূর্ছা গেল। সে বুঝতে পারলো তার অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে আসছে। মা চীৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করলেন। শান্তা বিড় বিড় করে বললো,' রীমা তুই স্বামীকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলে। আজ বুঝি তোর অপেক্ষার  সমাপ্তি হল।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বন্ধু মানে আলোর দিশা

লুটছে যত রাজভাণ্ডারী

বিদায়